মোঃ রাশেদুল হাসান আমিন
বাংলাদেশে প্রযুক্তি খাত আর চাকরির বাজার ঘিরেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে গত কয়েক বছরে সে চিত্র পাল্টেছে। স্কুলের শ্রেণিকক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসাইনমেন্ট, গবেষণাপত্র, এমনকি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন নীরবে জায়গা করে নিয়েছে। প্রশ্নটি তাই আর কেবল প্রযুক্তির নয়Ñ শিক্ষার বটে। যে শিক্ষাব্যবস্থা আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলবে, সেটিই যদি এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তাহলে এর মূল্য শিক্ষার্থী আর দেশকেই দিতে হবে।
চ্যাটজিপিটি, জেমিনাই, ক্লড, কোপাইলটের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক টুল এখন মুহুর্তের মধ্যে সমাধান দিচ্ছে, ভাষা অনুবাদ করছে, প্রোগ্রামিং কোড লিখছে, গবেষণার সারাংশ তৈরি করছে। শিক্ষার্থীর শেখার ধরন বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সহায়তাও দিচ্ছে কোনো কোনো প্ল্যাটফর্ম। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, গণমাধ্যম, কৃষিÑ প্রায় প্রতিটি খাতেই এই প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। আর এর প্রভাব সবচেয়ে গভীরভাবে পড়ছে শিক্ষায়। কারণ শিক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন খাত নয়; এটি ভবিষ্যৎ সমাজ, অর্থনীতি ও কর্মবাজারের ভিত্তি। ইউনেস্কো, ওইসিডি এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামÑ তিনটি সংস্থাই একমত যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছে। তবে তারা এ কথাও বলছেন, সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকে, প্রযুক্তিকে নয়।
বাংলাদেশও এই স্রোতের বাইরে নেই। দেশের হাজারো শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পড়াশোনা করছেÑ কেউ ইংরেজি শিখছে, কেউ প্রোগ্রামিং অনুশীলন করছে, কেউ অ্যাসাইনমেন্ট তৈরী করছে, কেউ গবেষণাপত্রের খসড়া তৈরিতে সহায়তা নিচ্ছে। শিক্ষকদের একাংশও পাঠ পরিকল্পনা বা প্রশ্নপত্র তৈরিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছেন। অর্থাৎ প্রযুক্তি শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পড়েছে ঠিকই, প্রশ্ন হলোÑ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি এর জন্য প্রস্তুত?
আসল চ্যালেঞ্জটা প্রযুক্তি গ্রহণ করা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনও শিক্ষার্থীদের এমন একটি পৃথিবীর জন্য তৈরি করছি, যেখানে তথ্য মুখস্থ করাই সাফল্যের চাবিকাঠি? নাকি এমন এক ভবিষ্যতের জন্য, যেখানে তথ্য খোঁজা নয়Ñ তথ্য বিশ্লেষণ, যাচাই, প্রয়োগ আর নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতাই হবে সবচেয়ে বড় দক্ষতা?
মুখস্থনির্ভরতা বনাম নতুন বাস্তবতা : দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি যেমন এর বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, তেমনি সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখনও মুখস্থনির্ভরতা। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই শিক্ষার সাফল্য নির্ধারিত হয় পরীক্ষার নম্বর দিয়েÑ পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ করা, সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর গিলে ফেলা এবং পরীক্ষার খাতায় তা হুবহু তুলে দেওয়ার রীতিই দীর্ঘদিন ধওে চলে আসছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রচলিত এই পদ্ধতিকে আমূল নাড়া দিয়েছে। আজ একজন শিক্ষার্থী কয়েক সেকেন্ডে যেকোনো বিষয়ের ব্যাখ্যা, উদাহরণ বা তুলনামূলক আলোচনা পেয়ে যাচ্ছে। ফলে তথ্য মুখস্থ করার প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক কমেছে; গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর এবং সেই জ্ঞান বাস্তব সমস্যায় কীভাবে কাজে লাগানো যায়Ñ এই বোঝাপড়া। এখানেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আসল সংঘাত। আমাদের অনেক শ্রেণিকক্ষে এখনো “সঠিক উত্তর” শেখানো হয়, “সঠিক প্রশ্ন” করা শেখানো হয় না। শিক্ষার্থীকে বলা হয় কী ভাবতে হবে; কীভাবে ভাবতে হবে, সেই দক্ষতা গড়ে তোলার সুযোগ সীমিতই থেকে যায়। অথচ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সবচেয়ে মূল্যবান দক্ষতা হবে সমালোচনামূলক চিন্তা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা আর সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘চাকরির ভবিষ্যৎ প্রতিবেদন ২০২৫’ বলছে, আগামী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতার তালিকায় থাকবে বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীল চিন্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিগ ডেটা সম্পর্কে জ্ঞান, প্রযুক্তিগত স্বাক্ষরতা এবং আজীবন শেখার সক্ষমতা। প্রতিবেদনটি এ-ও বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যমান দক্ষতার প্রায় ৩৯ শতাংশ নতুন করে শিখতে বা হালনাগাদ করতে হবে। অর্থাৎ শুধু একটি সনদ নয়; পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই ভবিষ্যতের কর্মবাজারে সাফল্যের মাপকাঠি হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যদি এখনও তথ্য পুনরাবৃত্তির মধ্যেই আটকে থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
মূল্যায়নের প্রশ্নটাও একই সঙ্গে সামনে চলে আসে। যে পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর কয়েক সেকেন্ডে কোনো প্রযুক্তি তৈরি করে দিতে পারে, সেই পরীক্ষা আর শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা যাচাই করতে পারে না। তাই শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন হলে চলবে নাÑ শিক্ষার্থীকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সেই প্রশ্নেরও নতুন উত্তর খুঁজতে হবে। লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি প্রকল্পভিত্তিক কাজ, মৌখিক উপস্থাপনা আর বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব বাড়ানো দরকার, যেখানে শুধু উত্তর লিখে নয়, চিন্তার গভীরতা দিয়েই শিক্ষার্থীর দক্ষতা যাচাই করা যাবে।
অপব্যবহারের নতুন সংকট : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন শেখার নতুন পথ খুলে দিয়েছে, তেমনি তৈরী করেছে নতুন সংকটেরও। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের বহু শিক্ষার্থী এখন চ্যাটজিপিটি বা অন্য কোনো টুল দিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট, প্রতিবেদন কিংবা প্রোগ্রামিং কোড তৈরি করে সেটিকে নিজের কাজ বলে জমা দিচ্ছেন। ফলে প্রশ্নের মুখে পড়ছে একাডেমিক সততা। এটি কেবল নকলের নতুন সংস্করণই নয়; এটি শেখার প্রক্রিয়াটাকেও দুর্বল করে দিতে পারে। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজে বিশ্লেষণ না করে সব দায়িত্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর ছেড়ে দেয়, তাঁর চিন্তাশক্তি, যুক্তি নির্মাণের ক্ষমতা এবং গবেষণার দক্ষতা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে পারে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিষিদ্ধ করা এর সমাধান নয়। ইতিহাস বলে, কোনো নতুন প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মেলেনিÑ ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেট নিয়েও একসময় একই আশঙ্কা ছিল। প্রয়োজন মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার আর শিক্ষার্থীদের এটা বোঝানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি সহায়ক শক্তি, বিকল্প নয়। এটি খসড়া তৈরি করতে পারে, ধারণা দিতে পারেÑ কিন্তু চূড়ান্ত বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত আর দায়ভার শেষ পর্যন্ত মানুষেই নিতে হবে।
শিক্ষক প্রস্তুতির ঘাটতি : আমাদের দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে কম উঠে আসেন শিক্ষকেরা। অথচ তাঁদের কাঁধে এই পরিবর্তনের মূল দায়িত্ব। আজ একজন শিক্ষার্থী হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেই ক্লাসে ঢুকছেন, কিন্তু অনেক শিক্ষক এখনো জানেন না এর সীমাবদ্ধতা কোথায়, পাঠদানে এটি কীভাবে কাজে লাগানো যায়, কিংবা এর অপব্যবহার কীভাবে সামাল দিতে হয়। এটি শিক্ষকদের ব্যর্থতা নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির ঘাটতির ফল।
ইউনেস্কোর ‘শিক্ষা ও গবেষণায় জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নির্দেশনা’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই যুগে শিক্ষকের ভূমিকা তথ্য সরবরাহকারীর চেয়ে অনেক বড়Ñ তিনি হয়ে উঠবেন শেখার পথপ্রদর্শক, পরামর্শদাতা ও নৈতিক দিকনির্দেশক। তাই শিক্ষকদের জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ছাড়া বিকল্প নেই। বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ শিক্ষক এখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক পাঠ পরিকল্পনা, প্রম্পট লেখার কৌশল বা ডিজিটাল নৈতিকতা বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণই পাননি। কেউ তাই একে ভয় পাচ্ছেন, কেউ আবার এর সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগই পাচ্ছেন না।
