মুন্সী আবু আহনাফ
রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নির্মম সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে; জনগণকে শোষণের যাঁতাকলে পিষে, গণহত্যা চালিয়ে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে পেয়াদা বানিয়ে যারা পালিয়ে বেঁচেছে, তারা কোনোদিন সসম্মানে রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারেনি। ইতিহাস তাদের জন্য কোনো লাল গালিচা বিছিয়ে রাখে না; বরং তাদের স্থান সংকলিত করে আস্তাকুঁড়ে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান দেড় দশকের ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে অবসান ঘটেছিল ভয়াল এক স্বৈরাচারী অধ্যায়ের। কিন্তু সম্প্রতি গণহত্যাকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং ভারতে আশ্রিত ইতিহাসের কুখ্যাত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে আবার দেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার কিছু ব্যর্থ অপচেষ্টা ও রাজনৈতিক সমীকরণ খতিয়ে দেখার চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও ভূরাজনৈতিক অন্দরমহলের কিছু গোষ্ঠী থেকে এই প্রশ্নটি তোলার চেষ্টা হচ্ছে; বিশ্বের পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকার প্রধান ও তাদের রাজনৈতিক দলগুলো কি আদৌ কোনোদিন রাজনীতিতে ফিরতে পেরেছে? জুলাই গণহত্যার রক্তের দাগ মুছে পলাতক আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার কি বাংলাদেশে রাজনীতি করার বিন্দুমাত্র আইনি বা নৈতিক সুযোগ রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের একাধারে ইতিহাসের বৈশ্বিক খতিয়ান, আন্তর্জাতিক আইনের শাসন এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।
এক. বিশ্বের পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকার প্রধানদের করুণ পরিণতি দেখেছে বিশ্ববাসী এখন শুধু ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার করুণ পরিণতির শেষ অধ্যায় দেখার বাকী? ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে নিজ দেশের মানুষের ওপর গণহত্যা চালানো ফ্যাসিস্ট শাসকেরা যখন গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালায়, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন ও পরিত্যক্ত অপাঙ্কতেয় প্রাণীতে পরিণত হয়। তাদের প্রত্যাবর্তন তো দূরের কথা, তাদের জীবনাবসানও হয় নিদারুণ নির্মমতা ও অপমানের মধ্য দিয়ে।
ফিলিপাইনের ফের্দিনান্দ মারকোস দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সামরিক শাসন ও স্বৈরাচার চালিয়েছিলেন। বিরোধী রাজনীতিকদের হত্যা, গুম এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় অর্থ লুণ্ঠন ছিল তার শাসনের মূল বৈশিষ্ট্য। ১৯৮৬ সালে ঐতিহাসিক ‘পিপল পাওয়ার রেভোলিউশন’-এর মুখে তিনি মার্কিন সামরিক বিমানে চড়ে হাওয়াইতে পালিয়ে যান। যুক্তরাষ্ট্র তাকে আশ্রয় দিলেও তা ছিল কার্যত এক গৃহবন্দিত্ব। পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও শারীরিক জটিলতায় ভুগে মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৮৯ সালে হাওয়াইয়ের হোনোলুলুতে নিস্ব ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ফিলিপাইনের মাটিতে তিনি বা তার সরকার আর কখনো সসম্মানে ফিরে আসতে পারেনি।
উগান্ডার ইদি আমিন নিজের দেশে প্রায় তিন লাখ মানুষকে হত্যা, অঙ্গহানি ও গুম করার জন্য পরিচিত ছিলেন একজন নৃশংস একনায়ক হিসেবে। ১৯৭৯ সালে গণবিক্ষোভ ও সামরিক আক্রমণের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তিনি প্রথমে লিবিয়ায় এবং পরবর্তীতে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন। সৌদি রাজপরিবার তাকে এই শর্তে আশ্রয় দিয়েছিল যে তিনি কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারবেন না। বহু চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি আর কোনোদিন উগান্ডার মাটিতে পা রাখতে পারেননি। ২০০৩ সালে জেদ্দায় কিডনি বিকল হয়ে নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
