ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির ঠিক আগের দিন, গত মঙ্গলবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ঢাকা আলিয়া মাদরাসা এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক সহিংসতার ঘটনাগুলো দেশের শিক্ষাঙ্গন নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনা শুধু কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের সংঘর্ষ নয়, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আইনের শাসন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ কতটা নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে, তারই একটি অশনিসংকেত।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, অস্থায়ী আবাসনের পরিবর্তে স্থায়ী আবাসন নির্মাণ এবং চিকিৎসাসেবার উন্নয়নের দাবিতে কয়েকজন শিক্ষার্থী প্লাকার্ড প্রদর্শনের উদ্যোগ নেন। দাবি-দাওয়ার পক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু সেই কর্মসূচি চলাকালে ছাত্রদলের হামলায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটে এবং পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস রূপ নেয়। এতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জকসু) ভিপি, জিএস, এজিএস, সদস্য, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তিসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সাংবাদিকসহ অসংখ্য ব্যক্তি আহত হন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরও সেখানে হাসপাতালের ভেতর ঢুকে হামলা চালানো হয়েছে। হাসপাতালের ভেতরেও আহত ব্যক্তিরা যদি নিরাপত্তা না পান, তবে সেটি শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, সভ্য সমাজেরও গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

ঢাকা কলেজেও একই দিনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত একটি আলোচনা সভার প্রস্তুতিকালে একইভাবে হামলা চালিয়েছে ছাত্রদল। সরকারী দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে এসময় দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার এবং বহু শিক্ষার্থীর আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এরপর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা আলিয়া মাদরাসা এলাকায়, যেখানে পূর্ববর্তী সংঘর্ষের জের ও আবাসিক হলসংক্রান্ত বিরোধের প্রেক্ষাপটে নতুন করে সহিংসতা দেখা দেয়। আগের দিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও সংঘর্ষের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। একই সময়ে দেশের একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক সহিংসতার ঘটনা নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, শুধু ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরাই নন; দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও ছাত্রদলের হামলার শিকার হয়েছেন। আহত শিক্ষার্থীদের খোঁজ নিতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনাও অত্যন্ত নিন্দনীয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, সাংবাদিক কিংবা চিকিৎসাকেন্দ্র যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে সেখানে শিক্ষার পরিবেশ কতটা ঝুঁকির মুখে রয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। এসব ঘটনার পর সরকারী দলের ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। কোনো পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় বা সাংগঠনিক অবস্থান বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে না। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনাই হতে হবে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পরও কেন পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা গেল না, কেন সংঘর্ষ ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে হাসপাতাল পর্যন্ত বিস্তৃত হলো এবং কেন আহতদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেল না, এসব প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। প্রশাসনের সামান্য ব্যর্থতাও অনেক সময় বড় ধরনের সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠদানের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি সহনশীলতা, যুক্তিবাদ, ভিন্নমতকে সম্মান এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্র। সেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান যদি লাঠি, রড, ইটপাটকেল কিংবা শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে হয়, তবে সেটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক বার্তা বহন করে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে চিন্তায়, গবেষণায়, নেতৃত্বে এবং সেবামূলক কর্মকা-ে, সহিংসতায় নয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ এমন একটি শিক্ষাঙ্গনের প্রত্যাশা করেছিল, যেখানে দখলদারিত্ব, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান ঘটবে। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে সব ছাত্রসংগঠনকে আত্মসংযম প্রদর্শন করতে হবে এবং মতভিন্নতার সমাধান সংলাপ, যুক্তি ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দল-মত নির্বিশেষে প্রতিটি সহিংস ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।