আসিফ আরসালান

ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। চলতি সালের মার্চ মাস থেকেই তারা পেশী শক্তির ব্যবহার শুরু করেছিলো। তারই ধারাবাহিকতায় এ জুলাই বিপ্লবের মাসে অর্থাৎ অগাস্ট মাসের ৪ তারিখ থেকেই তারা সুপরিকল্পিত উপায়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ঢাকা তথা বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উৎখাত করার জন্য পেশী শক্তির ব্যবহার করা শুরু করেছে। এ অগাস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে তারা ছাত্রশিবিরের ওপর যেভাবে হামলা করে এবং অতঃপর যে হামলার বিস্তার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে সেটি মনে করিয়ে দেয় ফ্যাসিস্ট হাসিনার লাঠিয়াল যুবলীগ ও ছাত্রলীগের মাস্তানীর কাহিনী। আসলে যখন জনসমর্থন তথা ছাত্র সমর্থন কমতে থাকে এবং কমতে কমতে যখন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায় তখন শাসক দলের সমর্থনে ঝটিকা বাহিনী এ্যাকশনে নেমে পড়ে। অতীতে আওয়ামী হেলমেট বাহিনী, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনী এই কাজটিই করেছিলো। তাদের গুণ্ডামি এতই সাম্প্রতিক যে, সে গুলো আর এখানে উল্লেখ করলাম না। কিন্তু এই রংবাজি এবং গুণ্ডামির পরিণতি কোনো দিন ভালো হয় না। তার জ¦লন্ত প্রমাণ আজ বিতাড়িত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ।

এক সময় ছাত্রলীগের যে প্রেসিডেন্ট অর্থাৎ সাদ্দাম হোসেন ছিলেন সাধারণ ছাত্র সমাজের ত্রাস সেই সাদ্দাম হোসেন আজ ভারতের অনুকম্পায় ভারতেই আশ্রিত জীবন কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশের জনগণ গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছেন যে, বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদল ইতোমধ্যেই ছাত্রলীগের পদাঙ্ক কার্বন কপির মতো অনুসরণ করছে।

গত মার্চ বা এপ্রিল মাসের ঘটনাবলী বাদই দিলাম। কিন্তু এবার তারা যে সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করেছে তার শুরুটা কিন্তু অত্যন্ত সাধারণ একটি ঘটনা। ৩ অগাস্ট ইসলামী ছাত্রশিবির রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে একটি আলোকচিত্র ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এ প্রদর্শনীর শিরোনাম ছিলো জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই। সেখানে জুলাই আন্দোলন এবং বিভিন্ন আলোচিত ঘটনার ছবি ও ব্যানার প্রদর্শিত হচ্ছিলো। প্রদর্শনীতে শিবিরের একটি ব্যানার/ফেসটুন নিয়ে ছাত্রদল শিবিরের ওপর হামলা চালায়। শিবির বার বার বলে যে, তারা প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই এ ব্যানার টাঙিয়েছে। ছাত্রদল এ বিষয়টি নিয়ে সরাসরি শিবিরের ওপর চড়াও হওয়ার পরিবর্তে প্রশাসনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করতে পারতো। শিবির আলোচনার পক্ষপাতি ছিলো।

ছাত্রদলের হামলার মুখে শিবির কর্মীরা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য ডিফেন্সিভ অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু ছাত্রদলের মারমুখী কার্যকলাপের ফলে শিবিরও প্রতি উত্তর দেয় এবং সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ঢাকা রংপুর রোডে যান চলাচল ৩ ঘণ্টার জন্য বন্ধ হয়।

পরদিন ৪ অগাস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৬’ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান চলছিলো। অনুষ্ঠান চলাকালে জকসুর (জগন্নাথ কলেজ ছাত্র ইউনিয়ন) নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ সাধারণ ছাত্রদের আবাসন সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যা সম্বলিত একটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে সেখানে প্রবেশ করে। এটি ছিলো জকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবি জানানোর একটি পন্থা। তাদের মধ্যে কোনোরকম উস্কানিমূলক বা উত্তেজনাকর কোনো আচরণ ছিলো না। কিন্তু ছাত্রদল কোনোরকম কারণ ছাড়াই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রবেশকে বাধা দেয় এবং তাদের ওপর হামলা চালায়।

সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ৪ অগাস্ট শুধু জকসু নয়, আরো দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। তারা বকশিবাজারে অবস্থিত সরকারি আলিয়া মাদরাসা ও ঢাকা কলেজেও শিবিরের ওপর হামলা চালায়। ছাত্রদল ছাত্রলীগের স্টাইলে লাঠি, লোহার রড এবং অন্যান্য দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে জগন্নাথ বিশ্বব্যিালয়, আলিয়া মাদরাসা ও ঢাকা কলেজে হামলা চালায়। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জাতীয় সংবাদপত্রে এই হামলার ছবি ছাপা হয়। ছবিতে দেখা যায় যে, অতীতে ছাত্রলীগ যে স্টাইলে হামলা করতো ছাত্রদলও সেই স্টাইলে হামলা করছে। আত্মরক্ষার জন্য শিবিরও পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। ইংরেজি ডেইলি স্টারের রিপোর্ট মোতাবেক এ হামলায় অন্তত ৯০ জন আহত হয়েছেন যাদের সিংহভাগই ছাত্রশিবিরের। দৈনিক প্রথম আলোর খবর এবং ছবি মোতাবেক যুবদলের নয়ন এ ৩টি স্থানেই হামলার নেতৃত্ব দেয়। প্রথম আলোর খবরে বলা হয় যে, এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলার নেতৃত্ব দিয়ে সে অপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটে যায়। অথচ নয়ন কিন্তু ছাত্র নয়। নয়নের নেতৃত্বে ছাত্রদল আলিয়া মাদরাসায় ঢুকে পড়ে, ইসলামপন্থী ছাত্রদেরকে বের করে দেয় এবং ছাত্রাবাস দখলে নেয়।

ছাত্রদলের হামলায় আহত শিবির ও ছাত্র শক্তির কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়। জুলাই বিপ্লবের সময় ছাত্রলীগ এবং যুবলীগ সরকারের পেটোয়া বাহিনী ও পুলিশের গুলিতে আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা গ্রহণে বাধা দিচ্ছিলো। অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো ছাত্রদলও ন্যাশনাল মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন আহতদের ওপর সেখানেও হামলা করে। ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, যুগান্তর প্রভৃতি পত্রিকার রিপোর্ট মোতাবেক ছাত্রদলের এ হামলায় সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে প্রচণ্ড ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা ক্লাসে হাজির হওয়া এবং পরীক্ষা দিতেও ভয় পাচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভাইস চ্যান্সেলর এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এস এম এ ফয়েজ বলেছেনে, পরিস্থিতি আতঙ্কজনক।

ডেইলি স্টারে বলা হয়েছে যে, যে ৯০ জন আহত হয়েছেন তাদের মধ্যে শুধুমাত্র জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েই ৭০ জন আহত হয়েছেন। জকসু অর্থাৎ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন যেসব দাবি দাওয়া নিয়ে হাজির হয়েছিলো তার মধ্যে ছিলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ সেনাবাহিনীর হাতে দেওয়া হোক, কেরানীগঞ্জে চলমান আবাসন প্রকল্পের নির্মাণকাজ দ্রুত সমাপ্ত করা হোক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা সেবার মান উন্নত করা হোক। যারা আহত হয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন জকসুর নির্বাচিত ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক এবং জাহাঙ্গীরনগর শিবির সভাপতি আব্দুল আলিফ, জাতীয় ছাত্র শক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রধান শাহিন মিয়া। ছাত্রদলের হামলায় আজকের খবর এবং দৈনিক ‘মানবকন্ঠে’র প্রতিনিধিরাও আহত হয়েছেন।

ছাত্রদল ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ এবং হসপিটালে চিকিৎসাধীন আহতদের ওপরেও হামলা চালায়।

ছাত্রদলের এই ধারাবাহিক হামলা ৪ অগাস্টেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ৫ অগাস্টে সেটি ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। ৫ অগাস্ট ছাত্রদল হামলা চালায় নারায়ণগঞ্জ, লক্ষীপুর, পাবনা ও বরিশালে। এছাড়া ঢাকায় একটি কর্পোরেট হাউজের বাংলা দৈনিকের রিপোর্ট মোতাবেক ৫ তারিখে কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজেও ছাত্রদল উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে।

নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজে ৫ অগাস্ট উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে শিবির নেতৃবৃন্দ নাকি উচ্ছৃংখল বক্তব্য দেন। তোলারাম কলেজ ছাত্রদল সভাপতি মনির হোসেন বলেন যে, তাদের ক্যাম্পাসে উত্তেজনাকর বক্তব্য দেওয়া যাবে না। এসব উক্তি করার পর ছাত্রদল শিবিরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা তোলারাম কলেজ ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাধাণর সম্পাদক ও অর্থ সম্পাদককে মারধর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

একই ধরনের ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে লক্ষ্মীপুর জেলায়। লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসন কর্তৃক ৫ অগাস্ট পালন উপলক্ষে আয়োজিত সভায় শিবির নেতা নাকি পানি সম্পদমন্ত্রীর সমালোচনা করেন। কর্পোরেট হাউজের ঐ দৈনিকটির রিপোর্ট মোতাবেক পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীর সমালোচনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ছাত্রদল ছাত্রশিবিরের ওপর হামলে পড়ে। তারা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতেই ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মারধর শুরু করে।

নারায়ণগঞ্জ এবং লক্ষ্মীপুরের ঘটনা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, আওয়ামী লীগের মতো ছাত্রদল ও যুবদলও তাদের নেতাদের সমালোচনা সহ্য করবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একাধিক সভায় গণতান্ত্রিক সহনশীলতার ললিত বাণি শুনিয়েছেন। গণতান্ত্রিক সহনশীলতা বলে যে, একপক্ষ কারো সমালোচনা করলে অপর পক্ষ পাল্টা সভা করে সমালোচকদের সমালোচনার জবাব দেবে। কিন্তু নেতাদের সমালোচনার জবাব যদি হয় মারধর এবং গুণ্ডামি তাহলে সেটিকে ফ্যাসিবাদী চরিত্র ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। জামায়াতে ইসলামী অথবা ইসলামী ছাত্রশিবির দেশের বিরোধী দল। তারা তো সরকারের সমালোচনা করবেই। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সমালোচনা সহ্য করার মতো সহনশীলতা বিএনপি তথা তার অঙ্গ সংগঠনসমূহের নেই।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আয়োজিত জুলাই বিপ্লব উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহর্ফিলেও ছাত্রদল ভায়োলেন্ট বিক্ষোভ করে। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত এই সভার এক পর্যায়ে ছাত্রদল সভাপতি মুজাহিদ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা স্লোগানসহ সভায় ঢুকে পড়েন এবং অনুষ্ঠান পণ্ড করে দেন। সেই অনুষ্ঠান আর অগ্রসর হতে পারেনি।

৫ অগাস্ট বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবির ‘অদম্য জুলাই’ নামে একটি র‌্যালির আয়োজন করে। এই র‌্যালিতে বহিরাগত রয়েছে, এই অভিযোগ তুলে ছাত্রদল র‌্যালিতে হামলা চালায়। হামলায় ছাত্রদল নেতাকর্মীরা রড, পাইপ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করে। এ হামলার ফলে অন্তত ২০ জন আহত হন, যার মধ্যে অধিকাংশই রয়েছেন শিবিরের কর্মী ও সমর্থক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ হস্তক্ষেপ করে। বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজে শিবিরের ১০ জন নেতাকর্মীকে আহত অবস্থায় ভর্তি করা হয়।

এভাবে ছাত্রদল ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেরূপ ধারাবাহিক আক্রমণ শুরু করেছে তার মূল উদ্দেশ্য হলো এসব বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জবরদখল করা। জনসমর্থন বা ছাত্র সমর্থন যেখানে অনুপস্থিত সেখানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ হলো পেশীশক্তি প্রয়োগ।

ইতোপূর্বে প্রশাসক নিয়োগ করে বিএনপি সরকার ১১টি সিটি কর্পোরেশন এবং ৪২টি উপজেলা পরিষদ দখল করেছে। ১২টি আধা-সরকারি সংস্থায় দলীয় প্রধান নিয়োগ দিয়েছে। এভাবে ধীরে ধীরে তারা সরকারি ও আধা-সরকারি অফিসসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ দখল করা শুরু করেছে।

ক্রিয়ায় বিপরীত দিকটি হলো প্রতিক্রিয়া। ছাত্রদল ও যুবদলের এই পেশীশক্তি প্রয়োগের পরিণতিতে যদি দেশে মারাত্মক সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় তাহলে তার জন্য দায়ী থাকবে সম্পূর্ণভাবে সরকার।

Email:[email protected]