আমাদের অর্থনীতিতে এমন কিছু খাত আছে, যেখানে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের প্রভাব কোনো একটি মন্ত্রণালয়, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি তার অন্যতম। একটি লিটারের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু গাড়ির মালিকের ওপর পড়ে না। ডিজেলের দাম বাড়ে মানে কৃষকের সেচ ব্যয় বাড়ে, বাস ও ট্রাকের ভাড়া বাড়ে, পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ে। শিল্পের উৎপাদন ব্যয় থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, নৌপরিবহন, বিমান চলাচল ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ে। সঙ্গত কারণে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের কাঠামো পরিবর্তনের যেকোনো উদ্যোগকে সাধারণ ব্যবসায়িক সংস্কার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে অর্থনীতি, ভোক্তা অধিকার এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়।
এ জায়গাতেই বর্তমানে যে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ বিষয়টি শুধু বেসরকারি খাতকে জ্বালানি ব্যবসায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ভূমিকা, আমদানি অবকাঠামো, জ্বালানি মজুত, ইস্টার্ন রিফাইনারির ভবিষ্যৎ, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সংকটের সময়ে রাষ্ট্রের সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে জনসমক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
এ উদ্যোগের রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য সাম্প্রতিক অতীতের দিকে তাকানো জরুরি। পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা হারানোর মাত্র দুই মাস আগে, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়ার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছিল। সে নীতির সুবিধা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী পেয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন সরকারের মেয়াদের প্রথম পাঁচ মাসের মধ্যেই একই ধরনের একটি কাঠামো আবার সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই আগের অভিজ্ঞতা আলোচনায় আসছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে নতুন নীতির সামঞ্জস্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ কোনো নীতি অতীতে বিতর্কিত হয়ে থাকলে সেটিকে নতুন নামে ফিরিয়ে আনার আগে তার আগের ফলাফল, সুবিধাভোগী এবং নীতিগত ভিত্তি পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। বিশেষ করে যদি আগের নীতিতে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সুবিধা পেয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা ছাড়া একই ধরনের বাজার কাঠামো নতুন করে তৈরি করলে তাতে জনস্বার্থ সংরক্ষিত হবে না।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এ প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়ার পর নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মাত্র চার দিনের মধ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য চার দিনের মধ্যে খসড়া নীতিমালা প্রস্তুতের নির্দেশ দেয়া হয়। এত অল্প সময়ে একটি কৌশলগত খাতের এত বড় কাঠামোগত পরিবর্তনের খসড়া তৈরির উদ্যোগকে স্বাভাবিকভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। গত ৬ আগস্ট বাংলাদেশ অয়েল, গ্যাস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ফেডারেশন চট্টগ্রামে জরুরি সভা করে প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছে, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি, বিক্রয় ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা, যমুনা ও এলপিজি খাতের সিবিএ নেতারাও এই উদ্যোগকে সরকারের জন্য আত্মঘাতী এবং দেশের জন্য বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেছেন। তাদের অভিযোগ, সরকারের ভেতরে থাকা একটি দুর্নীতিবাজ ও সুবিধাবাদীচক্র এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অভিযোগটি সত্য কি না, তা তদন্তের বিষয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই আপত্তি এসেছে জ্বালানি খাতের ভেতর থেকে। ফলে এটিকে নিছক রাজনৈতিক বিরোধিতা বা প্রোপাগান্ডা হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রক্রিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বেসরকারিকরণের পক্ষে একটি প্রচলিত যুক্তি হলো, বিপিসি অদক্ষ এবং লোকসানি। কিন্তু সাম্প্রতিক আর্থিক হিসাব বিপিসির লোকসানের এই চিত্র দেখায় না। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিপিসির লোকসান ছিল ১ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সেই লোকসান বেড়ে ৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকায় পৌঁছায়। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও মুনাফা ছিল ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ পরপর দুই অর্থবছরে বিপিসি হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা বা সংস্কারের প্রয়োজন থাকলেও এটিকে শুধুই একটি ব্যর্থ, লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিত্রিত করাও সঙ্গত নয়। বরং এই হিসাব থেকে ভিন্ন একটি বিষয়ও স্পষ্ট হয়। বিপিসির আয়-ব্যয়ের ওপর আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে এবং সরকার যদি দেশীয় বাজারে সেই পুরো মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তার ওপর চাপিয়ে না দেয় এবং ভুর্তুকী বৃদ্ধি করে তাহলে বিপিসির ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়।
