২০২৪ সালের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী আগামী ৫ আগস্ট। সে বছর পুরো জুলাই জুড়ে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে নিহত হয় অসংখ্যা ছাত্রছাত্রী, কচি কিশোর, মজুর, রিকশা শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার শত শত মানুষ। প্রাণ দেন কয়েক জন সাংবাদিকও। নিকট অতীতে বাংলাদেশে সরকার বিরোধী আন্দোলনে এত লোক আর প্রাণ হারাননি। আর জুলাই আন্দোলনের সেই ধারায় ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাই দেশ মুক্তি পায় স্বৈরাচারী শাসনের হাত থেকে। বিগত দুটি বছরে কিছু কিছু কাজ হয়েছে, কিছু অনিষ্পন্ন রয়েছে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। অপরাধী ও হত্যাকারীদের বিচার চলমান। রাষ্ট্র সংস্কারসহ কিছু কাজ এখনো বাকি।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপটটি তুলে ধরা দরকার। কারণ জুলাইকে আমাদের মনে রাখতে হবে। ২০২৪-এর কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পরিবর্তনের এই আন্দোলন। এটা ছিল বাংলাদেশে সব ধরনের সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে সংগঠিত একটি আন্দোলন। ছাত্রছাত্রী সমানভাবে আন্দোলনে স¤পৃক্ত হয়। ক্রমান্বয়ে সে আন্দোলন এক দফার আন্দোলনে পরিণত হয়ে সাড়ে ষোল বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়। দীর্ঘ সাড়ে ষোল বছর ধরে মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভ ছিল তা যেন প্রকাশ ঘটলো এদিন। ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ৫ জুন। সে দিন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের জারি করা পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করে। এর পর কোটা পদ্ধতির সংস্কার আন্দোলন আবার নতুনভাবে আলোচনায় আসে। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ৫ জুনের উক্ত পরিপত্র জারি করা হয়েছিল। ঐ পরিপত্রের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে নবম গ্রেড (পূর্বতন প্রথম শ্রেণি) এবং ১০ম-১৩তম গ্রেডের (পূর্বতন দ্বিতীয় শ্রেণি) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সকল কোটা বাতিল করা হয়েছিল। এটা কিন্তু ছাত্ররা চায়নি। তারা চেয়েছিল সংস্কার। বাতিল চায়নি। বাতিল করে দিয়ে সংকটের বীজ রেখে দেয়া হয়েছিল। আর সেটারই প্রকাশ ঘটে কোর্টের আদেশের মধ্য দিয়ে।
কোর্টের আদেশে বদলে যেতে পারে না তরুণদের চাওয়া-পাওয়া। তাই তারা ফুঁসে ওঠে। ৫ জুন শুরু হয় প্রতিবাদ কর্মসূচি। ধাপে ধাপে তা পৌঁছে ১৬ জুলাইয়ে। আসে সে রক্তঝরা দিনটি। যে দিন আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে রংপুরে বুক পেতে দিয়ে গুলির সামনে দাঁড়ান অকুতোভয় ছাত্র আবু সাঈদ। তিনি গুলি খেয়েও ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন। বলতে চেয়েছেন তার দাবির কথা। তার পর আবার গুলি। এর পর তিনি শাহাদাতের অনন্ত পথে যাত্রা করেন।
সে দিন সারাদেশে গুলিতে নিহত হয় মোট ৬ জন। সে থেকে স্ফুলিঙ্গ ছড়ায় ছাত্রদের আন্দোলন। পরে তা হয়ে ওঠে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধ। শেষে তা সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় অভ্যুত্থান হয়ে।
মানুষ ফুঁসে উঠেছিল কেন? ২০২৪ এর কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা। আর সরকার চাইছিল মরীয়া হতে দেশ শাসন করতে, ছাত্রছাত্রীদের কঠোর হাতে দমন করতে। কিন্তু তারা ভুল প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হওয়ায় সাফল্য পাচ্ছিল না। আন্দোলন দিন দিন দানা বাঁধছিল। এক পর্যায়ে পুলিশ ও সরকারি দলের লোকেরা বিশেষ করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনে জড়িতদের নির্বিচারে এমনি পাখির মতো গুলি করে হত্যা করতে শুরু করে। একটি স্বাধীন দেশে কেন অধিকার আদায়ে মাঠে নামলে এভাবে শিশুদের হত্যা করা হবে তা ছিল জনগণের জিজ্ঞাসা। তারা এটা মেনে নিতে পারেনি। প্রতিদিনই ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরতে লাগল। এসব চিত্র নিজ চোখের সামনে দেখে, টিভির স্ক্রিণে, ফেসবুক ইউটিউবের ভিডিওতে দেখে মানুষ কেঁপে ওঠে ফুঁসে ওঠে। তবে সব টিভি ও সংবাদপত্রে এসব ছবি ছিল না। সরকারের দোসর টিভি ও সংবাদপত্র এগুলো আড়াল করতে ব্যস্ত ছিল। রংপুরের ছাত্র আবু সাঈদকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। এই হত্যা মেনে নিতে পারেনি মানুষ। ফলে নিমেষেই তা স্ফুলিঙ্গে রূপ নেয়।
দেশে গণতন্ত্র ছিল না। ছিল এক দলীয় শাসন। সবকিছু দখল করা ছিল শাসক দলের কাজ। পুরো দেশটা এতদিন কিভাবে চলে আসছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এই এক তরফা শাসন থেকেই তা সহজেই অনুমেয়। স্কুলের শিক্ষার্থীদের এ বিক্ষোভ যে শুধু দু’জন সহপাঠি হারাবার জন্য নয়, দিনে দিনে গড়ে উঠা অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি, নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিপ্রকাশ তা ক্ষমতার মসনদে যারা বসে আছে তাঁদের বুঝাতে চেয়েছে।
একটি দেশকে ঠিক করবার জন্য বা সুশাসন দেবার জন্য ৫৩ বছর কিন্তু অনেক লম্বা সময়। এদেশের মানুষ যতবার আশায় বুক বেঁধেছে, ততবারই তাঁদের আশা ভঙ্গ হয়েছে। এদের মানুষ শেষ আশান্বিত হয়ে উঠছিল ২০০৮ সালে। নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ যখন দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে বলেছিল, মানুষ বিশ্বাস করেছিল। মানুষ যে দল হিসাবে আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করেছিল তা নয়। জনগণ ভেবেছিল ১/১১ এর তিক্ত অভিজ্ঞতার পর রাজনৈতিক দলগুলি শিখবে, আর হয়ত ভুল পথে পা বাড়াবে না। এবার হয়ত দেশটা ক্রমান্বয়ে সঠিক পথে ফিরে আসবে। আওয়ামী লীগ যখন উন্নয়নের রোডম্যাপ এবং দুর্নীতিমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলল, মানুষ আরেকবার দলটিকে সুযোগ দিতে চাইল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠল আওয়ামী লীগ ভুল পথেই হাঁটছে। একটানা সাড়ে ষোল বছর তারা ভুল পথে হেঁটেছে। সকলের চাওয়া ও দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচনের চমৎকার ব্যবস্থা সম্বলিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, এক দলীয়ভাবে দেশ পরিচালনা ও পরবর্তী তিনটি নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে করার ফলে যা হবার তাই হয়েছে। গড়ে ওঠেনি সুশাসনের কোন ব্যবস্থা, মানুষের মতের প্রতিফলন না ঘটায় সরকার বিরোধী কোন দলকে রাখা হয়নি, দেয়া হয়নি অবাধ রাজনীতি করার সুযোগ। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের অন্যতম বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে দমন পীড়ন, জেল জুলুমের মুখোমুখি করা, তাদের বহু নেতাকর্মীকে হত্যা করা, তাদের কার্যালয় বন্ধ করে দেয়ার মতো ঘৃণ্য সকল কার্যক্রম চালানো হয়েছে। রাজনীতি থেকে বঞ্চিত থেকেছে দেশের অন্য অনেক দল। এভাবে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম, অনাচার, সন্ত্রাস আর দেশ থেকে সম্পদ পাচারের অবাধ সুযোগ করে দিয়ে আওয়ামী লীগ দেশটিকে সর্বস্বান্ত করে দিয়ে যায়। দেশে চাপিয়ে দেয়া হয় পরিবারতন্ত্র। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়ে ওঠেন অত্যন্ত ক্ষমতাধর একজন হিসেবে। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী না হয়ে দলের নেতা হিসেবেই কাজ করেছেন। ফলে রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ষোল বছরের মাথায় শেষ পর্যন্ত তা ভেঙে পড়ে। ৫ আগস্ট প্রাণ বাঁচাতে তিনি ভারতে পালিয়ে যান। দেশের ইতিহাসে রচিত হয় আরেক কলংকজনক অধ্যায়।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবার পর অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন যেহেতু বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সব সময় সোচ্চার ছিল তাই হয়ত ক্ষমতায় এসে দলটি প্রথমেই ‘বন্দুক যুদ্ধের’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে উদ্যোগ নেবে। কিন্তু, কিছুদিনের মাঝেই জনগণের সামনে এ বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, ‘অপারেশন ক্লিন হার্টের’ পথ ধরেই এ সরকার হাঁটবে। তার সাথে যোগ হল ‘গুমের সংস্কৃতি’। বিষয়গুলো মানুষকে আতঙ্কিত করল, মানুষ আশা ভঙ্গ হল। মানুষ যে এ বিষয়গুলো পছন্দ করছে না সেটা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব হয়ত বুঝতে পারেনি অথবা বুঝতে চান নাই। আওয়ামী লীগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়ন বিষয়টার উপর জোর দিতে লাগল। তাঁরা ভাবলো উন্নয়ন হলেই জনগণ খুশি থাকবে, জনগণ তাঁদের সমর্থন করবে। কিন্তু, উন্নয়নের চেয়েও জনগণের আকাক্সক্ষার জায়গাটা ছিল সুশাসনের উপর, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা যার প্রাথমিক পূর্ব শর্ত। এসব তথাকথিত উন্নয়নকে কসমেটিক ডেভেলপমেন্ট বলা হয়ে থাকে। ১৬ বছরের শাসনে আওয়ামী লীগ এ সুশাসন প্রতিষ্ঠার জায়গাটিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হতাশার জায়গা তৈরি হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটি উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে না উঠায়।
রাজনৈতিক দলগুলির সাথে এর সহযোগী অঙ্গ ছাত্র সংগঠনগুলির উপরেও ছাত্র সমাজ আর আস্থা রাখতে পারছিল না। ফলে, কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন সবই হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত নেতৃত্বে। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন সংযোজন। ছাত্র-যুব সমাজ রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে না তাকিয়ে থেকে নিজেরাই নিজেদের দাবি পূরণের আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছে। তবে সহযোগী হিসেবে অনেকেই পাশে দাঁড়িয়েছে, যুগিয়েছে শক্তি ও সাহস।
ছাত্রছাত্রীরা যেটা করে দেখিয়েছে সেটা হলো স্বৈরাচার হটানো, সুশাসনের দিকে নিয়ে যাওয়া, আর রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি তোলা। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে, কোটা ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে, সর্বোপরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করতে, স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হলে সবার আগে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়টাই দেশ কাঁপিয়ে নতুন প্রজন্ম আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়ে গেছে।
জুলাই গণহত্যা : জুলাই গণহত্যা বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের সময়কার একটি করুণ অধ্যায়। ৫ আগস্ট বিজয়ের দিনটির পূর্বে সংঘটিত একটি কালো অধ্যায়ও। অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলনরত ছাত্র জনতার বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় এই গণহত্যা। প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-জনতা এ আন্দোলনে গণহত্যার শিকার হয়েছে, শহিদ হয়েছে। আহত হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার। এখনো সেই ক্ষত তারা বয়ে বেড়াচ্ছে। একটি স্বাধীন দেশে সাধারণ একটি চাওয়াকে বাধাগ্রস্ত করে রক্তস্নাত পথে সমাধান করতে গিয়ে একনায়কতান্ত্রিক সরকার বেছে নেয় নির্বচারে হত্যার মতো পৈশাচিক পথ, গণহত্যাার পথ। জাতিসংঘ এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত করে একে মানবতাবিরোধী তৎপরতা ও বিচার বহির্ভূত হত্যা বলে অভিহিত করেছে। তাদের প্রতিবেদনে ১৪০০ লোক প্রাণ দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা জুলাই গণহত্যার বিষয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এ গণহত্যার মুখে দাঁড়িয়ে সাধারণ ছাত্র মজুর রিকশাচালক সাহসী ভূমিকা পালন করে, অকাতরে জীবন দেয়। এনে দেয় গণতন্ত্র, স্বাধীনতা। এই গণহত্যার পথ মাড়িয়েই আসে বিজয়ের ৩৬ জুলাই। সে শহীদদের স্মরণ করি, তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করি।
আগেই বলেছি, জুলাই আন্দোলনের পথ ধরে দেশ স্বৈারাচারমুক্ত হয়েছে। আর দেড় বছরের অন্তর্বর্তী শাসনের পর নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্বাচন। বিরোধী দলগুলোর এ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও জাতির স্বার্থে তারা ফল মেনে নিয়ে সংসদে অংশ নিচ্ছে। কারণ জুলাই ঐক্য ধরে রাখা জরুরি। আর মানবতার বিরুদ্ধে যারা অপরাধ করেছে, শিশু ছাত্র হত্যা করেছে তাদের বিচার চলমান। অনেক অপরাধীর সাজা হয়েছে। তা কার্যকরের অপেক্ষায়। তবে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজটি পিছিয়ে পড়েছে। সেটা হওয়া দরকার। সবার আশা সেটাও সম্পন্ন হবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।