তিউনিসিয়ার জাইন আল-আবিদিন বেন আলি ‘আরব বসন্ত’-এর সূচনায় ২০১১ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালায়। দেশের বিপুল সম্পদ লুণ্ঠনকারী স্বৈরাচার বেন আলি রাতের আঁধারে পরিবারসহ সৌদি আরবে পালিয়ে যান। তিউনিসিয়ার স্বাধীন বিচার বিভাগ তার অনুপস্থিতিতে তার বিচার শেষ করে গণহত্যা, গুম ও দুর্নীতি মামলার দায়ে তাকে দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেয়। ২০১৯ সালে জেদ্দায় চরম অপমান ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তার জীবনাবসান ঘটে।
ইউরোমাইদান আন্দোলনে ১০০টিরও বেশি প্রাণহানির পর জনগণের প্রচণ্ড ক্ষোভের মুখে কিয়েভ থেকে পালিয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ। ২০১৯ সালে ইউক্রেনের উচ্চ আদালত তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং নিজ দেশের বিরুদ্ধে শত্রু রাষ্ট্র রাশিয়ার সাথে যোগসাজশের অপরাধে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেয়। আজ তিনি নিজ দেশের মানুষের কাছে একজন চরম ধিকৃত ও চিহ্নিত জাতীয় গদ্দার হিসেবে পরিচিত।
দুই. পলাতক ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দলের করুণ পরিণতিও দেখেছে বিশ্বের মানুষ। ব্যক্তি শাসকের পতনের সাথে সাথে তাদের লালন করা ফ্যাসিস্ট দলগুলোর পরিণতিও একই সূত্রে গাথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির নাৎসি পার্টি (NSDAP) কিংবা ইতালির ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টিকে কেবল আইনি প্রক্রিয়ায় নিষিদ্ধই করা হয়নি; তাদের রাজনৈতিক ভাবাদর্শকে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে চিরতরে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
আধুনিক যুগেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। আফ্রিকার কঙ্গোর মোবুতু সেসে সেকোর ‘এমপিআর’ (MPR) দল কিংবা কম্বোডিয়ার গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত স্বৈরাচারী কমিউনিস্ট সরকার ‘খেমার রুজ’ (Khmer Rouge)-কে আইনি প্রক্রিয়ায় এবং সংসদের মাধ্যমে বিলুপ্ত করা হয়েছিল। ইউক্রেনের ‘কম্যুনিস্ট পার্টি’ এবং ‘অপজিশন প্ল্যাটফর্ম -ফর লাইফ’-এর মতো বড় রাজনৈতিক দলগুলো, যারা নিজ দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে প্রতিবেশীর সেবাদাস হিসেবে কাজ করেছিল, আদালতের রায়ে ও জনগণের চূড়ান্ত গণধিক্কারে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গণহত্যাকারী ও গুম-খুনের রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক দলগুলোকে পৃথিবীর কোনো সভ্য ও স্বাধীন জনগণ আর কোনোদিন রাজনীতির ময়দানে স্বাগত জানায়নি।
তিন. একুশ শতকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পালিয়ে থাকা স্বৈরাচার ও তাদের রাজনৈতিক দলগুলোর স্থান বিশ্ব রাজনীতিতে আরও সংকুচিত হয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক আইন (International Humanitarian Law ) ও রোম সংবিধি (Rome Statute) অনুযায়ী, “গণহত্যা” (Genocide) এবং “মানবতাবিরোধী অপরাধ” (Crimes against Humanity)-এর বিচারিক দায়ের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা মেয়াদোত্তীর্ণতা (Statute of Limitations) থাকে না। যে দল বা দলপ্রধান গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত বা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত হয়, তাদের “পলিটিক্যাল স্পেস” বা রাজনৈতিক অধিকার দেওয়ার কোনো সুযোগ আন্তর্জাতিক বা দেশীয় আইনি সংস্কৃতিতে বহাল থাকে না। আধুনিক বিশ্ব কোনো গণহত্যাকারী দলকে ‘রাজনৈতিক বিরোধী দল’ বা গণতান্ত্রিক শক্তির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে না; বরং তাদের গণ্য করে একটি সুসংগঠিত ‘অপরাধী চক্র’ বা ‘ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন’ হিসেবে। অনুরুপ ভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি সুসংগঠিত ‘অপরাধী চক্র’ বা ‘ক্রিমিনাল পার্টি’।
