মাহবুবুল হক

ঢাকাস্থ কবির হাট উপজেলা ফোরাম, ঢাকা মহানগরীর বিশাল একটি সৌরম্য হলে ‘সম্মাননা’ প্রদানের অনুষ্ঠান করেছে। এলাকার সাধারণ মানুষ হিসেবে এই অধম দাওয়াত পেয়েছে। সময়মতই গিয়েছিলাম। অবাক কাণ্ড অনুষ্ঠানও সময়মত শুরু হয়েছে। বিশাল হলের সামনের দিকে অল্প কয়েকজন মেহমান, তবু তারা কারো বা কোনো কিছুর দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ‘কুরআন শরীফ’ তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু করেছে। যিনি কুরআন তিলাওয়াত করলেন তিনি আমাদের হৃদয় ও মনকে সত্যি সত্যি দারুণভাবে স্পর্শ করেছেন। এরপরেই ছিলো হামদ ও নাত। তারপরই আসরের নামাজের বিরতি, দুভাগে বিভক্ত হয়ে মেহমানগণ নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে স্বাগত ভাষণ, সূচনা কথা, সবকিছু শৃংখলার সাথে হচ্ছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেকদিন পরে শৃংখলার সাথে অনুষ্ঠানটি উপভোগ করছিলাম। লক্ষ্য করলাম, অনুষ্ঠানে ঢাকাস্থ কবির হাটের ভূমিপূত্ররাই শুধু আসেননি, এসেছেন এলাকাবাসী, নিজস্ব এলাকা থেকে। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সবাই খুব সুন্দরভাবে সেজেগুজে এসেছিলেন। শুরুর দিকে পরিবারসহ দু’জন মহিলা এসেছিলেন। একজন কিছুক্ষণের মধ্যেই নিষ্ক্রান্ত হন। পরিবারসহ একজন মহিলাই শেষপর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন। বিষয়টি আমার কাছে অশনি-সংকেত বলে মনে হয়েছে।

অনুষ্ঠানে সম্মাননা প্রদানের কথাই শুধু আলোচনা হয়নি, আলোচনা হয়েছে মহররম মাস ও জুন মাসের বিভিন্ন ইভেন্টসহ বৈচিত্রময় কথামালা। মহররম মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য। ১৭৫৭সালের স্বাধীনতা হারানোর বিষয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও জাতীয় মননের কবি ফররুখ আহমদের জন্মদিনসহ বহুমাত্রিক বিষয়মালা। খুব ভালো লেগেছে এইজন্য যে, সম্মানিত বক্তাগণ বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই তাদের বক্তব্য শেষ করেছেন। শুধু এই অধমের ক্ষেত্রে স্লিপ প্রাপ্তি ঘটেছে। আমি অবশ্য কথার শুরুতে বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করেছিলাম কত মিনিট কথা বলবো। অনুষ্ঠানের সভাপতি বলেছেন, আপনি বলুন। কিন্তু যখন ২২মিনিট পার হয়ে গেল তখন স্লিপ পেলাম। লজ্জা পেলাম। শরম পেলাম। ১ মিনিটেই শেষ করলাম।

আমার কথার বিষয় ছিলো তাকওয়া অর্জন

মুসলমানদেরকে মুসলিম হতে হবে, কুরআন জানা ও সলাত বুঝে বুঝে আদায় করতে হবে। পরিবারকে বিদ্যাপীঠ-শিক্ষাপীঠ-জ্ঞানপীঠের সঙ্গে রাখতে হবে এবং এই সময় গণভোটের বিষয়টি সফল করতে হবে। আমি আলোচনার শেষ পর্যায়ে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী একমাত্র সম্মানিত মহিলাকে স্টেজে আসার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম। তিনি সাথে সাথে স্টেজে উঠে আসন গ্রহণ করেছিলেন। পুরস্কার হস্তান্তর করার পর আয়োজকগণ তাঁকে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানান। তিনি সংক্ষেপে আয়োজকদেরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তখন বেশ রাত, সে কারণে হয়তো বেশী বলেননি।

অনুষ্ঠানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান বা অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী উপস্থিত থাকলে আমি স্টেজে আসার জন্য অনুরোধ করতাম। কিন্তু কেউ আসেনি। তাদেরকে দাওয়াত দেয়া হয়েছিলো কিনা সেটাও আমি জানি না। পূর্বে, অবশ্য ওয়াজ-মাহফিলেও ভিন্ন জাতির, ধর্মের বা সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দাওয়াত দেয়া হতো না। মাঝে কিছু বুঝমানের ক্রমাগত পরামর্শে বিষয়টি এখন সামনে এসেছে।

কিছুটা ‘ব্রেক থ্রো’, কিছু কিছু জায়গায় দৃশ্যমান হচ্ছে। পরিবর্তনের সূচনা হচ্ছে। আমার দিব্যি মনে আছে ১/১১ সময়ে যারা হঠাৎ করে দেশের মূল স্টেক-হোল্ডার হয়ে গেলেন, তারা পরিবর্তন ও সংস্কারের কথা শ্লোগানে তুলেছিলেন। বাংলাদেশের বড় ৩টি রাজনৈতিক দল ভেতরে ভেতরে সংস্কার ও পরিবর্তনের অনুসারী হলেও বা নিজেরা আংশিকভাবে অনুসরণ করলেও ১/১১-এর কুশিলবদের সংস্কার বা পরিবর্তনের ডাকে সাড়া দেননি। তবে আমরা সবাই জানি, প্রতিটি রাজনীতিক দলেই কিছু নেতা-কর্মী পরিবর্তন বা সংস্কারের কথা শুনে ১/১১-এর পরিবর্তনকামীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়েছিলেন। সেদিকে আমরা এখন আর যাচ্ছি না । ১/১১-ওয়ালারা বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত নিন্দিত। অদূর বা দূর ভবিষ্যতে তারা কখনও নন্দিত বা গ্রহণযোগ্য হবেন বলে মনে হয় না।

আমাদের কন্যা-জায়া-জননীরা ’২৪ সালে যে বিপুল বিপ্লব সংগঠিত করেছিলেন, ইতিহাসে তা যুগে যুগে জাজ্বল্যমান থাকবে। সেই মহিমান্বিত বিপ্লবের পরও আমাদের কন্যা-জায়া-জননীরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্মরণীয় ও বরণীয় অবদান যে রাখছেন, তা অবশ্যই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখন যদি বিরোধীদলের পুরুষ-এমপিগণ সংসদ চলাকালে একদিন যদি অনুপস্থিত থাকেন, তা হলে মাশাআল্লাহ বিরোধীদলের মহিলা এমপিগণ সকল বাধা অতিক্রম করে নিজেদের বক্তব্য সুস্পষ্ট করতে পারবেন। কেনো সন্দেহ নেই।

সে অনুষ্ঠানে, অর্থাৎ যেখানে ছিলেন প্রায় ৩০০জন পুরুষ। সেখানে তো হিসেব অনুযায়ী অন্তত ১৫০জন কন্যা-জায়া-জননী উপস্থিত থাকার কথা, সেখানে ছিলেন মাত্র ১জন মহিলা। কী আশ্চর্য্য! আমরা বিভিন্নভাবে হিসাব করে দেখলাম অন্তত উদ্যোক্তরাই যদি তাদের জীবন-সঙ্গীনীদের সাথে করে নিয়ে আসতেন তা’হলেও অন্তত এই অনুষ্ঠানে কন্যা-জায়া-জননীর সংখ্যা আরো ৪৯ জন বৃদ্ধি পেত। কথামালার সময় আন্দাজ ও অনুমান করেছিলাম, উদ্যোক্তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন, সদ্য যুবক শ্রেণীর। বিপ্লবের সময় বিপ্লবীরা তো কন্যা-জায়া-জননীদেরকে সভা-সমিতি ও মিছিলের সর্বাংশে স্থান দিয়েছিলো। কারণ ঘটনাটা ছিল এমন, শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে পুরোপুরিভাবে নেমে পড়েছিলো, তাদের বাবা-মা, বড় ভাই, বড় বোন, নিকট আত্মীয়, অভিভাবকগণ প্রয়োজনের তাগিদে বাচ্চাদের প্রণোদনায় তারাও বিপ্লব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলো। এই অভ্যুত্থান, বিপ্লব ও যুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন আমাদের কন্যা-জায়া-জননীগণ। তারা যোগদান করেছেন বিপ্লবের দ্বিতীয় পর্যায়ে। তৃতীয় বা শেষ পর্যায়ে আশগ্রহণ করেছিলেন দেশের আপামর জনসাধারণ। তাদের সাথে সংযুক্ত হয়েছিলেন ২/৩টি রাজনৈতিক দল ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গী-সাথীরা।

বিপ্লবের পর থেকে নয়, জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে বিপ্লবের আনুষঙ্গিক বিষয়-আশয় থেকে কন্যা-জায়া-জননীরা সরে পড়েছেন। তারা হয়তো কিছুটা হতাশাগ্রস্ত হয়েছেন, নিরাশ হয়েছেন। তাদের বিপক্ষে এ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যত আজেবাজে কথা এসেছে তাতে আমাদের ধারণা তারা আবার নিস্তব্ধ ও নীরব হবার কোশেশ করছে।

বিপ্লবীদের মধ্যে পুরুষ স্টেকহোল্ডাররা হয়তো ভেবেছেন, আপাতত আমরা কিছুটা কাজ এগিয়ে নেই, তারপরে স্থানীয় সরকারসহ জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনের সময় তাদেরকে পুনরায় অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানাতে হবে। কিন্তু এটা একটা ভুল ধারণা। হতাশা, নিরাশা ও খারাপ ব্যবহারের কারণে কন্যা-জায়া-জননীরা এবার যদি ইউটার্ণ করে এবং জীবন সংগ্রামে জড়িয়ে পরে তাহলে নতুন করে আবার গোছগাছ করে বিপ্লবে শক্তি সঞ্চার করতে পারবে না। অনেক বিপত্তি ঘটবে, অনেক অসুবিধার সৃষ্টি হবে। অন্তত প্রত্যেক এলাকার বিপ্লবের স্টেক হোল্ডারদের এ বিষয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। দেশের বিরাট সংখ্যার রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীগণ যেহেতু ভারতের দালালে পরিণত হয়ে গেছে। সেই নির্মম ও নিষ্ঠুর অবস্থায় শুধু দেশপ্রেমিক পুরুষ রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীগণ বিষয়টি কোনো অবস্থাতেই সামলাতে পারবে না। আমরা যদি ভারতের দিকে তাকাই, তাহলে আমরা স্পষ্ট দেখছি, ভারতের শুধু মুসলিম নারীগণ নন, হিন্দু নাগরিকগণও ভারত সরকারের সব ধরনের ন্যায়হীন, যুক্তিহীন, সত্যহীন, মানবতাহীন, বিষয়সমূহে চরম বিরোধিতা করছে। ভারতে মহিলা বিদ্রোহীদের সংখ্যা কোনো দিকে বাড়ছে আবার কোনো দিকে কমছে। এদের সবার প্রতি আমাদের অভিনন্দন, শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা ভালবাসা, দোয়া ও আশীর্বাদ বাড়ছে। তাছাড়া এটাও আমরা অবলোকন করছি, তথাকথিত সেকুলার সভ্য দেশের কিছু নারীনেত্রী দুনিয়ার সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে সোচ্চার হচ্ছে।

এসব দেখে মনে হচ্ছে, ২৪শের বিপ্লবে যেসব কন্যা-জায়া-জননী জীবনবাজি রেখে সংগ্রাম করেছেন তাদের সংগ্রামী চেতনাকে শুধু সংরক্ষণ বা উজ্জীবন করলেই হবে না, তাবৎ জাতীয় সঞ্জীবনী কাজে তাদের অব্যাহত ভূমিকা পালন করতে হবে। এ বিষয়ে অন্তত প্রত্যেক উপজেলার পুরুষ বিপ্লবী স্টেক হোল্ডারদের সাথে কন্যা-জায়া-জননীদেরকেও এখন থেকে পুনরায় বিপ্লবের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে হবে। বিপ্লবকে ছুটি দেয়া যাবে না। আল্লাহর রসুলের (সাঃ) মদিনা রাষ্ট্রে সপ্তাহে কোনো ছুটি ছিলো না। সপ্তাহের ৭ দিনেই রাষ্ট্র ও সরকারসহ সবশ্রেণীর মানুষের কাজকর্ম ছিলো। তার মানে এই নয়, সবসময় সবাইকে কাজ করতে হয়েছে। সাংসারিক প্রয়োজনে, অসুখ-বিসুখের সময় সবাই সরকারি বা রাষ্ট্রিক কাজে সবসময় ছুটি পেয়েছেন। আলাদা করে কোনো ছুটির ব্যবস্থা তখন ছিলো না। সেই ধরনের একটা ব্যবস্থার দিকে হয়তো আমাদের একসময় পরিবর্তন আনতে হবে। প্রয়োজনে সংস্কার বা পরিবর্তন ঠেকানো যাবে না।

এত বড় একটা অনুষ্ঠানে শুধু একজন নারীর উপস্থিতি দেখে আমরা শংকা, আশংকা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নানা দুঃসপ্ন-ভাবনায় বিচলিত হয়ে পড়েছি। সে কারণেই প্রতীকী হিসেবে উপস্থিত মহিলাকে স্টেজে আরহণ করে কিছু কথা বলার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। বিষয়টা হয়তো, সবাই আমাদের মতো ভাবেনি। না ভাবারই কথা। বিশেষ করে যাঁরা ২৪শের বিপ্লবে বিশেষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদেরকে আমরা এদিকে বা এ বিষয়ের দিকে মনোযোগ দেয়ার স্ববিশেষ অনুরোধ জানাচ্ছি।

বাংলাদেশ, আমাদের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী একটি সেকুলার দেশ। এখানে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘুর কথা পূর্বের মতো বলা যাচ্ছে না। কিন্তু ইসলামিস্ট, ডানপন্থী, মধ্যপন্থী এবং সাধারণ মুসলমানগণ সবসময় বলে আসছেন, বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ। এখানকার শতকরা ৯০জন মানুষ মুসলিম। তারা মুসলমানদের অগ্রাধিকারের কথা অহর্নিশ বলছেন। এই সত্যকে বা এই বাস্তবতাকে কখনও অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু মুসলমানদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস, ভূগোল কোনো কিছুকে তো অগ্রাধিকার দেয়া যাবে না। এখানে এখন সবাই সমান। সবার প্রতি সমান দৃষ্টি রাখতে হবে। এটা যে শুধু সেকুলার স্টেটের বিষয় তা নয়। ইসলামের মূল চেতনার বিষয়টিও প্রায় একই রকম। মদিনা সনদভিত্তিক যে রাষ্ট্র, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) পরিচালনা করেছিলেন, সেখানেও মুসলিমদের গোষ্ঠী ছাড়া আরও প্রায় ৪১গোষ্ঠীর সাথে সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া একই ধরনের সমতা ও সুনীতি বিরাজমান ছিলো।

পাকিস্তান আমলে তথাকথিত ইসলামী রাষ্ট্র ছিলো। তারপরও সংখ্যালঘুদের জন্য পৃথক নির্বাচনের প্রস্তাব উঠেছিলো। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির উদ্যোগে সেটা বন্ধ করা হয়েছিলো। কারণ তিনি ও তাঁর দল খুব চিন্তা করে দেখেছিলেন, এতে সংসদে সংখ্যালঘুর সংখ্যা অনেক গুন বেড়ে যাবে। মুসলিম লীগতো ওদের পক্ষেই কথা বলেছিলো। অন্যান্য ইসলামী দলগুলোও তো এসবের কোনো বিরোধিতা করেনি। কারণ ইসলামী রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুরা রাষ্ট্র, সরকার, ও জনগণের কাছে আমানতস্বরূপ। তাদের জান-মাল-ইজ্জত-ধর্ম-কৃষ্টি-ঐতিহ্য-জাতিসত্ত্বা-আত্মপরিচয়-চাকরি-বাকরি-ব্যবসা-বাণিজ্য-জীবনধারণের সকল অনুষঙ্গ দেখার গুরু দায়িত্ব সমাজ-সরকার-রাষ্ট্রসহ সকলের ওপর ন্যাস্ত। কেন সেটা করা যায়নি সেটা সোহরাওয়ার্দী ও তার দলের আসল কার্যক্রম খুঁটিয়ে দেখলে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে।

যাহোক, এখন আমরা সবকিছু খোলা মনে বিচার-বিবেচনা করছি। এই বিবেচনায় সকল জাতি-ধর্ম-বর্ণ-আদর্শ-মতবাদ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের, সকল স্বার্থ দেখার দায়িত্ব সরকার ও জনগণের। সেইদিক থেকে বিবেচনা করলে সকলের সাথে সকলের পরিচিতি থাকবে। সকলে সকল ধর্ম-ইতিহাস ও কিংবদন্তি সম্পর্কে জানবে। জানার জন্য আমাদের মেলামেশা বাড়বে। সেই পথেই এখন আমাদের অগ্রসর হতে হবে।

সরকারের উচিত হবে সকল ধর্মের মূলগ্রন্থ বাংলা অনুবাদ করে সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের ঘরে ঘরে পৌঁছানো। তাহলে আমাদের জানাশোনা বাড়বে, সম্পর্ক বাড়বে এবং প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ তৈরী হবে। আমরা মুসলিমরা অন্যান্য ধর্মের মূলবাণীগুলো জানি না। আবার তারাও আমাদের সম্পর্কে খুব ভালভাবে জানে না। গত প্রায় ৮০ বছরেও এ ধরনের কোন প্রয়াস সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয় নি। এখন সরকারি হোক বেসরকারি হোক এ সব বিষয়ে সবাইকে উদ্যোগ নিতে হবে।

মুসলিমদের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক সকল অনুষ্ঠানে ভিন্ন ধর্মের, ভিন্ন আদর্শের ও বিভিন্ন মতবাদের নাগরিককে অংশগ্রহণের জন্য তাজিমের সাথে দাওয়াত দিতে হবে। প্রত্যেক ধর্মের, বা প্রত্যেক মতবাদের মানুষ আলাদা আলাদা ‘চাইনিজ টাউন’ বা ‘চায়না টাউন’ তৈরি করে বসবাস করলে চলবে না। চাইনিজরা বিভিন্ন দেশে ‘চায়না টাউন’ তৈরী করেছিলো কিন্তু এতে কোনো লাভ হয়নি। এতে তাদের মধ্যে সংকীর্ণতাই বেড়েছে এবং তাদের রাষ্ট্রিক অভিভাবকরাও অনুধাবন করেছে ভিন্ন দ্বীপে অবস্থান করলে শারীরিক ও মানসিকভাবে উন্নতি বিধান করা যায় না। মানুষ এক ধরনের আলাদা জীবে পরিণত হয়। সেই জীব নিজের ক্ষতি করে, নিজের পরিবারের ক্ষতি করে এবং নিজের সরকার ও রাষ্ট্রের ক্ষতি করে। সে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত ‘চায়না টাউনগুলো’ ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে এবং কোনো কোনো শহরে বাঙালি মুসলিমরা সেসব ক্রয় করছে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অধিবাসী হয়ে নিজের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের লালন করা যায় না। সবার সঙ্গে নৈতিকভাবে বাস করে নিজেকে বা নিজের সমাজকে বড় করা যায়। কারণ এখন আর কোনো কিছুই গোপনে করা যায় না। ইন্টারনেট, আইটি, ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সবকিছুই এখন সবার পকেটে।

চীনের প্রাচীর ঘেরা রাষ্ট্রও এখন আর অজানা অচেনা রাষ্ট্র নয়। তথ্য প্রবাহের অসীম শক্তি সব তথ্য ও অপতথ্য প্রতিমুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে। ভালো-মন্দ একসাথে অবস্থান করলেই এখন সত্যিকারভাবে বোধগত, বিশ্বাসগত বিষয়গুলো সবার সামনে পরিস্ফুট হবে। গোপন করে বা নিজেদের দোষ-ত্রুটিগুলো গোপনে রেখে কোনো জাতি এখন আর বড় হতে পারবে না। বড় হতে পারবে শুধু ধর্ম দিয়ে নয়, জ্ঞান-বিদ্যা-বুদ্ধি-উপলব্ধি-সত্যান্বেষণ-মানবতা-নীতি-নৈতিকতা নিয়েই মানুষকে বড় হতে হব। দুনিয়ার প্রচলিত সভ্যতা ও সংস্কৃতি নিয়ে মানুষ আর বড় হতে পারবে না। মানুষকে আবার প্রত্যাদিষ্ট বা আসমানী জ্ঞানের দিকে ফিরে তাকাতে হবে।