মুসফিকা আনজুম নাবা
২৬ এর ফুটবল বিশ্বকাপ আসরে, স্পেনের বিজয় ফুটবল প্রেমীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক্্েই জানেনা যে স্পেন একসময় মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র ছিলো। ইতিহাসের এ অধ্যায় আধুনিক সমাজে অনেক তরুণের এখনো অজানা।
৭১১ খ্রিষ্টাব্দের কথা। তখন আজকের স্পেন তথা হসপানিয়া রডারিকের শাসনকাল; অত্যাচার জুলুম নির্যাতনের অতিষ্ট সাধারণ জনগণ। অর্থসামাজিক-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়ে। অপরদিকে সিডটা রাজার কাউন্ট জুলিয়ানের সাথে বিরোধ বাধলে মূসা বিন নুসাইরকে স্পেন আক্রমণের আহ¦ান জানান। তৎকালীন মুসলিমরা ইসলামের পতাকা সম্মুনত করতে দিকবিদিক বিজয় অভিযান পরিচালনা করেন। এসব অভিযানের উদ্দেশ্য কখনোই ভূখন্ড বা সম্পদ অন্বেষণ ছিলো না বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের আহ্বান ও দ্বীনী দাওয়াত দেয়াই ছিল লক্ষ্য। এমতাবস্থায় কাউন্ট জুলিয়ানের সহযোগিতার মনোভাব স্পেন বিজয় পরিকল্পনাকে ত্বরান্বিত করে।
তখন ছিলো উমাইয়া খিলাফত। খলিফা তারিক বিন জিয়াদকে স্পেন অভিযানে পাঠান। রডারিকের ১ লাখ ২০ হাজার সেনার বিপরীতে মুসলিম সৈন্য ছিলো মাত্র ২০ হাজার। এতো কম সংখ্যক সৈন্য মুসলিম শিবিরে সংশয়ের সৃষ্টি করে। এমন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে তারিক বিন জিয়াদের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত মুসলিমদের অপ্রতিরোধ্য করে তোলে। সেনাপতি তারিক সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন ‘আমার ভাইয়েরা, তোমাদের পিছনে উত্তাল সমুদ্র, আর সামনে দুশমন। সুতরাং তরবারি ছাড়া তোমাদের কোনো সহায় নেই। আল্লাহর শপথ, নি:সন্দেহে এটি আল্লাহর প্রতি নির্ভেজাল আনুগত্য প্রর্দশন ও অটল-অবিচল থাকার চূড়ান্ত পরীক্ষা।’
তারেক শেষ পর্যন্ত ওয়াদি লাস্কের নামক স্থানে ভিসিগথ বাহিনীকে পরাস্ত করেন। ইউরোপের প্রতাপশালী ও অত্যাচারী শাসক রডারিক পরাজিত হন। তারিক বিন জিয়াদ আরো অগ্রসর হন এবং করায়ত্ত করেন কর্ডোভাসহ নতুন নতুন শহর। কর্ডোভা জয়ে ৭শ সৈন্য ছিলো। এতো কম সংখ্যক সৈন্য নিয়ে স্পেন বিজয়াভিযান ছিল অবিশ্বাস্য। মুসলিমদের উদারতা ও সহনশীলতা, ইনসাফে মুগ্ধ হয়ে স্পেনবাসী দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেন। হসপানিয়ার নতুন নাম ‘আন্দালুসিয়া’ ও গ্রানাডার পরিবর্তে কর্ডোভাকে রাজধানী করা হয়। স্পেন বিজয়ের পূর্বে ইউরোপের সমাজব্যবস্থা কুসংস্কার, মুর্খতা, অন্ধবিশ্বাসে নিমজ্জিত ছিল।
মুসলিম আগমনে এ ভূখণ্ডের আমূল পরিবর্তনের সূচনা হয়। এ সম্পর্কে ফরাসি নৃবিজ্ঞানী রবার্ট ব্রিফল্ট ‘The Making of Humanity’ গ্রন্থে মুসলমানদের স্পেন জয়কে ‘অন্ধকার কক্ষের দরজা দিয়ে সূর্যের আলোর প্রবেশ’ বলে অভিহিত করেছেন। তার বক্তব্য হলো- ‘স্পেনে মুসলমানদের আগমনে শুধু স্পেন নয়, বরং গোটা ইউরোপ মুক্তির পথ পেয়েছিল এজ অব ডার্কনেস তথা হাজার বছরের অন্ধকার থেকে।
গ্রানাডা হয়ে ওঠে মুসলিম সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র। মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা ও বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। মুসলিমরা আন্দালুসিয়ায় শিক্ষাকেন্দ্র, মসজিদ ও লাইব্রেরি স্থাপন করেন। স্পেনবাসী জ্ঞান-বিজ্ঞান সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক নতুন দিগন্তে পদার্পণ করেছিল। সমগ্র ইউরোপ থেকে দলে দলে শিক্ষার্থী কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হতে আসতো। সর্বোপরি শিল্প, সাহিত্য, স্থাপতের এক অন্যন নগরী হয়ে উঠে কর্ডোভা।