নতুন বৈষম্যের শঙ্কা : এই আলোচনায় আরেকটি বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে নাÑ সব শিক্ষার্থীর হাতে সমান প্রযুক্তি নেই। ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম বা অন্যান্য শহরের আধুনিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যেখানে উচ্চগতির ইন্টারনেট, ব্যক্তিগত ল্যাপটপ আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন, সেখানে অনেক গ্রামীণ শিক্ষার্থী এখনো দুর্বল ইন্টারনেট, স্মার্ট ডিভাইসের অভাব আর বিদ্যুৎ সমস্যার সঙ্গে লড়ছেন। প্রযুক্তি শহরকেন্দ্রিক থেকে গেলে শহর আর গ্রামের শিক্ষার্থীর দক্ষতার ব্যবধান আরও বাড়বেÑ যাঁরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবেন, তাঁরা দ্রুত এগিয়ে যাবেন; বাকিরা পিছিয়ে পড়বেন। ইউনেস্কো বারবার সতর্ক করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন বিদ্যমান শিক্ষাগত বৈষম্যকে আরও গভীর না করে। তাই বাংলাদেশকে এই প্রযুক্তিকে কেবল প্রযুক্তি নয়, শিক্ষাগত ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে।
সম্ভাবনার দিকটিও কম নয় : ঝুঁকির পাশাপাশি সম্ভাবনার দিকও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রযুক্তি নিজে ভালো বা মন্দ নয়; এর প্রভাব নির্ভর করে ব্যবহারের ওপর। সঠিক পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বহু পুরোনো সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে। সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষায়। একটি শ্রেণিকক্ষে পঞ্চাশ শিক্ষার্থীর শেখার গতি কখনো এক রকম হয় নাÑ কেউ দ্রুত শেখেন, কেউ ধীরে; কেউ গণিতে দুর্বল, কেউ ইংরেজিতে। একজন শিক্ষকের পক্ষে প্রত্যেকের জন্য আলাদা পরিকল্পনা করা প্রায় অসম্ভব। আর এই সীমাবদ্ধতাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেকটা দূর করতে পারে। শিক্ষার্থীর অগ্রগতি বিশ্লেষণ করে দুর্বল জায়গা শনাক্ত করা, অতিরিক্ত অনুশীলন দেওয়া বা সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়ার কাজ এটি অনায়াসে করতে পারে। এতে শিক্ষক প্রতিস্থাপিত হন না; বরং তাঁর সক্ষমতা আরও কার্যকর হয়ে ওঠে। পাশাপাশি সময় বাঁচে; যা আলোচনা, যুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য।
শিক্ষকের প্রশাসনিক চাপও কমাতে পারে এই প্রযুক্তিÑ প্রশ্নপত্রের খসড়া তৈরি, প্রাথমিক মূল্যায়ন বা পাঠ পরিকল্পনার মতো সময়সাপেক্ষ কাজ দ্রুত সেরে ফেলা যায়। এতে শিক্ষক প্রযুক্তির চেয়ে শিক্ষার্থীর পেছনে বেশি সময় দিতে পারেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষায়ও রয়েছে বড় সম্ভাবনা। দেশের বহু গ্রামীণ বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের সংকট দীর্ঘদিনের। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম বা বাংলা ভাষার মানসম্মত ডিজিটাল উপকরণ এই ব্যবধান কমাতে পারে। এতে নিজের বিদ্যালয়ে দক্ষ শিক্ষক না পেলেও একজন শিক্ষার্থী প্রযুক্তির মাধ্যমে মানসম্মত শেখার সুযোগ পান। তবে এর পূর্বশর্ত ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, ডিভাইস আর স্থানীয় ভাষাভিত্তিক কনটেন্টের নিশ্চয়তা।
অন্য দেশ যা করছে : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শিক্ষায় জুড়ে দিতে বিশ্বের নানা দেশ ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। সিঙ্গাপুর এটিকে জাতীয় শিক্ষা কৌশলের অংশ করেছে। শিক্ষার্থীদের শুধু এই প্রযুক্তি ব্যবহার নয়, এ সম্পর্কে জ্ঞানও দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকদের জন্যও চালু হয়েছে নিয়মিত প্রশিক্ষণ। এস্তোনিয়া উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-স্বাক্ষরতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের নিছক ব্যবহারকারী নয়Ñ সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। ফিনল্যান্ড বিষয়টিকে প্রযুক্তির গণ্ডিতে বেঁধে রাখেনি; নৈতিকতা, গণতন্ত্র, তথ্য যাচাই আর সমালোচনামূলক চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া বিনিয়োগ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক ডিজিটাল পাঠ্যবই, স্মার্ট ক্লাসরুম আর ভার্চুয়াল টিউটরে। এই অভিজ্ঞতাগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়Ñ কোনো দেশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শিক্ষকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে না; বরং শিক্ষা উন্নয়নের সহায়ক শক্তি হিসেবেই বিবেচনা করছে।
এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংগতি রেখেই ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করতে পারে, তবে একই সঙ্গে একাডেমিক অসততা, গোপনীয়তা লঙ্ঘন, বৈষম্য আর ভুল তথ্যের ঝুঁকিও তৈরি করে। তাই এর ব্যবহারের ভিত্তি হতে হবে মানবাধিকার, স্বচ্ছতা আর নৈতিকতা। ওইসিডির সাম্প্রতিক নীতিপত্রও একই কথা বলছেÑ শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য মুখস্থ করানো নয়, তাদের শেখাতে হবে সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, সহযোগিতা আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-স্বাক্ষরতা। বাংলাদেশের জন্য এই তথ্য স্পষ্ট বার্তা দেয়Ñ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা যদি না পরিবর্তন করা হয়, শিক্ষার্থীরা কেবল প্রযুক্তিগতভাবে নয়, দক্ষতার নিরিখেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
এখনই সিদ্ধান্তের সময় : সরকারের এখন মূল কাজ হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শ্রেণিকক্ষে ঢুকতে দেওয়া নয়; বরং একে দায়িত্বশীলভাবে শিক্ষার অংশ করে তোলার কাঠামো তৈরি করা। প্রথমত দরকার একটি জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা নীতি, যেখানে ব্যবহারের উদ্দেশ্য, সীমা, নৈতিকতা, তথ্য সুরক্ষা, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো স্পষ্ট থাকবে। দ্বিতীয়ত, পাঠ্যক্রম সংস্কার অপরিহার্যÑ তথ্য মুখস্থ করার বদলে সমস্যা সমাধান, গবেষণা, সমালোচনামূলক চিন্তা ও যোগাযোগ দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে অজ্ঞ একজন শিক্ষক এই প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা করতে পারবেন না। চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ল্যাব, গবেষণা তহবিল আর আন্তঃবিষয়ক গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে, কারণ এর প্রয়োগ এখন সাংবাদিকতা, আইন, কৃষি, চিকিৎসা থেকে ব্যবসাÑ সব জায়গাতেই দ্রুত বাড়ছে। সবশেষে, বাংলা ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন, নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী আর প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলাও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত উন্নতই হোক, এটি সহমর্মিতা শেখাতে পারে না। তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধ গড়তে পারে না। প্রবন্ধ লিখতে পারে, কিন্তু বিবেক তৈরি করতে পারে না। তাই শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করা, যেখানে প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু মানুষ হারিয়ে যাবে না। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, আর কখন এর ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়Ñ তথ্য যাচাই, সূত্র মূল্যায়ন, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা আর একাডেমিক সততার গুরুত্ব তাদের জানতে হবে। একই সঙ্গে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন আর মানবিক শিক্ষার গুরুত্বও কমানো যাবে না, কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান হবেন সেই মানুষ, যিনি প্রযুক্তি বোঝেন, আবার মানবিকতাও ধারণ করেন।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভয় পাওয়ারও কারণ নেই, অন্ধভাবে গ্রহণ করারও দরকার নেইÑপ্রয়োজন বিচক্ষণতা, দূরদৃষ্টি আর সময়োপযোগী নীতি। এটি কোনো অলৌকিক সমাধান নয়, আবার অনিবার্য বিপর্যয়ও নয়। এটি এমন এক শক্তিশালী প্রযুক্তি, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভবিষ্যতমুখী করে তুলতে পারে, যদি আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি। শিক্ষকের বিকল্প এটি নয়; বরং এমন একটি শক্তি, যা শিক্ষা, মূল্যায়ন আর কর্মবাজারের পুরোনো ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে। তাই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে আজ একটাই প্রশ্নÑআমরা কি শিক্ষার্থীদের এখনও অতীতের পৃথিবীর জন্য তৈরি করছি, নাকি এমন এক ভবিষ্যতের জন্য, যেখানে মানুষ আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পাশাপাশি কাজ করবে?
এই প্রশ্নের উত্তর কেবল শিক্ষাবিদ বা নীতিনির্ধারকদের নয়-এটি আমাদের সবার। কারণ আজ আমরা যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলব, তার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকবে আগামী বাংলাদেশের সক্ষমতা, উদ্ভাবন আর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ভিত্তি। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই-কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কারও জন্য অপেক্ষা করবে না।
লেখক : সাংবাদিক।