আয়েশা সিদ্দিকা

একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব আমাদের জাতীয় জীবনের অভিশাপে পরিণত হয়েছে। আমাদের বিশাল মানবসম্পদ এখন জাতীয় বোঝা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমাদের দেশে বেকারত্বের হার প্রায় ৪.৬৩ শতাংশ থেকে ৪.৭ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রতি ৫ জন বেকারের মধ্যে একজন উচ্চশিক্ষিত এবং যুব জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার ১১ শতাংশের ওপরে।

মূলত, দেশে বেকারত্ব ব্যাপক হারে বাড়ছে। গত এক দশকে দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ। এর মধ্যে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে ৮৭ লাখ। বেকার রয়ে গেছে ৫৩ লাখ। গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক কর্মক্ষম তরুণ চাকরি পাননি। তরুণীরা এক্ষেত্রে আরও বড় বাধার মুখে পড়েছেন। চলতি বছরের মার্চ মাসে এক বিবৃতিতে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট এসব কথা বলেন। তিনদিনের সফর শেষে ঢাকা ত্যাগ করার সময় বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সফরকালে জোয়ানেস জাট অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক সহায়তা করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়। বিবৃতিতে জোহানেস জাট বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়ার প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বিদ্যমান মৌলিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। এজন্য দীর্ঘদিনের অপেক্ষমাণ সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। তার ভাষায়, বিশ্বব্যাংক সদস্য দেশগুলোকে এমন অর্থনীতি গড়ে তুলতে সহায়তা করছে, যেখানে প্রবৃদ্ধি স্থানীয় কর্মসংস্থানে রূপ নেয়। বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান ত্বরান্বিত করতে বিশ্বব্যাংক ভৌত ও মানবিক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করছে। এছাড়া ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা দিচ্ছে এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করছে। এসব করার পেছনে অন্যতম লক্ষ্যই হলো কর্মসংস্থান তৈরির পরিবেশ উন্নত করা।

বিবৃতিতে জোহানেস জাট বলেন, সরকার বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপও অগ্রাধিকারে সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এমন প্রেক্ষাপটে যুবক ও নারীদের জন্য চাকরি তৈরির সরকারি অগ্রাধিকারে সহায়তা বাড়ানো হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয় থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে বিশ্বব্যাংক অন্যতম। সংস্থাটি এ পর্যন্ত বাংলাদেশকে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে এখন বেকার মানুষের সংখ্যা রয়েছে ২৬ লাখ ৬০ হাজার। দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এদিকে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারের হার প্রায় ৮৭ শতাংশ। এর মধ্যে বেশির ভাগই স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। সংস্থাটি বলছে কয়েক বছর ধরে দেশের বেকারত্বের হার ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি।

দেশে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা কত এর কোনো হিসাব নেই। সরকার বেকারের যে হিসাব দেয়, তা প্রায় অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, এক দশক ধরেই দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫ থেকে ২৭ লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে।

১৮ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ২৭ লাখ বেকার বিষয়টি অবিশ্বাস্য হলেও বেকারের সংজ্ঞার মারপ্যাঁচে এটাই সত্য। কিন্তু দেশে প্রায় এক কোটির মতো মানুষ মনমতো কাজ পান না। তারা পড়াশোনা করেন না, কাজেও নেই। তাঁরা ছদ্মবেকার। কোনো রকম জীবনধারণের জন্য কাজ করেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতিবছর কমপক্ষে ২০-২২ লাখ মানুষ চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। তাঁদের এক-তৃতীয়াংশ বিদেশ কর্মসংস্থান। বাকি ১৪-১৫ লাখ দেশে কর্মসংস্থান হয়। বেকারের সংখ্যা যেহেতু প্রায় অপরিবর্তিত থাকে, এর মানে, প্রতিবছর যত তরুণ-তরুণী কর্মবাজারে প্রবেশ করেন, ঠিক তত সংখ্যক কর্মসংস্থান হয় বাজারে।

আবার সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে অর্থনীতিবিদদের। তাঁদের মতে, সরকার যে হিসাব দেয়, প্রকৃত বেকারের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে বিবিএসের হিসাবে, বাংলাদেশে এখন বেকার লোকের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ।

বিবিএস এখন ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে শ্রমশক্তি জরিপ করে থাকে। ফলে মৌসুমি বেকারদের চিত্র উঠে আসে। বিবিএসের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক হিসাবে, সংজ্ঞা অনুসারে গত সেপ্টেম্বর মাস শেষে ২৬ লাখ ৬০ হাজার বেকার আছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল প্রেক্ষাপট ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিল। কারণ, শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব হার সবচেয়ে বেশি। এ হার প্রায় ৪০ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে মজুরি পেলে তাঁকে বেকার হিসেবে ধরা হবে না। এক মাস ধরে কাজপ্রত্যাশী এবং সর্বশেষ এক সপ্তাহে কেউ যদি এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করার সুযোগ না পান, তাঁদের বেকার হিসেবে গণ্য করা হবে। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সংজ্ঞা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে জীবনধারণ অসম্ভব। তাই আমাদের দেশের বেকারের সংখ্যা বর্ণিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। তবে উন্নত দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সেসব দেশের মানুষ সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করলে মজুরির পাশাপাশি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও তাঁদের বেকার ভাতা দেয়া হয়। ফলে জীবনধারণের খরচ জোগাতে তাঁদের খুব বেশি সমস্যা হয় না।