বর্তমান আন্তর্জাতিক সংকটকালেও ঠিক তেমনটাই হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংঘাত ও অনিশ্চয়তা এবং বিশ্ববাজারে দৈনিক প্রায় এক কোটি ব্যারেল সরবরাহ ঘাটতির পরিস্থিতিতে জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা এসেছে। জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে দাম দ্বিগুণ হওয়ার পরও ভোক্তার ওপর পুরো মূল্যবৃদ্ধি না চাপানোর কারণে বিপিসি এখন প্রতিদিন প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। এখানে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের একটি বিশেষ ভূমিকা রাখার সুযোগও থেকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির পুরো চাপ তাৎক্ষণিকভাবে ভোক্তার ওপর না দেওয়ার মাধ্যমে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু একটি বেসরকারি কোম্পানি একই ধরনের লোকসান দীর্ঘদিন বহন করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সুতরাং বিপিসির আর্থিক দুর্বলতা থাকলে এর সংস্কার প্রয়োজন, কিন্তু সে সংস্কারের যৌক্তিক ফল হিসেবে পুরো জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা বেসরকারি খাতে দিয়ে দিলে তা হবে ভীষণভাবে আত্মঘাতী।
এখানে আরো কিছু বাস্তবতাও আছে। পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন এবং বিপুল আর্থিক সক্ষমতা দরকার। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বড় পরিমাণ তেল কিনতে শত শত কোটি ডলারের ব্যাংকিং সুবিধাও প্রয়োজন। বাংলাদেশে এমন অবকাঠামো ও আর্থিক সক্ষমতা হাতেগোনা কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া তুলে দিয়ে বাজার খুলে দেওয়া হলেও বাস্তবে বাজারটি ছোট কয়েকটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আর এখানেই শংকা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সংসদ, সরকারি নিরীক্ষা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং জনসমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু একটি বেসরকারি কোম্পানির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে আলাদা করে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়। সে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা দুর্বল হলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের স্থলে তৈরি হতে পারে বেসরকারি অলিগার্ক কালচার।
এ ভয় বা আশঙ্কা একেবারে কল্পনাপ্রসূতও নয়। বাংলাদেশে এলপিজি বাজারের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, সরকার একটি মূল্য নির্ধারণ করে দিলেই বাজারে সেই দাম কার্যকর হয় না। বেসরকারি সরবরাহকারী ও ব্যবসায়ীদের বাজারক্ষমতা, সিন্ডিকেট এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণে ভোক্তারা অনেক সময় সরকার ঘোষিত দামে এলপিজি কিনতে পারেন না। এ কারণে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় জ¦ালানি খাতকে বেসরকারি কাঠামোয় দিয়ে দেয়ার সময় এখনো আসেনি। বেসরকারি কোম্পানির হাতে ব্যবস্থা ছেড়ে দিলে এলপিজি খাতে যে ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে, পুরো জ¦ালানি খাতেই এর পুনরাবৃত্তি হতে পারে। ডিজেল ও পেট্রোলের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও গুরুতর হতে পারে। কারণ এলপিজির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হলেও ডিজেল-পেট্রোলের সঙ্গে কৃষি, পরিবহন, শিল্প, বিদ্যুৎ ও অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তর সরাসরি যুক্ত।
জ্বালানি তেলের বাজারের আকারও এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে সামান্য অতিরিক্ত মার্জিনও বিপুল অর্থে পরিণত হতে পারে। প্রতি লিটারে মাত্র এক টাকা বাড়তি মুনাফা হয়তো ব্যক্তিগত পর্যায়ে তেমন বড় মনে হবে না। কিন্তু দেশের বিপুল জ্বালানি ব্যবহারের ওপর সেটি প্রয়োগ করলে বছরে হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ তৈরি হতে পারে। এ অর্থ শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়িক মুনাফা হিসেবে কোথাও জমা হবে, আর তার উৎস হবে ভোক্তার ব্যয়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আবার সরাসরি এক জায়গায় থেমে থাকে না। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, শিল্পের খরচ বাড়ে এবং পণ্যের দাম বাড়ে। ফলে একটি নিয়ন্ত্রিত জ্বালানি বাজারের সামান্য অদক্ষতা যেমন বড় সমস্যা, তেমনি একটি দুর্বল নিয়ন্ত্রিত বেসরকারি বাজারও বড় মূল্যস্ফীতির উৎস হতে পারে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অবশ্যই অস্বাভাবিক। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি ঘিরে ঝুঁকি এবং বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য বাস্তব সমস্যা। এই সংকটে দ্রুত আমদানি প্রয়োজন। কিন্তু সংকটের সময় নেওয়া সিদ্ধান্ত যেন দীর্ঘমেয়াদি বাজার কাঠামোর পরিবর্তনের সুযোগ হয়ে না যায়, তাও নিশ্চিত করা জরুরি। গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রে জমাদানের সময় ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংকটকালে সময় কমানোর প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বড় সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণের জন্য ১০ দিন যথেষ্ট কি না, প্রতিযোগী দরদাতার সংখ্যা এতে কমবে কি না এবং শেষ পর্যন্ত সরকার ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ হারাবে কি না, এসব বিষয়ে কারিগরি বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করা উচিত। দ্রুততা তখনই জনস্বার্থে পরিণত হয়, যখন তার সঙ্গে স্বচ্ছতা থাকে। অন্যদিকে দ্রুততার নামে অস্থিরতা তৈরি হলে এর প্রভাব পুরো বাজারের ওপরই নেতিবাচকভাবে পড়ার আশংকা থেকে যায়।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো স্বচ্ছতা। বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের যে খসড়া নীতিমালা নিয়ে কাজ চলছে, সেটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এ নীতির পেছনে কোনো সমীক্ষা বা খরচ-সুবিধা বিশ্লেষণ থাকলে তাও প্রকাশ করা উচিত। কোনো কোম্পানি বা শিল্পগোষ্ঠী এ বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছে কি না, দিলে তাদের পরিচয়ও প্রকাশ করা দরকার। কারণ একটি কৌশলগত বাজারের নীতি যদি আগে থেকেই কোনো সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর স্বার্থকে সামনে রেখে তৈরি হয়, তাহলে নীতির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এ কারণেই অন্তত ৬০ দিনের জনমত গ্রহণের সুযোগ রাখা যেতে পারে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানি আয়োজন করা যেতে পারে। বিরোধী দল, সিপিডি, ক্যাব, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক ফেডারেশন এবং ভোক্তা প্রতিনিধিদের সেখানে মতামত দেওয়ারও সুযোগ থাকা উচিত।
বাংলাদেশের পরিশোধন সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে মূলত একটি প্রধান শোধনাগার, চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিকে কেন্দ্র করে। ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অপরিশোধিত তেল পরিশোধন, আমদানিনির্ভরতা এবং কৌশলগত মজুতের সঙ্গে ইস্টার্ন রিফাইনারির ভবিষ্যৎ সরাসরি সম্পর্কিত। কৌশলগত মজুত সক্ষমতাও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ বা সরবরাহ সংকট তৈরি হলে যে দেশ কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের প্রয়োজনীয় জ্বালানি মজুত রাখতে পারে, তার দরকষাকষির ক্ষমতা ও নিরাপত্তা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই প্রশ্নটি শুধু কে তেল আমদানি করবে, তা নয়। বরং দেশের নিজস্ব পরিশোধন ক্ষমতা কতটা বাড়ানো হবে, মজুত কতটা শক্তিশালী করা হবে এবং সংকটের সময়ে রাষ্ট্রের হাতে কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তা নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এখন যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, এর প্রভাব কয়েক মাস বা কয়েক বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হবে আগামী দিনের জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্থিতি এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন। বাজারে বেসরকারি বিনিয়োগ আসুক, প্রতিযোগিতা বাড়ুক, দক্ষতা বাড়ুক, এতে আপত্তির কারণ নেই। কিন্তু সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে জনস্বার্থ। রাষ্ট্রীয় মনোপলি ভাঙার নামে যদি কয়েকটি বেসরকারি গোষ্ঠীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা সংস্কার হবে না, কেবল নিয়ন্ত্রণের মালিকানা বদলাবে। জ্বালানি খাতকে তাই দ্রুত কারও হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে প্রথমে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ানো, বিপিসিকে সংস্কার করা, অবকাঠামো উন্নত করা এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ জ্বালানি তেলের বাজারে ভুল সিদ্ধান্তের ক্ষতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবের খাতায় দেখা যায় না। তার মূল্য দিতে হয় কৃষককে, শ্রমিককে, পরিবহনযাত্রীকে, শিল্পোদ্যোক্তাকে এবং দিনশেষে দেশের প্রতিটি পরিবারকে। রাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত তাই স্বচ্ছতার আলোতেই হওয়া উচিত। বাজারের দরজা খোলার আগে রাষ্ট্রের নিজের সক্ষমতার দরজাগুলো কতটা মজবুত, সেটিই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।