আমাদের দেশের সিংহভাগ কৃষকই প্রান্তিক শ্রেণির। তাই কৃষি কাজের জন্য তাদেরকে কৃষিঋণ গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু এদের একটি বড় অংশ হতদ্ররিদ্র হওয়ায় তাদের পক্ষে গৃহীত ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। ফলে তাদেরকে মামলা সহ নানাবিধ জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। জেল-জরিমানাও হয় কোন কোন ক্ষেত্রে। তাই ঋণ পরিশোধে অপারগ কৃষকদের ঋণ মওকুফে আবশ্যকতা দেখা দেয়।

সে বাস্তবতাকে সামনে রেখেই বর্তমান সরকার কৃষিঋণ মওকুফের এক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর কৃষিখাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিএনপি সরকার। সে ধারাবাহিকতায় গত ৫ মাসে ৭ লাখের বেশি কৃষকের ৬০০ কোটি টাকার বেশি কৃষিঋণ মওকুফ করেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি)। সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে কৃষি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে এসব ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। গত কয়েক মাসে তথ্য যাচাই-বাছাই ও হিসাব সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগী কৃষকদের এ মওকুফ কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। যা সরকারের একটি অতি প্রসংশনীয় উদ্যোগ বলেই মনে করা হচ্ছে।

জানা গেছে, সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সরকারের পক্ষে জানানো হয়, শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতের কৃষকেরা এ সুবিধা পাবেন। এ সিদ্ধান্তের ফলে মওকুফ হবে মোট ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। এতে প্রায় ১২ লাখ কৃষক সুফল পাবেন। সরকারের সে নির্দেশনা অনুসারে, দেশের ৪৮টি জেলার ৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ জন কৃষকের মোট ৬০৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা ঋণ মওকুফ করেছে কৃষি ব্যাংক। সূত্রমতে, দেশে মোট বিতরণ করা কৃষিঋণের প্রায় ৬৩ শতাংশই এককভাবে প্রদান করে ব্যাংকটি। মূলত, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণের বোঝা কমাতে কৃষি ব্যাংক এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকার ঘোষিত মোট মওকুফ করা ঋণের প্রায় ৩৯ শতাংশই এককভাবে বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।

একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী থাকা কৃষিঋণ প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেছিল। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজার মন্দা ও নানা ধরনের আর্থিক সংকটের কারণে অনেক কৃষক সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারছিলেন না। ফলে ব্যাংকের পাওনা অনাদায়ী থাকার কারণে এসব কৃষক নতুন করে ঋণ পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছিলেন।

কৃষি ব্যাংক সূত্র বলছে, সরকারের নির্দেশনার আলোকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কৃষকের তথ্য যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে ঋণ মওকুফ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ঋণের দায় থেকে পুরোপুরি মুক্ত হলেন। এতে তাঁরা আবারও নিয়মিত ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসার সুযোগ পাবেন। ভবিষ্যতে নতুন করে ঋণ নিয়ে কৃষি উৎপাদনে যুক্ত হতে পারবেন।

সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে জনগণকে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিলো। তার মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ চালু, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার, প্রতিবছর ৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি। চার দলীয় জোট সরকার ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ মেয়াদে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদ-আসল মওকুফ করা হয়েছিল। এবার আবার ঋণ মওকুফ করা হলো। ফলে প্রান্তিক শ্রেণির কৃষকরা ঋণমুক্ত হবেন এবং নতুন করে ঋণ গ্রহণের সুযোগ পাবেন।

উল্লেখ্য, কৃষিখাতে এককভাবে কৃষকদের সর্বোচ্চ ঋণ দেয় কৃষি ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত কৃষিঋণসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) কৃষি ব্যাংকের কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ওই ১১ মাসে ব্যাংকটি বিতরণ করেছে ৯ হাজার ৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ২৮১ কোটি টাকা বেশি কৃষিঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকটি।

আমাদের দেশ মূলত কৃষি প্রধান দেশ। তাই দেশকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে কৃষক ও কৃষিখাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রান্তিক শ্রেণির কৃষকদের জন্য কৃষি ভর্তূকি সহ বিনাসুদে ঋণ প্রদান জরুরি। একই সাথে কৃষি সরঞ্জাম, সার ও কীট নাশকের দামও সহনীয় পর্যায়ে রাখা দরকার। সর্বোপরি কৃষি পণ্যের নায্য মূল্যও নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলেই দেশে কৃষি বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। বর্তমান সরকারের কাছে দেশের কৃষক সমাজ সময়োচিত পদক্ষেপ আশা করে।