চুক্তি, শপথ, ঘোষণা এই শব্দগুলোর আভিধানিক অর্থ আছে। কিন্তু বর্তমান সভ্যতায় বড় বড় দেশগুলোর আচরণে প্রশ্ন জেগেছে, ওই শব্দগুলোর অর্থ কি পরিবর্তিত হয়ে গেছে? এর প্রভাব পড়ছে অন্য দেশগুলোর আচরণেও। এ জন্যই বলা হয়, মানুষের কথা ও কাজে মিল থাকতে হয়; বিশেষ করে বড় মাপের মানুষদের, সভ্যতার শাসকদের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন যেন বিজয় উদযাপনের মধ্যে রয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, তিনি চুক্তি বা ওয়াদা কতটা রক্ষা করে থাকেন? বরং চাতুর্য ও হুমকি-ধমকির মধ্যেই যেন আনন্দ খুঁজে পান ট্রাম্প। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কথা ও কাজে মিল থাকার মানবিক ও নৈতিক বৈশিষ্ট্য। উল্লেখ্য, ফিলিস্তিনী স্বাদীনতাকামী সংগঠন হামাসের অস্ত্র সমর্পণ ঘোষণার পর থেকেই বিজয়ীর হাঁকডাক শুরু করেছেন ট্রাম্প। তবে বৃহস্পতিবারের অস্ত্র সমর্পণ ঘোষণার সঙ্গে এই শর্তও যুক্ত রয়েছে যে, ইসরাইলী সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা থেকে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। অবশ্য এমন শর্তের জেরে এখন ইসরাইলী রাজনীতিবিদ ও সংবাদমাধ্যমে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইসরাইল সরকার এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। তবে শুক্রবার জনৈক ইসরাইলী কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়, ইসরাইল সেনা প্রত্যাহার করবে নাÑ যতক্ষণ না ‘হামাসের প্রকৃত অস্ত্রসমর্পণ’ সম্পন্ন হবে। অবশ্য ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চুক্তির ব্যাপারে ইসরাইল ‘খুবই আনন্দিত’।

গাজার ফিলিস্তিনীদের প্রতি অনেক ইসরাইলীই কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে থাকে। নিষ্ঠুর আচরণের মাধ্যমে তারা এর প্রমাণও রেখেছে। কেউ কেউ বলে থাকেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসসহ ফিলিস্তিনী স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোর যোদ্ধাদের অভিযানের জেরেই তাদের এ কঠোর অবস্থান। ইতিহাস বিচ্ছিন্ন এসব প্রবক্তাদের মুর্খ ও প্রতারক হিসেবেই বিবেচনা করতে হয়। এক ৭ অক্টোবর নিয়ে এত প্রোপাগান্ডা। কিন্তু কয়েক যুগ ধরে ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনীদের ওপর ইসরাইল সরকারসহ ইহুদিচক্র যে খুন, ধর্ষণ, অত্যাচার ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, বাড়িঘর থেকে বিতারণ করেছে, তার কী হবে? ওদের যুদ্ধাপরাধের বিচার কবে হবে? উল্লেখ্য, ইসরাইলের গণহত্যামূলক আগ্রাসনে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন এবং পুরো গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে এক জরিপে ৮২ শতাংশের বেশি ইহুদি ইসরাইলি জানান, তারা গাজা থেকে ফিলিস্তিনীদের শক্তির মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত করার নীতি সমর্থন করেন। এদিকে মন্ত্রীসহ বিভিন্ন ইসরাইলী নাগরিক অধিকৃত ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে পশ্চিম তীরের মতো গাজায়ও ইহুদি বসতি স্থাপনের প্রচারণা চালাচ্ছেন। এসব বক্তব্য ও আচরণে উপলব্ধি করা যায়, ইহুদিরা কতটা উগ্র, নৃশংস ও সন্ত্রাসী। বর্তমান সভ্যতা ও পাশ্চাত্যের ভ্রষ্ট নীতি ইসরাইল ও ইহুদিদের আসকারা দিয়েছে এবং ফিলিস্তিনীদের নিধন ও উৎখাতের মতো অন্যায় ও নিষ্ঠুর কর্মে সহযোগিতা করেছে।

এমন বাস্তবতায় গাজা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার ও উপত্যকাটি পুনর্গঠনের ধারণা বহু ইসরাইলের কাছে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অস্ত্র সমর্পণের ঘোষনার পর ইসরাইলী রাজনীতিবিদরা এর নিন্দা জানিয়েছেন। উগ্র রক্ষণশীল ইসরাইলী রাজনীতিবদ ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতাসার বেন-গভির এ ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘খুনিদের হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতির অর্থ হামাসকে পরবর্তী হত্যাকাণ্ড চালাতে প্রস্তুতির সময় দেওয়া। গাজায় হত্যাকাণ্ড অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে, অভিবাসীদের বসতি স্থাপনে উৎসাহ দিতে হবে এবং ইসরাইলকে অবশ্যই জয়ী হতে হবে।’ ইসরাইলী নিরাপত্তামন্ত্রীর বক্তব্য খুবই নৃশংস, উগ্র এবং স্পষ্ট। চুক্তি মানার কোনো ইচ্ছেই ইসরাইলের নেই। ফলে ট্রাম্পকে তারা নাচাতেই থাকবেন। এমন বাস্তবতায় কি আশা করা যায়, গাজা থেকে সরে যাবে ইসরাইল? ইসরাইলকে ন্যায়ের ভাষা বোঝাতে বিশ্বব্যবস্থায় প্রয়োজন হবে কিছু মৌলিক পরিবর্তন। মার্কিন নতুন প্রজন্ম ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি অবজ্ঞার যে ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা আশাবাদের একটি কারণ হতে পারে।