স্টাফ রিপোর্টার

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে আইআরআইয়ের সাম্প্রতিক দেশব্যাপী জরিপের ফলাফল, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে মতবিনিময় করেন দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা।

গতকাল রোববার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আইআরআইয়ের সেন্টার ফর ইনসাইটস ইন সার্ভে রিসার্চের সিনিয়র ডিরেক্টর সোনজা গ্লোয়েকলে বাংলাদেশ সফরে এসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে পরিচালিত জরিপের ফলাফল ব্রিফিং করছেন। এরই অংশ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

বৈঠকে আইআরআই বাংলাদেশের রেসিডেন্ট প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জন ফ্লুহারথি, টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজর অমিতাভ ঘোষ এবং টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজর রুকসানা হক উপস্থিত ছিলেন।

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির এবং বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য আলী আহমাদ মাবরুর। বৈঠকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আইআরআইয়ের জরিপে উঠে আসা বিভিন্ন বিষয়, এর সম্ভাব্য প্রভাব এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও মতবিনিময় করেন তারা।

আইআরআইয়ের সাম্প্রতিক জরিপের ফলাফলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

এ সময় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অ্যাডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মুনির বিগত নির্বাচনে দলের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে আগামীতে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য জামায়াতে ইসলামীর পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন সুপারিশ আইআরআই প্রতিনিধি দলের সামনে উপস্থাপন করেন। বৈঠকে দুই পক্ষ দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, নির্বাচনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।

গুম আইনের আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হয়নি: শিশির মনির

প্রস্তাবিত গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ আইনের খসড়া আন্তর্জাতিক মানদ- থেকে পিছিয়ে গেছে এবং গুমের তদন্তভার পুলিশের ওপর ন্যস্ত করাকে ‘তদন্ত না করার শামিল’ বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটি ‘ন্যূনতম প্রতিযোগিতা’ থাকা সুস্থ পরিবেশের জন্য জরুরি বলে মত দিয়েছেন তিনি।

গতকাল রোববার সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

প্রস্তাবিত নতুন গুম আইনের সমালোচনা করে শিশির মনির বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, অধিকতর উন্নত একটি আইন তারা প্রস্তাব করবেন। কিন্তু বর্তমানে যে ড্রাফট (খসড়া) দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যায় তারা আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড থেকে সরে এসেছেন। আগের অধ্যাদেশে ‘ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অফ হিউম্যান রাইটস’ বা ‘ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইটস’-এর রেফারেন্স থাকলেও বর্তমান আইনে তার কোনো উল্লেখ নেই।’

গুমের তদন্তভার পুলিশের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘গুমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আমাদের ইতিহাসে আমরা দেখেছি এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সের সব জায়গায় হয়তো কোথাও পুলিশের সদস্য, না হয় র‌্যাবের সদস্য, না হয় ডিজিএফআইয়ের সদস্য জড়িত থাকেন। সেই অপরাধের তদন্ত করতে দেওয়া হচ্ছে এখন আবার পুলিশকেই! এর অর্থ হবে- এই অপরাধকে তদন্ত করার আর কোনো দরকার বাস্তবে থাকবে না। পুলিশের করা অপরাধের তদন্ত পুলিশকে দেওয়া বাস্তব অর্থে তদন্ত না করারই শামিল।’

গুমের তথ্যভা-ার প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘পূর্বের আইনে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল মানবাধিকার কমিশনের। কিন্তু এই আইনে তা দেওয়া হচ্ছে সরকারকে। সরকার কি চায় যে বাংলাদেশে কী পরিমাণ মানুষ গুম হয়েছে তার তথ্য প্রকাশ করতে? এটি কোনো ইনকামবেন্ট গভর্নমেন্ট (দায়িত্বে থাকা সরকার) কোনোদিন প্রকাশ করতে চায় না।’

৭০ অনুচ্ছেদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে শিশির মনির বলেন, ‘নির্বাচন মানে কি? আপনার অপশন থাকতে হবে- কাকে ভোট দেবেন, কাকে ভোট দেবেন না। যদিও ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে কোনো সংসদ সদস্য দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন না, দিলে তার সদস্য পদ থাকে না। কিন্তু রাষ্ট্রপতি যেহেতু একটা নির্বাচন, সুতরাং এখানে একটা মিনিমাম প্রতিযোগিতা থাকা উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই চার্টারে ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা দেওয়ার প্রশ্ন এসেছিল। জুলাই সনদ তো বাস্তবায়িত হয় নাই। তবে ৭০ অনুচ্ছেদ সবসময় সংবিধানে থাকবে না। যে সংবিধান সংস্কার করার প্ল্যান করা হচ্ছে, সেখানে এই বিধান থাকছে না। দিস ইজ এ বিগেনিং অফ সামথিং গুড, লেট ইট বি ডান উইথ দ্য প্রসেস অফ দ্য কনস্টিটিউশনাল জার্নি। (এটি ভালো কিছুর সূচনা, সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এটি সম্পন্ন হতে দেওয়া হোক।)’

বর্তমান সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। যারা পদত্যাগ করেন নাই কিংবা যাদের সদস্যপদ বাতিল হয়নি, তারা সকলেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। আর এমপিদের মধ্য থেকে কেউ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে নিয়ম অনুযায়ী তার ওই আসনটি শূন্য ঘোষণা করতে হবে।’