ফ্যাসিবাদমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে যখন আমরা দ্বিতীয় রক্তস্নাত জুলাই ২০২৬ উদযাপন করছি, তখন আমাদের সোনালি স্বপ্নের আকাশটা বিদঘুটে অন্ধকারে ঢেকে যায়-যখন দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে কিংবা হবিগঞ্জের ১৮ বছরের এক তরুণের তাজা রক্তে রাজপথের কালো পিচ লালে লাল হয়ে যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৫ আগস্ট তারিখে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধনীতে বলেছিলেন- ‘এই অভ্যুত্থান কোনো একক দল বা ব্যক্তির নয়, এর মহানায়ক এদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।’ তাঁর এই কথাগুলো আমাদের হৃদয়ে আশার আলো জাগায়। কিন্তু সরকারের ৬ মাসের আমলানামা আর নির্মম বাস্তবচিত্র যখন দেখি তখন সেই আশার আলো ধীরে ধীরে জ্যোস্নার বাদলে অমাবশ্যায় পরিণত হয়। যার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো হবিগঞ্জের ছোট্ট কিশোর আলিফ চৌধুরী। কী অপরাধ ছিল এই তরুণটির? সে তো কেবল একটি অহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিল! এটাই কি তার অপরাধ? যদি অপরাধ করেও থাকে, তবে রাষ্ট্রের আইন রয়েছে, আদালত রয়েছে- আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে-এটাই আইনের শাসনের কথা।
কিন্তু আমরা দেখলাম এক টগবগে তরুণের ওপর হায়েনার উন্মত্ততা। রড দিয়ে তার চোখে এমনভাবে আঘাত করা হলো যে অন্ধত্ব নেমে এল তার জীবনে। মাত্র এইচএসসি পড়ুয়া এই কিশোরের স্বপ্ন ছিল আকাশচুম্বী- সে কোনো গতানুগতিক চাকরি নয়, হতে চেয়েছিল একজন সফল উদ্যোক্তা বা বড় ব্যবসায়ী। কিন্তু নিষ্ঠুর আঘাতে আজ তার সেই সুন্দর স্বপ্নগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল। এই দায় কার? এই দায় আমাদের সবার। বিশেষ করে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর। তারা কেউ এই দায় এড়াতে পারে না। কদিন আগেও কেউ চিনত না আলিফকে। ঠিক যেমনটি একসময়ে কেউ চিনত না আবু সাঈদ কিংবা মুগ্ধকে। কিন্তু সময়ের মহাপরিক্রমায় আবু সাঈদ কিংবা মুগ্ধ যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অবিনাশী প্রতীকে পরিণত হয়েছে, তেমনি আলিফও আজ অন্যায়ের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো এক সাহসের নাম।
গত ২৮ জুলাই হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘জুলাই পদযাত্র’ কর্মূসূচিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এই সংঘর্ষে জাতীয় ছাত্রশক্তির নবীগঞ্জ উপজেলা কমিটির সংগঠক ১৮ বছর বয়সি আলিফ চৌধুরী গুরুতর আহত হন। স্থানীয় চিকিৎসা অপ্রতুল হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে তার চোখের অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন যে, তার বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেছে এবং ডান চোখের দৃষ্টিশক্তিও ঝাপসা হয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে তাকে হারাতে হলো তার জীবনের আলো! চোখ হারানোর এই বেদনা হয়তো আমরা একদিন ভুলে যাব, ভুলে যাবে তার স্বজনরাও; কিন্তু সে কি ভুলতে পারবে সেই নিষ্ঠুর হামলার কথা? নবীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আলিফ ছিল তার অসহায় পরিবারের একমাত্র বাতিঘর। সেই বাতি ঘরের প্রদ্বীপটির আলো তারা কেড়ে নিল। আহত আলিফকে দেখতে অনেকেই হাসপাতালে ছুটে গেছেন। তার মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা.শফিকুর রহমান এই নৃশংস হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাকে দেখে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ২৮ জুলাই হবিগঞ্জে এনসিপির জুলাই পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশেও এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা সংঘটিত হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। আলিফ আমার কেউ নয়, তার সাথে আমার পরিচয়ও নেই; এমনকি সেও আমাকে চেনে না। তবুও তার জন্য হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। সেই বিবেকবোধ থেকেই কিছু কথা লেখার চেষ্টা করছি। তাহলে এ ঘটনার জন্য দায়ী কে? কার আশ্রয়-প্রশয়ে ছাত্রসংগঠনগুলো এমন মারমুখী হয়ে উঠছে সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। দীর্ঘ ১৭টি বছর ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা ফ্যাসিস্ট হেলমেট বাহিনীর নিষ্ঠুর নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। শরীরের রক্ত ঝরলে কেমন কষ্ট হয় তা তো ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অজানা নয়! তাহলে কোন জিঘাংসার বশবর্তী হয়ে তারা প্রতিপক্ষের গায়ে হাত তুলতে কুন্ঠাবোধ করছে না, সে বিষয়টি আজ এক বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের শান্তি-শৃঙ্খলা বজার রাখার দায়িত্ব সরকারের। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলোকে সবসময়ই অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। যেন কেউ যৌক্তিক দাবিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে না পারে। বিশেষ করে মাঠের রাজনীতিতে সরকারী দল ও তাদের ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। ইতোমধ্যে ছাত্রদলের বেপরোয়া তাণ্ডব সরকারের সামগ্রিক ভাবমূর্তি ও জুলাইয়ের অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। এভাবে যদি সংঘর্ষ চলতেই থাকে , তবে তৃতীয় শক্তি এখানে ফায়দা লুটে নিতে একটুও ভুল করবে না। এব্যাপারে সরকার প্রধানের সজাগ দৃষ্টি প্রয়োজন। আমরা আশা করব, রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব ও অভিভাবকেরা ছাত্রসংগঠনগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখবেন এবং তাদের সঠিক রাজনৈতিক শিষ্টাচার শেখাবেন। আমরা শিক্ষাঙ্গনে বা রাজপথে আর কোনো মায়ের বুক খালি দেখতে চাই না। একজন বাবা তার সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌছাতে কত ঘাম আর রক্ত ঝরাতে হয়, তা শুধু কেবল তারাই জানেন। বাবা-মায়ের সেই বুকভরা আশাকে দয়া করে দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে দেবেন না। গণতন্ত্র মানে একে অপরের জীবন কেড়ে নেওয়া নয়, গণতন্ত্র মানে যুক্তির জবাব যুক্তিতে দেওয়া। যারা মান্তানি করে আলিফের চোখ কেড়ে নিলে, তারা কি কখনো ভেবেছে-আরশের মালিক চাইলে তাদেরও দুই চোখ চিরতরে কেড়ে নিতে পারেন? তিনি ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না। আলিফের নিভে যাওয়া চোখের প্রতিটি ফোঁটা পানির হিসাব একদিন দিতেই হবে।