বাংলাদেশের ২০২৪ সালে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর জনগণের যে তিনটি মৌলিক আকাক্সক্ষা ছিল তার মধ্যে একটি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। বাকি দুটি ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও অবাধ নির্বাচন এবং গণহত্যার বিচার বাকি রয়েছে রাষ্ট্র সংস্কার। মূলত সংবিধানে সংস্কারই মূল কাজ, যাতে দেশে নতুন করে স্ব্্ৈরাচার চেপে বসতে না পারে। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে অগ্রসর হচ্ছে না। সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা থাকলেও সেটা হয়নি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংবিধান কেবল একটি আইনগত দলিল নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি এবং জনগণের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। তাই সংবিধান সংশোধন বা সংস্কারের যেকোনো উদ্যোগ স্বভাবতই জাতীয় গুরুত্বের বিষয়। এমন উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নয়, বরং রাজনৈতিক ঐকমত্য, অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া এবং জনগণের আস্থার ওপর। সংসদ নির্বাচনের সাথে সাথে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায়ে জাতি প্রায় ৭০ শতাংশ হ্যা ভোট দিয়ে তার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছে। তা রক্ষা করা জরুরি।
কিন্তু সম্প্রতি ক্ষমতাসীন বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পরিবর্তে ১২ সদস্যের একটি সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে। বিরোধী দলগুলোর জন্য পাঁচটি সদস্যপদ বরাদ্দ রেখে প্রতিনিধি মনোনয়নের আহ্বান জানানো হলেও তারা তাতে সাড়া দেয়নি। পরে বিএনপি একতরফাভাবে ৪ আগস্ট কমিটির প্রথম বৈঠক সম্পন্ন করে। এই প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছে জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের অভিযোগ, সংবিধানের মতো জাতীয় বিষয়ে সর্বদলীয় অংশগ্রহণ ও বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐকমত্য নিশ্চিত না করে একতরফা অগ্রসর হওয়া ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
গণতান্ত্রিক চর্চার অভিজ্ঞতা বলে, সংবিধান সংশোধন কেবল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক বৈধতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতারও বিষয়। সংখ্যার জোরে আইন পাস করা সম্ভব হলেও জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া সংবিধানের স্থায়ী গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা কঠিন। বাংলাদেশে সংবিধান বহুবার সংশোধিত হয়েছে। কিন্তু অনেক সংশোধনীই পরবর্তীকালে রাজনৈতিক বিতর্ক, আইনি চ্যালেঞ্জ এবং নতুন সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। বাতিলও হয়েছে আদলত কর্তৃক। এর অন্যতম কারণ ছিল পর্যাপ্ত আলোচনা, অংশগ্রহণ ও মতৈক্যের অভাব। ইতিহাসের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে কেবল রাজনৈতিক দল নয়, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনবিদ, সাবেক বিচারপতি, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন এবং তরুণ প্রজন্মের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ। একটি উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া জনগণের আস্থা বাড়ায় এবং ভবিষ্যৎ বিতর্কের সুযোগ কমিয়ে আনে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে প্রয়োজন পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর করা। ক্ষমতাসীন দলের উচিত বিরোধী দলগুলোর উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার পরিসর আরও সম্প্রসারণ করা। সংবিধান কোনো একক রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের যৌথ অঙ্গীকার। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বিরোধী মতের সহাবস্থানে। সংবিধান সংশোধনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে যদি পারস্পরিক আস্থা, স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা যায়, তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করবে। কিন্তু যদি প্রক্রিয়াটি একতরফা বলে রাজনৈতিক মহলে ধারণা তৈরি হয়, তবে সংশোধনের উদ্দেশ্য যতই মহৎ হোক না কেন, তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর মুহূর্তে বাংলাদেশ আজ এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র না বানিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের প্রকল্পে রূপান্তরিত করাই হবে সময়ের সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। কারণ সংবিধান কখনো এক পক্ষের নয় তা হয় সমগ্র জাতির।
আমার মতে সকল দলের অংশ গ্রহণে প্রণীত জুলাই সনদ ও এর আলোকে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায়কে শ্রদ্ধা জানানো উচিৎ। সরকার সংবিধান সংশোধনের পথ থেকে সরে এসে সংস্কারের পথে অগ্রসর হবে এমন আশা সকলের। গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কারের সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। জুলাই সনদে ১৮০ দিনের যে সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছিল তার আলোকে এটা হতে পারে। আমরা সরকারকে বিষয়টি ভেবে দেখে ঐকমত্যের পথে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানাই।