মমতাজ উদ্দিন আহমদ

বিশ্ব মানচিত্রে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ একটি ছোট্ট রাষ্ট্র। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বসবাস এই ভূখন্ডে। ৫৫ বছর আগে গঠিত এ রাষ্ট্রটি সব মতপথের মানুষের সম্মিলিত স্বপ্ন, ন্যায়বোধ এবং ভবিষ্যতের এক সামাজিক চুক্তি। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি অস্ত্র, প্রশাসন কিংবা অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; তার প্রকৃত ভিত্তি নাগরিকের আস্থা। সেই আস্থা জন্ম নেয় তখনই, যখন রাষ্ট্র নিজেকে ক্ষমতার মালিক নয়, জনগণের আমানতদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। যে শাসকগোষ্ঠী প্রিয় মাতৃভূমিকে নিজেদের পৈত্রিক সম্পত্তি মনে করেছিলো তাদেরকে গদি থেকে টেনে দিল্লী পাঠিয়েছে দেশপ্রেমিক জনগণ।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস দেখিয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যখন দলীয় আনুগত্য, প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ এবং জবাবদিহিতার সংকটে আক্রান্ত হয়, তখন গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো অটুট থাকলেও তার আত্মা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং নাগরিক স্বাধীনতা সবকিছুই তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

২০২৪-এ ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন সেই প্রশ্নগুলোকে আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। আজ রাষ্ট্র পুনর্গঠনের যে আকাক্সক্ষা উচ্চারিত হচ্ছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চারটি মৌলিক ধারণা- গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রসংস্কার। এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; বরং একটি কার্যকর, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি।

আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গণতন্ত্র হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন নয়, নাগরিক মর্যাদার দর্শন। এ দর্শন যে শাসকগোষ্ঠী বুঝেনা তারা দিনশেষে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। যা চব্বিশের আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে। গণতন্ত্রকে অনেকেই নিছক নির্বাচন কিংবা সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান ভিন্ন কথা বলে। আধুনিক গণতন্ত্র মূলত একটি নৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং ক্ষমতার সীমাও জনগণই নির্ধারণ করে।

অ্যারিস্টটল থেকে জন লক, রুশো থেকে আব্রাহাম লিংকন সকলেই গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন জনগণের সম্মতি ও অংশগ্রহণকে। গণতন্ত্রের সাফল্য তাই ব্যালট বাক্সে নয়; বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী মতের নিরাপত্তা, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং কার্যকর স্থানীয় সরকারের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়।

যে রাষ্ট্রে ভিন্নমত রাষ্ট্রদ্রোহে পরিণত হয়, সেখানে নির্বাচন থাকলেও গণতন্ত্র থাকে না। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণ ভোট নয়; আস্থা। আর সেই আস্থা গড়ে ওঠে রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর।

যে রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার বা আইনের শাসন থাকেনা যেটি হয়ে শক্তির যন্ত্র। যা বিগত স্বৈরশাসনের সময় বিবেকবান দেশবাসী দেখেছে- কিভাবে বিরোধীমত নির্মূলে শাসকগোষ্ঠী ও বিচারালয় একাট্টা হতে পারে। সভ্যতার ইতিহাসে রাষ্ট্র টিকে থাকে ন্যায়বিচারের ওপর, ভয় প্রদর্শনের ওপর নয়। প্লেটো তাঁর রিপাবলিক-এ ন্যায়কে রাষ্ট্রের আত্মা বলেছিলেন। ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনেও ন্যায় (আদল) রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ নীতি হিসেবে বিবেচিত।

আইনের শাসন তখনই অর্থবহ হয়, যখন আইন ব্যক্তি, দল কিংবা ক্ষমতাবানদের জন্য আলাদা নিয়ম তৈরি করে না। বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা কেবল আদালতের মর্যাদার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিক স্বাধীনতার শেষ আশ্রয়।

যেখানে বিচার বিলম্বিত হয়, সেখানে অন্যায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। আর যেখানে বিচার রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, সেখানে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নৈতিক বৈধতা হারাতে শুরু করে। ন্যায়বিচার প্রতিশোধ নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া।

আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মানবাধিকার কখনো রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়, এটি মানুষের জন্মগত মর্যাদা হিসেবেই দেখা হয়। মানবাধিকার কোনো সরকারের দান নয়; এটি মানুষের সহজাত অধিকার। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র এই সত্যকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

জীবনের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংগঠন করার অধিকার, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারÑএসব কোনো রাজনৈতিক দলের অনুকম্পা নয়; এগুলো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

যখন নাগরিক ভয় নিয়ে কথা বলে, সাংবাদিক আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য হন, কিংবা বিরোধী মত প্রকাশকে নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়, তখন মানবাধিকার কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নাগরিককে নীরব করার ক্ষমতায় নয়; বরং ভিন্নমতকেও নিরাপদ রাখার সক্ষমতায়।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রসংস্কার করতেই হবে। জাতির বুক থেকে জগদ্দল পাথররূপ স্বৈরসারের পতন হয়েছে বটে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর আদৌ কি পরিবর্তন হয়েছে? সহজ উত্তর হলো হয়নি। কেন হয়নি সে আলাপ বিস্তৃত পরিসরেই বলা সম্ভব।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সরকার পরিবর্তন হলে কোনো রাষ্ট্রকে বদলে দেয় না। পরিবর্তনের স্থায়িত্ব নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের ওপর।

রাষ্ট্রসংস্কার বলতে সংবিধান পরিবর্তনই একমাত্র উদ্দেশ্য নয়; বরং প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা, সংসদীয় কার্যক্রম এবং স্থানীয় সরকারকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই এর মূল লক্ষ্য।

ডগলাস নর্থের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির ভাষায়, রাষ্ট্রের উন্নয়ন নির্ভর করে তার ইন্সটিটিউশন-এর গুণগত মানের ওপর। দুর্বল প্রতিষ্ঠান কোনো শক্তিশালী নেতাকেও দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে দেয় না।

রাষ্ট্র তখনই টেকসই হয়, যখন ব্যক্তি নয়-প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়। আমরা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দেখেছি এ দেশে ব্যক্তিপূজা এখনো শেষ হয়নি। সংসদ সদস্যদের ভাষা শোনলে তা বুঝা যায়। এদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে হয় না। কিন্তু তা হওয়া জরুরি।

আমরা নিবন্ধের শুরুতেই চার স্তম্ভ তথা গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রসংস্কারের কথা বলেছি। এই চারস্তম্ভের আন্তঃসম্পর্ক ছাড়া একটি আধুনিক রাষ্ট্র সামনে অগ্রসর হতে পারে না। এর একটিকে বাদ দিলে অন্যটি টেকে না।

গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রসংস্কারÑএই চারটি ধারণা আলাদা নয়; পরস্পরনির্ভর। গণতন্ত্র ন্যায়বিচার ছাড়া সংখ্যার খেলায় পরিণত হয়। ন্যায়বিচার মানবাধিকার ছাড়া নিছক আইনি আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। মানবাধিকার রাষ্ট্রসংস্কার ছাড়া কাগুজে ঘোষণায় পরিণত হয়। আর রাষ্ট্রসংস্কার গণতন্ত্র ছাড়া জনগণের অংশগ্রহণ হারায়। এই চারটি স্তম্ভ একসঙ্গে দাঁড়ালেই একটি রাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে।

আমাদেরকে নির্মোহভাবে নতুন বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে হবে। অন্ধ দলীয় আনুগত্য পরিহার করে ‘রাষ্ট্র’কেই সামনে রাখতে হবে। বাংলাদেশ আজ একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। চব্বিশে জনগণের প্রত্যাশা ছিলো ক্ষমতার পালাবদল নয়; রাষ্ট্রচিন্তার পরিবর্তন। নতুন প্রজন্ম এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে নাগরিক পরিচয় দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকবে; যেখানে প্রশাসনের পরিচয় হবে নিরপেক্ষতা, বিচারব্যবস্থার পরিচয় স্বাধীনতা, আর রাজনীতির পরিচয় হবে জনকল্যাণ।

রাষ্ট্রসংস্কারের এই মুহূর্তে আবেগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন প্রজ্ঞা। প্রতিশোধ নয়, ন্যায়; বিভাজন নয়, অংশগ্রহণ; ব্যক্তিপূজা নয়, প্রতিষ্ঠান নির্মাণÑএই দর্শনই হতে পারে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি।

অতএব, আমরা প্রিয় মাতৃভূমির পুনর্জন্ম বিবেক থেকেই শুরু করি। দেশকে ভালোবাসি। পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলোর ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন পথ নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশে সেই সুযোগ এসেছিল চব্বিশের আন্দোলনে। কিন্তু সেই সুযোগকে দলগুলো নিজেদের ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। তারা ভুলে গেছে ১৭ বছরের পলাতক জীবনের কথা, জেল-জুলুমের কথা। সবাই এখন সংবিধান বিশেষজ্ঞ। এ ধারা চলতে থাকলে ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। যদি শাসকগোষ্ঠীর নৈতিক পুনর্জাগরণ ঘটে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নাগরিক মর্যাদার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় রূপ দেয়, তবে একটি বাংলাদেশী জাতিসত্তার নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটবে। অন্যথায় ‘যে লাউ সেই কদু’ হিসেবেই বর্তমান শাসকগোষ্ঠী দিন পার করবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে কে ক্ষমতায় এলো এই প্রশ্নে নয়; বরং রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কতটা ন্যায়ভিত্তিক, কতটা মানবিক এবং কতটা জবাবদিহিমূলক হতে পারলো এই প্রশ্নের উত্তরে। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হয়, যখন তার প্রতিটি নাগরিক স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে, ন্যায়বিচার পায়, মর্যাদা নিয়ে কথা বলতে পারে এবং বিশ্বাস করতে পারে রাষ্ট্র তার প্রভু নয়, তারই সেবক। এই বিশ্বাসই নতুন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রসংস্কার।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।