জাফর আহমাদ
যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না তাদের সম্পর্কে কুরআন তিনটি বিধান দিয়েছে। এক, তারা কাফের। দুই, তারা জালিম। তিন, তারা ফাসিক। এর পরিস্কার অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম ও তার নাযিল করা আইন ত্যাগ করে নিজের বা মানুষের মনগড়া আইনের ভিত্তিতে ফায়সালা করে সে আসলে বড় ধরনের অপরাধ করে। প্রথমত: তার এ কাজটি আল্লাহর হুকুম অস্বীকার করার শামিল। কাজেই এটি কুফরী। দ্বিতীয়ত: তার এ কাজটি ইনসাফ ও ভারসাম্যনীতির বিরোধী। কারণ, আল্লাহ যথার্থ ইনসাফ ও ভারসাম্যনীতি অনুযায়ীই হুকম দিয়েছিলেন। কাজেই আল্লাহর হুকুম থেকে সরে এসে যখন সে ফায়সালা করলো তখন সে আসলে জুলুম করলো। তৃতীয়ত: বান্দা হওয়া সত্ত্বেও যখনই সে নিজের প্রভুর আইন অমান্য করে নিজের বা অন্যের মনগড়া আইন প্রবর্তন করলো তখনই সে আসলে বন্দেগী ও আনুগত্যের গণ্ডীর বাইরে পা রাখলো। আর এটি অবাধ্যতা বা ফাসেকী। বর্তমানে আমাদের দেশে যেই আইন চালু আছে তা অবশ্যই আল্লাহর দেয়া আইন নয়। এটি মানুষের মস্তিস্ক প্রসূত আইন। একই সাথে আমরা আল্লাহর খাঁটি বান্দা হিসাবে নিজেদেরকে পরিচয় দেই কিন্তু আইন-আদালতে মানুষের প্রবর্তিত মনগড়া আইন দিয়ে বিচার-ফয়সালা করি। সত্যিকার অর্থে আমরা আল্লাহর খাঁটি বান্দা নই। কাফের না হলেও জালিম ও ফাসেক হিসাবে চিহ্নিত হবো। এই অবস্থা থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই এই আইন পরিবর্তন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
এ কুফরী, জুলুম ও ফাসেকী তার নিজের ধরন ও প্রকৃতির দিক দিয়ে অনিবার্যভাবেই পুরোপুরি আল্লাহর হুকুম অমান্যেরই বাস্তব রূপ। যেখানে আল্লাহর হুকুম অমান্য করা হবে সেখানে এ তিনটি বিষয় থাকবে না, এটা কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। তবে আল্লাহর হুকুম অমান্য করার যেমন পর্যায়ভেদ আছে তেমনি এ তিনটি বিষয়েরও পর্যায়েরও পর্যায়ভেদ আছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুমকে ভুল এবং নিজের বা অন্য কোন মানুষের হুকুমকে সঠিক মনে করে আল্লাহর হুকুম বিরোধী ফয়সালা করে সে পুরোপুরি কাফের, জালেম ও ফাসেক। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুমকে সত্য বলে বিশ্বাস করে কিন্তু কার্যত তার বিরুদ্ধে ফায়সালা করে সে ইসলামী মিল্লাত বহির্ভূত না হলেও নিজের ঈমানকে কুফুরী, জুলুম ও ফাসেকীর সাথে মিশিয়ে ফেলেছে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে সে সকল ব্যাপারেই কাফের, জালেম ও ফাসেক। আর যে ব্যক্তি কিছু ব্যাপারে আল্লাহর অনুগত এবং কিছু ব্যাপারে অবাধ্য তার জীবন ঈমান ও ইসলাম এবং কুফরী, জুলুম ও ফাসেকীর মিশ্রণ ঠিক তেমনি হারে অবস্থান করছে যে হাওে সে আনুগত্য ও অবাধ্যতাকে এক সাথে মিশিয়ে রেখেছে। তাফসীবে ইবনে কাসির একই কথা বলেছেন।
আল্লাহ তা’আলা বলেন, “এবং সামান্য তুচ্ছ মূল্যের বিনিময়ে আমার আয়াত বিক্রি করা পরিহার করো। আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না তারাই কাফের।” (সুরা মায়েদা : ৪৪)
আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই জালেম।” (সুরা মায়েদা : ৪৫)
আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই ফাসেক।” (সুরা মায়েদা : ৪৭)
কেউ কেউ এ আয়াতগুলোকে আহলি কিতাবদের সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কিত বলে গণ্য করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ তাফসীর গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর কালামের শব্দের মধ্যে এ ধরনের ব্যাখ্যা করার কোন অবকাশ নেই। তাফসীরে ইবনে কাসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ আয়াতগুলো শানে নুযুল হিসেবে আহলে কিতাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও হুকুমের দিক দিয়ে এটি সমস্ত লোকের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। এগুলো বনী ইসরাঈল সম্পর্কে নাযিল হয়েছে বটে; কিন্তু এ উম্মতেরও এটাই হুকুম। ইবনে মাসউদ রা: ্বলেন, ঘুষ খেয়ে কোন শরয়ী মাসআলার ব্যাপারে উল্টো রায় দেয়া কুফরী। সুদ্দি রহ: বলেন যে,যদি ইচ্ছাকৃত আল্লাহর অহীর বিপরীত ফতোয়া দেয়, জানা সত্ত্বেও তার উল্টো করে তবে সে কাফের। ইবনে আব্বাস রা: বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ফরমানকে অস্বীকার করবে তার হুকুম এটাই। আর যে ব্যক্তি অ¯ী^কার করলা না বটে কিন্তু সে মোতাবেক বললো না, সে জালিম ও ফাসেক। সে আহলে কিতাবই হোক আর যে কেউ হোক। আতা রহ: বলেন, কুফরীর মধ্যে যেমন কমবেশী আছে তেমনি জুলুম ও ফাসেকীর মধ্যে কমবেশী আছে।
আইন-আদালত ও বিচার ব্যবস্থা ছাড়াও মানবতার সার্বিক কলাণের জন্য ইসলামী পবিবেশ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তাই একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যও বিশেষভাবে তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি সমাজ ব্যবস্থাকে সুস্থ সবল করে সে গুলোর প্রচলন (আমরে বিল মারুফ) এবং সমাজ ব্যবস্থাকে কুলুষিত করে এবং সমাজকে অস্থির করে তুলে সেগুলোর নিষিদ্ধ করণের (নাহি আনিল মুনকার) জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এ ধরনের সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সালাত ও সওমের মতোই বাধ্যতামূলক। কেউ যদি শুধু সালাত ও সাওম পালনকেই যথেষ্ট মনে করেন তবে অবশ্যই তিনি মহাক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত আছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমরাই দুনিয়ার সর্বোত্তম দল। তোমাদের উন্মেষ ঘটানো হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। তোমরা ভালো কাজের হুকুম দিবে এবং দুস্কৃতি থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।” (সুরা আলে ইমরান : ১১০) কুরআন অনুযায়ী জীবন ব্যবস্থা পরিচালনা করলেই কেবল জীবন কল্যাণকর হয়। এই কিতাবের মধ্যেই মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এই কিতাব শুধু তেলাওয়াতের জন্য নাযিল হয়নি বরং এই কুরআন অনুযায়ী সার্বিক জীবন গড়ে তুলতে হবে। উল্লেখ্য শুধু আইন-আদালতে বিচার ফয়সালাই নয় জীবনের সকল ক্ষেত্রেই কুরআনের ফয়সালা মেনে চলার বিকল্প নেই।
লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।