মূলত, কর্মহীন মানুষ দরিদ্র হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। কত টাকা আয় করলে গরীব মানুষের তালিকা থেকে বের হয়ে যাবেন এর একটি হিসাব আছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোতে। দারিদ্র্যসীমার মানদণ্ড হলো, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবা কেনার জন্য একজন মানুষের প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮২২ টাকা খরচ করার সামর্থ্য যদি না থাকে, তাহলে তিনি দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবেন বা গরিব হয়ে যাবেন। সে হিসাবে, প্রতি সপ্তাহে ৯৫৫ টাকা আয় করতে হবে। শ্রমজীবীদের মানুষের পক্ষে সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে ৯৫৫ টাকা আয় করা কঠিন।

বাংলাদেশে বিশালসংখ্যক নিষ্ক্রিয় তরুণ-তরুণী রয়েছেন। এ সংখ্যা প্রায় এক কোটি। তাঁদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর। যেকোনো দেশে এ বয়সের তরুণ-তরুণীরা হয় পড়াশোনায় থাকার কথা, নতুবা কাজের মধ্যে থাকার কথা। কিংবা প্রশিক্ষণ নেয়ার কথা; কিন্তু তাঁরা এই তিনটির কোনোটিই করছেন না, তাহলে তাঁরা কী করেন? তাঁরা মূলত ‘ছদ্মবেকার’ নামেই পরিচিতি। ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, এমন নিষ্ক্রিয় তরুণ-তরুণী আছেন ৯৬ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৪১ লাখ।

১০ বছর ধরে এমন ছদ্মবেকার বা নিষ্ক্রিয় তরুণ-তরুণীর সংখ্যা এক কোটির মতো রয়েছে। এর মানে, দেশে সংজ্ঞা অনুসারে ২৭ লাখ লাখ বেকার আছেন। এর সঙ্গে ছদ্মবেকার এক কোটি যুক্ত হলে দেশের প্রায় সোয়া এক কোটি মানুষকে বেকার বলা যায়। এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এ নিষ্ক্রিয় তরুণ গোষ্ঠীর সংখ্যা কমানো যাচ্ছে না। এটি চিন্তার বিষয়। নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়ে ভাবতে হবে।

সাধারণভাবে বেকারত্ব তিন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন সামঞ্জস্যহীনতাজনিত বেকারত্ব, বাণিজ্য চক্রজনিত ও কাঠামোগত বেকারত্ব। শ্রমবাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি থাকলে সেটিকে সামঞ্জস্যহীন বেকারত্ব বলে। উত্তরবঙ্গ ও হাওর অঞ্চলে এমন বেকারত্ব দেখা যায়। শিল্পকারখানা ও সেবা খাতে যে ধরনের লোক প্রয়োজন, সে ধরনের লোকের সরবরাহ কম থাকলে তা সামঞ্জস্যহীন বেকারত্ব। এখন এই বেকারত্ব নিয়ে বেশি কথা হচ্ছে।

এছাড়া অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব কিংবা মন্দাভাবের কারণেও অনেক সময় বেকারত্ব বাড়ে-কমে। যেমন কোভিডের কারণে বেকারের সংখ্যা বেড়েছিল। এটি বাণিজ্য চক্রজনিত বেকারত্ব। আবার প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণেও বেকারত্ব বাড়ে। এ ধরনের বেকারত্বকে কাঠামোগত বেকারত্ব বলে।

বেকারত্ব হলো কর্মক্ষম মানুষের উপযুক্ত কাজের অভাব, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য বড় অভিশাপ। এটি যুব সমাজের অর্থনৈতিক অগ্রগতি থামিয়ে দেয় এবং যুব সমাজের জীবনকে হতাশাগ্রস্ত করে। আমাদের দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের নানাবিধ কারণে রয়েছে। এসবের অন্যতম হচ্ছে, সনাতন ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা; যা কর্মমুখী নয়। অপর্যাপ্ত শিল্পায়ন এবং নতুন কর্মসংস্থানের অভাব এবং কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি এর উল্লেখযোগ্য কারণ। চাকরির পেছনে অহেতুক ছোটাছুটি ও শারীরিক পরিশ্রমের কাজের প্রতি অনীহা এক্ষেত্রে কম দায়ী নয়।

বেকারত্বের কারণে যুবসমাজ চরম মানসিক হতাশা ও নিরাশায় ভোগে। অপরাধপ্রবণতা, মাদকাসক্ত ও সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানহানি ঘটে। দেশের মেধা পাচার হয়ে যায় এবং অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়।

তাই ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও কর্মমুখী করা সময়ের দাবি। একই সাথে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের প্রসার ঘটানো দরকার। সর্বোপরি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এক্ষেত্র ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কাজের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও মর্যাদাবোধ তৈরি করা এক্ষেত্রে অন্যতম অনুষঙ্গ হতে পারে। আর ক্রমবর্ধমান জনশক্তিকে মানবসম্পদ পরিণত ও বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণ করতে পারলেই দেশের বেকারত্ব সহনীয় পর্যায়ে আনা খুবই সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রয়োজন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।