সড়ক যেন এখন আর শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, অনেকের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানির খবর আসছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, সিলেটের ওসমানী নগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৮ জন নিহত হয়েছে। গত শুক্রবার সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এদিকে বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়কে বাসচাপায় ৭ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১৫ জন। শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঝিনাইদহে নিহত হয়েছেন ১ জন গাড়ি চালক। এ খবর আবারও আমাদের সামনে ভয়াবহ বাস্তবতাটি তুলে ধরেছে। এ মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। আমরা নিহতদের জন্য শোক প্রকাশ করছি, পরিবারের প্রতি জানাই সমবেদনা। প্রশ্ন হলো, আর কত প্রাণ গেলে সড়ক নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেয়া হবে?

অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত আরেকটি খবরে বলা হয়েছে ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে সারা দেশে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত এবং ৬২৯ জন আহত হয়েছেন। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ, শুধু একটি মাসের হিসাবেই চার শতাধিক পরিবার তাদের প্রিয়জন হারিয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েক শ মানুষ।

এ প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই এক দিনে অন্তত ১৬ জনের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর খবর এল। সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশে নতুন কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলতে থাকলেও কার্যকর সমাধানের ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি নেই। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, কিছুদিন আলোচনা হয়, দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নানা প্রতিশ্রুতি দেন। তারপর আবার সবকিছু আগের মতো চলতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। বেপরোয়া ও অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, চালকের অদক্ষতা ও দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর ফলে ক্লান্তি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের নকশাগত দুর্বলতা, অপরিকল্পিত ইউটার্ন, পর্যাপ্ত সড়কবাতির অভাব এবং পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা না থাকা সব মিলিয়েই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আইন প্রয়োগের দুর্বলতা ও পরিবহন খাতে নানা অনিয়ম।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দুর্ঘটনার পর আমরা সাধারণত দায়ী ব্যক্তিকে খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি; কিন্তু দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিই না। একটি দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো একই ধরনের দুর্ঘটনা যাতে পুনরায় না ঘটে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আইন আছে, নীতিমালা আছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও আছে। প্রয়োজন মূলত এসবের যথাযথ প্রয়োগ। লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতা কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে। চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালাতে না হয়। একই সঙ্গে সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না।

মহাসড়কগুলোর নকশা ও নিরাপত্তাব্যবস্থাও নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পর্যাপ্ত সাইন, স্পিড ক্যামেরা, আলোকসজ্জা, নিরাপদ পারাপার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় ডিভাইডার স্থাপন করতে হবে। যেখানে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে, সেসব স্থানকে ‘দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব কম নয়। যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

আমরা মনে করি সড়ক নিরাপত্তাকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও মানবাধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একজন কর্মক্ষম মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে একটি পরিবার শুধু প্রিয়জনকেই হারায় না, অনেক সময় পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকেও হারায়। আহত ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয়ও অনেক পরিবারের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে। তাই সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতিও বিশাল। এদিকে দৃষ্টি দিয়ে দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। আমরা সরকারের কাছে যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানাই। নিহত ও আহতদের পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানের আহ্বান জানাই।