৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দিন। দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে এদিন জনগণের অভ্যুত্থান নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করে। জুলাইজুড়ে সংঘটিত আন্দোলনে হাজারো মানুষ শহীদ হন; অসংখ্য মানুষ আহত হন। আন্দোলন দমনে ফ্যাসিবাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পরিচালিত প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন ও গণহত্যার অভিযোগ জাতির বিবেককে আজও গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান, যখন জনগণের অদম্য প্রতিরোধের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এভাবেই একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে এবং নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা জন্ম নেয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত উচ্চারণ। এই আন্দোলনের পথে অসংখ্য মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছেন, আহত হয়েছেন, পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে। জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। তাঁদের রক্তের ঋণ কোনো আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে শোধ করা সম্ভব নয়। এই ঋণ শোধের একমাত্র পথ হলো এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার এবং জনগণের ভোট ও মতের মর্যাদা নিশ্চিত হবে।
ইতিহাসের শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট। যে কোনো শাসনব্যবস্থা জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে, মানুষের মৌলিক অধিকার সংকুচিত করে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করে কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে জনগণের পরিবর্তে একটি গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহার করে, শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে না। ক্ষমতার বলয় যত শক্তিশালীই মনে হোক না কেন, জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির কাছে তা একসময় পরাজিত হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সেই ঐতিহাসিক সত্যেরই আরেকটি প্রমাণ।
তবে ইতিহাস আমাদের আরেকটি সতর্কবার্তাও দেয়। স্বৈরশাসনের পতন কোনো যাত্রার শেষ নয়, বরং একটি নতুন যাত্রার সূচনা। অনেক সময় দেখা যায়, আন্দোলনের সাফল্যকে কেন্দ্র করে প্রত্যাশা তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটে অথবা রাজনৈতিক সংকীর্ণতা বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে আড়াল করে ফেলে। তখন জনগণের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই আজ সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো জুলাইয়ের চেতনাকে কেবল স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে তার প্রতিফলন নিশ্চিত করা। এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের অধিকার হরণ করতে না পারে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
একই সঙ্গে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ ও আন্তরিক বাস্তবায়ন সময়ের অপরিহার্য দাবি। জনগণের আকাক্সক্ষা, আন্দোলনের অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র বিনির্মাণের রূপরেখা হিসেবে যে নীতিমালা ও প্রতিশ্রুতিগুলো গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্য নিশ্চিত হবে। কোনো ধরনের কালক্ষেপণ বা রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কারণে এই প্রতিশ্রুতি অপূর্ণ থেকে গেলে তা শুধু একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতাই হবে না, বরং শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতিও অবিচার হিসেবে বিবেচিত হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জুলাইয়ের রক্তের সঙ্গে যেন কোনো বেইমানি না হয়। শহীদদের আত্মত্যাগকে দলীয় প্রতিযোগিতা বা সংকীর্ণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের উপকরণে পরিণত করা চলবে না। তাঁদের রক্ত একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে। সেই স্বপ্ন ছিল ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র, জবাবদিহিমূলক শাসন, মানবিক মর্যাদা এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিষ্ঠা। এই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি মানেই হবে ইতিহাসের সঙ্গে, জাতির সঙ্গে এবং শহীদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, বাংলাদেশে আর কখনো কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবির্ভাব না ঘটে। এবার জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী এমন একটি সময়ে অতিবাহিত হতে যাচ্ছে যখন দিন কয়েক আগে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তার কথিত আগমনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে অস্থিতিশীলতার আশংকা তৈরি হয়েছে। হাসিনা ফিরলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতেই হবে। কিন্তু এই ফেরাকে ঘটনা করে দেশে ভয়াবহ অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার অপপ্রয়াসও চালানো হবে। হাসিনার প্রত্যাবর্তনের আড়ালে ফ্যাসিবাদের পুনরাগমন এবং দেশের ভেতরেও আর কোনো শক্তি যেন ফ্যাসিবাদী না হয়ে উঠতে পারে সে ব্যাপারে আমাদের সচেষ্ট থাকা জরুরি। এর জন্য শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, অবাধ গণমাধ্যম, শক্তিশালী নাগরিক সমাজ এবং সর্বোপরি এমন একটি নির্বাচন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা দরকার যেখানে জনগণের রায়ই হবে ক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারলেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে আরও নিরাপদ, আরও গণতান্ত্রিক। ৫ আগস্ট তাই কেবল বিজয়ের স্মারক নয়, এটি আত্মসমালোচনারও দিন। আমরা কি শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি? আমরা কি তাঁদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা করতে পেরেছি? এই প্রশ্নের উত্তরই আমাদের আগামী দিনের বাংলাদেশের পথ নির্ধারণ করবে।