তখনও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষেরা নিয়মিত গোসল করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। সে সময়ই স্পেনের রাস্তায় রাস্তায় মুসলমানরা গড়ে তুলেছিলেন হাম্মামখানা সাথে সুগন্ধি, প্রসাধন ও সাবানের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। এছাড়া পাবলিক গোসলখানা, হাজারো প্রাসাদ এবং বিপুলসংখ্যক রাস্তাঘাট নির্মিত হয়। আন্দালুসের প্রতিটি আমিরাতের নান্দনিকতা সহজেই যেকারো নজর কাড়তো। অট্টালিকা মসজিদের সুনিপূণ কারুকাজ যেমন : আলহামরা প্রাসাদ ও গ্রান্ড মসজিদ আজো বিশ্ববাসীর কাছে বিস্ময়কর ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য। এ সময় স্পেনীয় মুসলমানেরা সমগ্র ইউরোপের কাছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির মডেল হিসেবে পরিচিত হয়। স্পেনের মুসলিম সভ্যতাকে ইউরোপীয়রা ‘মরু সভ্যতা’ ও কর্ডোভাকে আদর করে ‘রত্নখণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করে।
রোম-পারস্যসহ সব পরাশক্তি মুসলিম শাসনের অধীনস্থ হলে, খ্রিষ্টীয় শক্তি তা সুনজরে নেয়নি। ইউরোপীয় খ্রিষ্টান সম্প্্রদায় নতুনভাবে জেগে উঠে ক্রুসেড চেতনায়। চলতে থাকে কূটকৌশল, আগ্রাসন, সন্ত্রাস। মুসলিম অগ্রযাত্রা রোধে ষড়যন্ত্র করা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
সমস্ত খ্রিষ্টান রাজন্য ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঐক্যের ডাক দেয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল-মুসলমানদের উৎকর্ষতা ঠেকানো। এর নাম দেয়া হয় ‘ক্রুসেড’ বা ধর্মযুদ্ধ। সমগ্র ইউরোপে ক্রুসেডের আহ্বানে সাড়া দিয়ে একত্র হয় খ্রিষ্টীয় শক্তি। নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে তারা মুসলিম পরাশক্তির বিরুদ্ধে মাথা তোলে। শুরু হয় ক্রুসেডার তাণ্ডব। যা চলতে থাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী। এমনকি খ্রিষ্টান গোয়েন্দারা ইসলাম ধর্ম শিখে আলেম লেবাসে বিভিন্ন মসজিদে ইমামতিও করে। তাদের কাজ ছিলো স্পেনের সমাজ জীবনকে অস্থিতিশীল ও শতচ্ছিন্ন করে তোলা। শাসকদের অদূরদর্শী নেতৃত্ব, ভোগ বিলাসীতা, জনগণের অসচেতনতা ও অনৈক্য স্পেনে মুসলমানদের পতনের নেপথ্য কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলশ্রুতিতে গ্রানাডা ট্র্যাজেডি মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক বিভীষিকা ও মর্মান্তিক কাহিনীর রূপ নেয়।
স্পেনের মসনদে তখন সুলতান হাসান। তার পুত্র আব্দুল্লাহকে ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে, খ্রিষ্টানরা বিদ্রোহী করে তোলে। ক্ষমতার দ¦ন্দে আবু আব্দুল্লাহ বিজয়ী হয়। তার দুর্বল নেতৃত্ব এবং অভ্যন্তরীণ ঝামেলার সুযোগে খ্রিষ্টীয়শক্তি আরও বেশি তৎপর হয়। খৃষ্টান শক্তি বাড়াতে অ্যারাগোনের শাসক ফার্দিনান্দ ও কাস্তালিয়ার রানী ইসাবেলা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ফার্দিনান্দ মুসলমানদের বিরুদ্ধে নানান কৌশল অবলম্বন করতে থাকেন। এদিকে গৃহযুদ্ধে স্পেনের বিভিন্ন শহরে মুসলমান নিয়ন্ত্রণ হারায়।
১২৯১ সালের নভেম্বরে শুরু হয় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ। ফার্দিনান্দের আদেশে মুসলমানদের উপর নৃশংস ও বর্বর হত্যাযজ্ঞ, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ এবং শস্যক্ষেত্র জ্বালিয়ে দেয়া হয়। পোড়ানো হয় শহরের খাদ্য সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র ভৈগা উপত্যকা। অল্পদিনে সারা শহরে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। খ্রিষ্টান সৈন্যরা গবাদিপশু লুট, সমৃদ্ধ গ্রামগুলো ধ্বংস করে দেয়। অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গেলে বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ করা হয়।
চারদিকের পরিস্থিতির অবনতি আর শ্বাসরোদ্ধ করা অবস্থায় খ্রিষ্টান বাহিনী গ্রানাডা অবরোধ করে। ফার্দিনান্দ আবু আব্দুল্লাহকে আশ্বাস দেন, তারা যদি বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয় তবে জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। অতীতে খ্রিষ্টানরা বারবার অঙ্গীকার দিয়ে না রাখলেও মুসলমানরা শিক্ষা নেয়নি বরং দুর্বল শাসক ও তার সভাসদরা ফার্দিনান্দের সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। ফলে ১৪৯২ সালে ‘ক্যাপিচুলেশন অব গ্রানাডা’ চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। গ্রানাডা দখলের পর ফার্ডিনান্দ চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলিমদের জোরপূর্বক খ্রিস্টান-ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করে এবং ধর্মান্তরিত নাহলে মৃত্যুদণ্ড, বহিষ্কার, কারাদণ্ড,সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ইত্যাদি আরোপ করা হয়। মসজিদ বন্ধ করে পুড়িয়ে মারা, ভাষা, পোশাক, রীতিনীতি, গোসল নিষিদ্ধ করা হয়; শুক্রবার দিন তাদের গৃহসমূহ খুলে রাখতে বাধ্য করা হয়। ফজরের সময় যারা নামাজ পড়তে উঠত বা যে সকল ঘরে সে সময় বাতি দেখা যেতো, নামাজ পড়ার অভিযোগে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। এভাবেই একটি সাজানো বাগান নিঃশেষ হয়ে যায়। চিরকালের জন্য স্পেনে আযান নিষিদ্ধ করা হয়। এভাবেই ৮শ বছরের সোনালী সভ্যতার পতন হয়। গ্রানাডায় ইতিহাসের নিকৃষ্টতম প্রতারণা, নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও নারকীয় হত্যা চালানো হয়। নির্মম গণহত্যার পরও যেসব মুসলমান স্পেনে থেকে গিয়ে ছিলো, ফার্দিনান্দ পুত্র তৃতীয় ফিলিপ তাদের সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় সমুদ্রপথে নির্বাসিত করে। বিপুলসংখ্যক মানুষ সমুদ্রের গহিন অতলে হারিয়ে যান চিরদিনের জন্য। তাদের মধ্যে খুব অল্প লোকই জীবিত ছিলেন। গ্রানাডা পতনের পর আবু আব্দুল্লাহ ও পরিবারের সদস্যদের নির্বাসন দেওয়া হয়।
এভাবেই আন্দালুসিয়া গৌরবোজ্জ্বল কালের সমাপ্তি হয়। যেখানে মুসলিম সেনাপতি তারেক যে বীরত্বগাথায় মুসলমানেরা স্পেনে ইসলামের বিজয় নিশান ওড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেখানে মুসলিম আন্দালুসিয়া আধুনিক স্পেনের জন্ম দিয়ে ইতিহাসের দুঃখ হয়ে বেঁচে আছে। সেসব সুবিখ্যাত স্থাপনা কেবল ঐতিহাসিক নির্দশন ও ধ্বংসাবশেষ রুপে টিকে আছে ও আধুনিক স্পেনের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সকলের নয়ন জুড়াচ্ছে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ফুড এন্ড নিউট্রিশন, কলেজ অব হোম ইকনোমিকস।