চার. জুলাই গণহত্যার মূল আসামী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কি? এই বৈশ্বিক ও আইনি অভিজ্ঞতার আলোকেই যদি আমরা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করি, তবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। গত ১৫ বছরের শাসনকালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ‘আয়নাঘর’-এর নির্মম নির্যাতন, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং সবশেষে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন রুখতে গণহত্যা চালিয়ে ২ সহস্রাধিক মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত এশিয়ার দানবখ্যাত কুখ্যাত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)-এ ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার অভিযোগে প্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে এবং তাকে ফেরত দিতে
ভারত সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে এবং অন্যান্য মামলায় তাঁর চূড়ান্ত বিচার প্রক্রিয়া চলমান। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের হাজারো নিরীহ ছাত্র-জনতার রক্তে যার হাত রঞ্জিত, যিনি বিচার ফেস করার ন্যূনতম সাহস হারিয়ে ভিনদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁর রাজনৈতিক পুনরুত্থান বা বাংলাদেশে ফিরে আসার স্বপ্ন একটি চরম অলিক ফ্যান্টাসি ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের পলাতক ফ্যাসিস্টদের যে পরিণতি হয়েছে দৃশ্যত শেখ হাসিনার পরিণতি এরচেয়ে ভালো কিছু হবে বলে মনে হয় না। কারণ খুনি শেখ হাসিনা একজন জালিম আর মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জালিমের পরিণতি হয় ভয়াংকর। ভারতের মাটিতে বসে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও বার্তা পাঠিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ বা পুনর্বাসনের দিন চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। এটা আর সম্ভব হবে না কোনদিন?
পাঁচ. বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদের ভয়াবহতা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর রাজনৈতিক পুনর্বাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলা মোটেও অবান্তর নয়। আজ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ এবং যুবলীগসহ এর সব সহযোগী সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও স্থগিত করার দাবি কেবল রাজপথের সোচ্চার স্লোগান নয়, বরং তা জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে একটি সর্বজনীন আইনি ও সামাজিক দাবিতে পরিণত হয়েছে। যে রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূলের ক্যাডাররা পর্যন্ত একদফা ছাত্র-জনতার ন্যায্য অধিকার দমনে সরাসরি মেগাফোন হাতে উসকানি দিয়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের পুলিশ-র্যাব ও পেটোয়া বাহিনী ব্যবহার করে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল এবং স্নাইপারের প্রাণঘাতী বুলেটে দেড় সহস্রাধিক মুক্তিকামী মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করেছে; তাদের রাজনীতিতে ফিরে আসার নৈতিক কিংবা আইনি অধিকার অক্ষুণ্ন থাকে কীভাবে?
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)-সহ বিশেষ বিচারালয়গুলোতে যখন পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও সুনির্দিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং জুলাই গণহত্যার সুনির্দিষ্ট মামলা ও বিচার প্রক্রিয়া চলমান, তখন এই শক্তিকে পুনরায় রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া মানে শত শত শহীদদের তাজা রক্তের সাথে চরম প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসঘাতকতা করা। তাছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে ‘আয়নাঘর’-এর মতো গোপন বন্দীশালা বানিয়ে নাগরিকদের গুম করা এবং স্বৈরাচারী শাসন পোক্ত করার যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি তারা তৈরি করেছিল, কোনো গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা আবার স্বেচ্ছায় সেই অন্ধকারে ফিরে যেতে পারে না।
আইনি ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি অতি স্পষ্ট। রোম সংবিধি ও আন্তর্জাতিক আইনি ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, গণসংহার ও মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো মেয়াদোত্তীর্ণতা (Statute of
Limitations) থাকে না। সংবিধিবদ্ধ বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক দল যখন এককভাবে বা দলগতভাবে ‘অপরাধী সংগঠন’ ((Criminal Organization ) হিসেবে প্রমাণিত বা বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়, তখন তার দলীয় নিবন্ধন বা রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার স্বাভাবিক অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবেই রদ হয়ে যায়।
বিশ্বের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানির নাৎসি পার্টি, ইতালির ফ্যাসিস্ট পার্টি কিংবা কম্বোডিয়ার গণসংহারকারী খেমার রুজ; কোনো গণহত্যাকারী রাজনৈতিক দল বা শক্তিই পৃথিবীর কোনো দেশে আর কোনোদিন স্বাভাবিক রাজনীতিতে সসম্মানে ফিরতে পারেনি। তাই, সভ্য ও স্বাধীন বাংলাদেশের রাজপথে গণহত্যার দাগ মুছে গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার এই অবাস্তব প্রত্যাশা বৈশ্বিক ইতিহাস, আইনি বাস্তবতা ও গণদাবির নিরিখে সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। How Hasina's Awami League fell from power এই শিরোনামের ইউটিউবের ভিডিওটিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে, যা অনুচ্ছেদে উল্লেখিত গণদাবি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
ছয়. বাংলাদেশের জনগণের মনস্তত্ত্ব: গুম, খুন ও আয়নাঘরের রাজনীতিতে ফেরা কি আদো আবারও সম্ভব? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো; বাংলাদেশের জনগণ কি গণহত্যাকারী দল আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে কোনো দিন গ্রহণ করবে? যে দেশের মায়েরা তাঁদের সন্তান হারানোর কান্নায় ব্যাকুল, যে দেশের হাজার হাজার যুবক চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, হাজার হাজার ছাত্র-জনতা চোখ হারিয়েছে? যে দেশের সচেতন মানুষ ‘আয়নাঘর’-এর মধ্যযুগীয় বর্বরতা প্রত্যক্ষ করেছে; সেই দেশের মানুষ কি আবার স্বেচ্ছায় সেই বিভীষিকাময় গুম, খুন ও স্বৈরাচারের রাজনীতি ফিরিয়ে আনবে? উত্তরটা একদম স্পষ্ট এবং অকাট্য-’না’। বাংলাদেশের মানুষ পরম ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদের শেকল ভেঙেছে। ছাত্র-জনতার এই গণজাগরণ কেবল একজন ব্যক্তির পতন ঘটায়নি, বরং বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার চূড়ান্ত রাজনৈতিক কফিন রচনা করেছে। জনগণ আর কখনোই এ দেশের মাটিতে হত্যার রাজনীতি, গুমের অপসংস্কৃতি কিংবা ভারতীয় আধিপত্যবাদের সেবাদাসদের মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবে না।
সাত. বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বৈরাচারের পুনর্বাসনের চক্রান্ত বানচাল করতে আমাদের দেশের স্বাধীন গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের নামে বা সিনিয়র সাংবাদিকের নামে যারা আওয়ামী বয়ান তৈরি করছে তারা আসলে জুলাই গণহত্যার সমর্থক এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর। যারা তথ্য যাচাই না করে মনগড়া বক্তব্য ছড়ায় বা রাজনৈতিক ফাঁকা বুলি তৈরি করে, তাদের বিরুদ্ধে তথ্যের বস্তুনিষ্ঠ সত্যতা তুলে ধরা অপরিহার্য। সমকালীন বৈশ্বিক ইতিহাস প্রমাণ করে যে, আদালতের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ এবং পলাতক গণহত্যাকারীদের স্থায়ী রাজনৈতিক মৃত্যু একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক বাস্তবতা।
পরিশেষে, ফ্যাসাদ, নিপীড়ন ও গণহত্যার ওপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত রাজনীতি কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে যে ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল, তার পরিণতিও বিশ্বের অন্যান্য সুপরিচিত স্বৈরাচারদের মতোই নির্ধারিত হয়ে গেছে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, পলাতক স্বৈরাচারীদের কোনো রাজকীয় প্রত্যাবর্তন হয় না; তাদের স্থান কেবল ইতিহাসের অন্ধকার পৃষ্ঠায়, গণধিক্কারে ও অপরাধ আদালতের আসামীর কাঠগড়ায়। জনগণের হৃদয়ে তাঁদের জন্য অবশিষ্ট রয়েছে কেবল ঘেন্না ও ধিক্কার। বাংলাদেশের আকাশে ফ্যাসিবাদ আর কোনো দিন ফিরে আসবে না; এটিই জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তে লেখা দেশের ষোলো কোটি মানুষের চূড়ান্ত অঙ্গীকার।