তৌহিদুর রহমান
যখনই মানুষের কল্যাণে বিজ্ঞানের মহৎ কোনো আবিষ্কার হয়েছে তখনই মানবসমাজ একধাপ সামনে এগিয়ে গেছে। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার যুগে আজ আমরাই হয়তো সবচেয়ে আধুনিকতার যুগে বসবাসকারী একজন মানুষ হিসাবে দাবি করতে পারি। কিন্তু না, প্রত্যেক যুগের মানুষই মনে করতো তারাই মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নতির যুগে বাস করছে। কিয়ামত পর্যন্ত এ সিলসিলা চলতেই থাকবে। যখন কম্পিউটার আবিষ্কার হলো তখন অনেক কাজ করা মানুষের জন্য সহজ হয়ে গেল। মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে কল-কারখানা চালানো, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ড্রোন পরিচালনা, কৃষি থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞান এমন কোনো কাজ নেই যা কম্পিউটার করে দিচ্ছে না! যে কাজ করতে একসময় দশ বছর লেগে যেত কম্পিউটার তা দশ মিনিটে করে দিচ্ছে। এরপর এসে গেল ইন্টারনেটের যুগ। ‘বিশ্বটাকে দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে’Ñ কবি কাজী নজরুল ইসলাম যা একশ’ বছর আগে কল্পনা করেছিলেন তা এখন আমরা বাস্তবে দেখছি। সারা পৃথিবীকে আমরা আপন হাতের মুঠোয় পুরে দেখছি। প্রতি মুহূর্ত দাপিয়ে বেড়াচ্ছি পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। এক মুহূর্তে কথা, ছবি, ভিডিও, টাকা-পয়সা, সংবাদ, চিঠি-পত্র, ডকুমেন্ট পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে শেষ প্রান্তে।
এখন আরো একধাপ এগিয়ে আমরা চলে এসেছি এআইÑআর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগে মানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে। এখন প্রায় সব কাজ করে দিচ্ছে এআই। বিমান, যুদ্ধবিমান, জাহাজ, গাড়ি চালানো, কল-কারখানা চালালো-ম্যানেজমেন্ট, চিকিৎসা-এমনকি রোগীর অপারেশন থেকে শুরু করে সব বুদ্ধির কাজ করবে এআই। কিন্তু দুঃখের বিষয় সব কিছুর উন্নতি হচ্ছে কিন্তু অবনতি হচ্ছে মানুষের নৈতিকতার, মানবিকতার, বিবেকের। আমরা আজ অসহনীয় লোক দেখানোর যুগে বসবাস করছি। প্রতিদিন কী খাচ্ছি, পরিবার নিয়ে কোথায় যাচ্ছি, কী অর্জন করছি, জীবনের প্রতিটি আনন্দঘন মুহূর্ত সবকিছু যেন পৃথিবীর মানুষের সামনে তুলে ধরাই জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে গেছে। অন্যের সাথে আনন্দ ভাগ করে নেয়া হয়তো তেমন দোষের কিছু নয়। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই যখন আমরা সংযম ও শালীনতার সীমা অতিক্রম করে লোক দেখানোর এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ি। এই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে গিয়ে আজকাল বেডরুমের গোপন খবরও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করতে অনেকেই দ্বিধা করে না, যা ব্যক্তিগত লজ্জা ও আত্মমর্যাদার সীমারেখাকে এখন মুছে দিচ্ছে।
ইসলাম মানুষের আনন্দকে প্রকাশ করতে নিষেধ করেনি বরং তা পরিচ্ছন্ন, সুন্দর সুসংহত ও নিরাপদ রাখতে শিখিয়েছে। কারণ আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থাকা দুটি বাস্তবতার একটি হলোÑ হিংসা ও অন্যটি বদনজর। নবিজি (সা.) স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘বদনজর অবশ্যই সত্য। যদি কোনো কিছু মানুষের তাকদিরকে অতিক্রম করতে পারত, তবে তা হলো বদনজর।’ (সহীহ মুসলিম)। আরেক সহীহ আল-জামে’র এক হাদিসে নবি (সা.) বলেছেন, ‘বদনজর মানুষকে কবরে পৌঁছে দেয় এবং উটকে হাঁড়িতে (রান্নার পাত্রে) পৌঁছে দেয়।’
হিংসাকে শুধু মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা ভাবা বড় ভুল বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক বাস্তবতা। যা আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতকে নষ্ট করে দিতে পারে। কারো প্রশংসা বা ঈর্ষা, ইচ্ছাকৃত না হলেও ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য হলো নিজের নিয়ামত সংযত রাখা, আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত থাকা এবং অহংকারমুক্ত থাকা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে আমরা কীভাবে আমাদের নিয়ামত ও প্রাপ্তিগুলো সংযত রাখবো?
জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইতে হবে। জিকির ও দু’আ ছাড়া দিন শুরু ও শেষ না করা। বিশেষভাবে সূরা আল-ফালাক ও আন-নাস নিয়মিত পাঠ করা। এগুলো বদনজর ও অদৃশ্য ক্ষতি থেকে সুরক্ষার ঢাল। সূরা আল-ফালাক সব সময় পড়াÑ ‘আর আপনি আশ্রয় চান ভোরের রবের কাছে...’। ‘মা-শা-আল্লাহ তাবারাকাল্লাহ’ বলা অভ্যাসে পরিণত করা। নিজের বা অন্যের কোনো নিয়ামত দেখলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এতে অহংকার দূর হয়, বরকত সৃষ্টি হয় এবং বদনজরের ক্ষতি থেকে বাঁচা যায়। আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তুমি যখন তোমার বাগানে প্রবেশ করেছিলে, তখন কেন বললে নাÑ ‘মা-শা-আল্লাহ, লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ?’ (সূরা আল-কাহফ: ৩৯)।
যেকোন বিষয় শেয়ার করার ক্ষেত্রে সব সময় সংযমী ও সতর্ক থাকা দরকার। মনে রাখতে হবে সকল অনুসারী কখনো শুভাকাক্সক্ষী হয় না। কেউ হয়তো জীবনের কষ্টকর সময় পার করছেÑ তার কাছে কারো সুখের মুহূর্তের প্রদর্শন মনের অজান্তেই তাকে দুঃখ দিতে পারে, তার মনে হিংসা বা ক্ষোভ সৃষ্টি করতে পারে, যা শেয়ারকারীর জন্য ক্ষতির কারণও হতে পারে।
এছাড়া গোপনীয়তা রক্ষাও ঈমানের অংশ ও সৌন্দর্য। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘লজ্জা ঈমানের অংশ।’ (সহীহ বুখারি)। জীবনের সব কিছু প্রকাশ করা আসলেই আধুনিকতা নয় বরং অনেক সময় তা নিজের দুর্বলতার প্রকাশ ঘটায়। মনে রাখবেন কিছু নিয়ামত আল্লাহ ও আপনার মাঝেই সীমাবদ্ধ।
নিজের কারিশমা ও আল্লাহ প্রদত্ত নিয়মত প্রকাশ করার চেয়ে সংরক্ষণ করা জরুরি আর মানুষের প্রশংসার চেয়ে আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়া অনেক বেশি মূল্যবান। কাজেই এক্ষেত্রে সংযমী থাকতে হবে। আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে হবে, মানুষের নিকট থেকে অহেতুক প্রশংসা অর্জনের অদ্ভুত মানসিকতা পরিহার করতে হবে। আল্লাহ তা’আলা আমাদের নিয়ামতগুলোকে হিফাজত করুন। আমাদের অন্তরকে হিংসা থেকে এবং জীবনকে বদনজরের ক্ষতি থেকে রক্ষা করুন।
লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক।