বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী
দেশে সিমেন্টের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান চুনাপাথর বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে। আর এই আমদানি বাবদ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করা হচ্ছে। অথচ দেশেই এই চুনাপাথর পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যমান রয়েছে। জয়পুরহাটের চুনাপাথর তার অন্যতম।
জানা গেছে, এই চুনাপাথর জয়পুরহাটের ভূগর্ভে বিপুল পরিমাণে মওজুদ থাকা সত্ত্বেও তা উত্তোলন না করে ফেলে রাখা হয়েছে। এনিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানি করার সহজ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়ায় উত্তরাঞ্চলের অন্যতম এই খনিজ সম্পদ এমনিতেই পড়ে রয়েছে।
বাংলাদেশে সিমেন্ট, ইস্পাত ও নির্মাণ খাতে চুনাপাথরের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও কাঁচ তৈরি, কাগজ শিল্প, কেমিকেলের কাজ এবং রঙ ও প্রসাধন কারখানায় এর কদর রয়েছে। বর্তমানে এর বার্ষিক চাহিদা প্রায় কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে, যার প্রায় পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হয়। অভ্যন্তরীণ খনিগুলো থেকে নামমাত্র উত্তোলন হওয়ায় মূলত প্রতিবেশি ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশের ক্রমবর্ধমান মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামো নির্মাণের ফলে প্রতি বছর চুনাপাথরের চাহিদা আরো বাড়ছে। স্থলবন্দর ও নদীপথের মাধ্যমে ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে চুনাপাথর ও পাথর আমদানি করা হয়। এছাড়া মিশর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ- যেমন ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও প্রিমিয়াম মানের চুনাপাথর আনা হয়।
জয়পুরহাটের খনিতে চুনাপাথর
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জয়পুরহাটের খনিতে ৫১৮ থেকে ৫৪৯ মিটার গভীরতায় ১৫ মিটার গড় পুরুত্বের চুনাপাথর মওজুদ আছে। এই খনিতে মওজুদ থাকা প্রায় ২৭ কোটি টনের মধ্যে প্রায় ১০ কোটি টন উত্তোলনের যোগ্য। দেশের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী এ খনিজটি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাতও হতে পারে। ১৯৬১ সালে গন্ডোয়ানা কোল অনুসন্ধানের সময় জয়পুরহাটে চুনাপাথরের খনির সন্ধান মেলে। দেশের খনিজ সম্পদের জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এই খনির চুনাপাথর অত্যন্ত উঁচুমানের। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেখান থেকে চুনাপাথর উত্তোলন সম্ভব। ভারতসহ অনেক দেশই বাংলাদেশের চেয়ে অনেক গভীরের খনি থেকে চুনাপাথর তুলছে। কিন্তু অর্থায়নের উৎস না পাওয়ার পাশাপাশি তাপমাত্রা ও ভূগর্ভস্থ পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জের কারণে জয়পুরহাটের খনি থেকে চুনাপাথর উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানানো হতো। তবে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে সেখান থেকে চুনাপাথর উত্তোলন করা সম্ভব হতে পারে। ভারত ও অন্য দেশগুলোতে উন্মুক্ত এবং আন্ডারগ্রাউন্ড চুনাপাথর আছে। বাংলাদেশের তুলনায় মাটির অনেক নিচ থেকে তারা চুনাপাথর উত্তোলন করছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, এই চুনাপাথর উত্তোলন করে ক্লিংকার ফ্যাক্টরিতে যদি সরবরাহ করা যায়, তাহলে দেশকে সিমেন্টে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে বেশি সময় লাগবে না। এছাড়াও উত্তরাঞ্চলের চিনিকললোতে প্রচুর পরিমাণে কলিচুন বা চুন-এর প্রয়োজন হয়। এটিও প্রতিবছর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে আমদানি করতে হয়। জয়পুরহাটের চুনাপাথর ব্যবহার করে অনেক ছোট আকারের কলিচুন ফ্যাক্টরি গড়ে তোলা যায়। যা গ্রামীণ কর্মসংস্থানে সহায়ক হতে পারে। এ ধরণের ফ্যাক্টরি গড়ে তুলে দেশের অভ্যন্তরের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ ও বেকারত্ব লাঘব করা সম্ভব বলে মনে করা হয়।
আমদানিতে উৎসাহই বাধা
এই প্রকল্প নিয়ে মাঝে মধ্যে সরকারি পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা চলতে শোনা যায়। কিন্তু তার বাস্তব অগ্রগতি দেখা যায় না। অভিযোগ আছে যে, বিদেশ থেকে চুনাপাথর আমদানির মাধ্যমে নগদ নগদ সুবিধা হাসিলের অংশ হিসেবেই জয়পুরহাটের চুনাপাথর উত্তোলনে একটি মহল বাধা দিয়ে এসেছে। সূত্রমতে, জয়পুরহাট চুনাপাথর প্রকল্পের যাবতীয় পরীক্ষার কাজ আশির দশকের মাঝামাঝি সম্পন্ন হয়েছিল। এর জরিপ, প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক কাজে ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ও হয়েছিল। কিন্তু বিদেশি পণ্য আমদানিতে উৎসাহী মহলটির নেপথ্যে প্রতিবন্ধকতার কারণে এর মূল বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়নি। উল্লেখ্য, অতীতে বিভিন্ন দেশ এই প্রকল্পের পেছনে কাজ করে এবং এর সম্ভাব্যতা ও আর্থিক লাভের বিষয় সুনিশ্চিত করে। বর্তমান সময়ে উত্তরাঞ্চলে যাতায়াতের সুবিধা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে এ ব্যাপারে আর কোনো প্রতিবন্ধকতার প্রশ্ন থাকে না বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।
এব্যাপারে কথা হয় রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর গবেষক ড. ইসমাঈল হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, জয়পুরহাট চুনাপাথর প্রকল্পের পরিচয় বহুদিনের। এর বাস্তবায়ন করা গেলে দেশ অবশ্যই লাভবান হবে। পূর্ববর্তী সময়ে একটা হিসাব এমন ছিল যে, স্থানীয় খনি থেকে উত্তোলন লাভজনক হবে নাকি বিদেশ থেকে আমদানি করলে। তবে এখন প্রযুক্তিগত উন্নতি ও দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে অনেক কিছুই সহজ হয়ে গেছে। তাই এখন এই প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। নিজেদের সম্পদ অবহেলায় ফেলে রাখা যুক্তিযুক্ত হবে না বলে তিনি মনে করেন।