জাফর আহমাদ

ভবিষ্যত নিয়ে কখনো দুশ্চিন্তা করবেন না। এটি আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিন। শারীরিক ও মানসিক জীবন সুন্দর ও সাবলীল হবে। আল কুরআনে “লা-তাখাফ” বলে নিষেধ করা হয়েছে অর্থাৎ দুশ্চিন্তা করো না। আরবী তাখাফ ‘‘খাউফুন” শব্দ থেকে নির্গত। খাউফ অর্থ ভয় করা, ভীত হওয়া। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আমি মূসার মাকে ইলহাম বা ইশারা করলাম “একে স্তন্যদান করো, তারপর যখন এর প্রাণের (খাউফ) ভয় করবে তখন একে দরিয়ায় ভাসিয়ে দেবে এবং (লা-তাখাফ) কোন ভয় ও দু:খ করবে না, তাকে তোমারই কাছে ফিরিয়ে আনবো এবং তাকে রাসুলদের অন্তর্ভুক্ত করবো।” (সুরা কাসাস : ৭) সুরা কাসাসের ৭-৪৩ আয়াত পর্যন্ত মুসা (আ:) এর জন্ম, নবুয়ত লাভ ও ফিরাউনের সাথে দ্বন্ধের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। এই আয়াতগুলোতে বা মুসা (আ:) এর কাহিনী বর্ণনা করা এই প্রবন্ধের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নয়। মূলত: এতে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা না করাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণটাই আল্লাহর হাতে। আপনি বেহুদাই চিন্তা-দুশ্চিন্তা করে নিজের ক্ষতি করতে পারবেন কিন্তু কোনই প্রতিকার করার সাধ্য আপনার নেই। একজন মু’মিনের কাজ হলো, নিজের ভবিষ্যতকে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে একনিষ্টভাবে আল্লাহর দীনের অনুসারী হওয়া।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “কাজেই তাদের এই ঘরের রবের ইবাদাত করা উচিত। যিনি তাদেরকে ক্ষুধা থেকে রেহাই দিয়েছেন এবং ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন।” (সুরা কুরাইশ : ৩-৪) এই সুরা নাযিল হওয়ার সময় বা তার আগে আরবের অবস্থা এমন ছিল যে, সারা দেশে এমন কোন জনপদ ছিল না যে, যেখানে লোকেরা রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতো। সব সময় তারা আশঙ্কা করতো এই বুঝি কোন লুটেরা দল রাতের অন্ধকারে হঠাৎ তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং তাদের সবকিছু লুট করে নিয়ে গেলো। নিজের গোত্রের সীমানার বাইরে পা রাখার সাহস কোন ব্যক্তির ছিল না। একাকী কোন ব্যক্তির জীবিত ফিরে আসা অথবা গ্রেফতার হয়ে গোলামে পরিণত হবার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া যেন অসম্ভব ব্যাপার ছিল। কোন কাফেলা নিশ্চিন্তে সফর করতে পারতো না। কারণ পথে বিভিন্ন স্থানে তাদের ওপর ছিল দস্যু দলের আক্রমণের ভয়। এই অবস্থা থেকে আল্লাহই উদ্ধার করেন।

শিশু মুসা (আ:)কে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়ার পর তার মায়ের মন অস্থির হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আল্লাহর ওপর সুদৃঢ় প্রত্যয়ের কারণে মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর সন্তানকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে দেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “এভাবে আমি মূসাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে আনলাম, যাতে তার চোখ শীতল হয়, সে দু:খ ভারাক্রান্ত না হয় এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য বলে জেনে নেয়। কিন্তু অধিকাংশ লোক একথা জানে না।” (সুরা কাসাস : ১৩) আল্লাহর ওয়াদা কখনো ব্যত্যয় ঘটে না। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যারা ঘোষণা করেছে, আল্লাহ আমাদের রব, অতঃপর তার ওপরে দৃঢ় থেকেছে নিশ্চিত তাদের কাছে ফেরেশতারা আসে এবং তাদের বলে, ভীত হয়ো না, দু:খ করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ শুনে খুশি হও তোমাদেরকে যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।” (সুরা হামীম আস সাজদা : ৩০)

যারা আল্লাহকে নিজের রব হিসাবে ঘোষণা করার পর সর্বাবস্থায় তার ওপর সুদৃঢ় থাকে, কখনো ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হয় না, তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক করে না, অন্য কোন আকীদা গ্রহণ করে না, কোন বাতিল আকীদার সংমিশ্রণ ঘটায় না। আল্লাহকে রব হিসাবে গ্রহণ করার পর তার ওপর রাজ্যের খড়গ নেমে এলেও, দু:খ-কষ্টে জর্জড়িত হলেও নিজের কর্মজীবনে তাওহীদের আকীদার দাবিসমূহ পূরণে চুল পরিমাণ পিছপা হয় না, তাদের মনোবলকে সুদৃঢ় করার জন্য আকাশ ফেরেশতাবৃন্দ নেমে আসে। ঈমানদারদের চর্মচক্ষু তাদের দেখে না বটে কিংবা তাদের আওয়াজ কানে শুনতে পায় না বটে, কিন্তু তারা ঈমানদারদের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে এবং তাদের মনে প্রশান্তি ও পরিতৃপ্তি ঢেলে দেয়। ফলে কোন দু:খ-কষ্টই তাদেরকে দুর্বল করতে পারে না। ন্যায় ও সত্যের দুশমনদের হাতে শত নির্যাতন ও নাজেহাল হতে থাকলেও তারা টলয়মান হয় না। বরং নির্যাতন যত বাড়তে থাকে, তাদের মনোবলও তত বাড়তে থাকে। দুরের ও কাছের ইতিহাস থেকে আমরা এর হাজারো উদাহরণ দেখতে পাই। যারা আল্লাহর হিদায়াতের অনুসারী হয় তাদেরকে কোন দু:খ- বেদনা, ভয় ও দুশ্চিন্তাই স্পর্শ করতে পারে না।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আমরা বললাম, “তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও। এরপর যখন আমার পক্ষ থেকে কোন হিদায়াত তোমাদের কাছে পৌঁছবে তখন যারা আমার সেই হিদায়াতের অনুসরণ করবে তাদের জন্য থাকবে না কোন ভয় দু:খ বেদনা ও দুশ্চিন্তা।” (সুরা বাকারা : ৩৮) আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যারা আমার আয়াতসমূহের ওপর ঈমান এনেছিল এবং আমার আদেশের অনুগত হয়েছিল, (সেইদিন তাদেরকে বলা হবে) হে আমার বান্দারা! আজ তোমাদের কোন ভয় নাই এবং কোন দু:খও আজ তোমাদের স্পর্শ করবে না।” (সুরা যখরুফ : ৬৮-৬৯) সত্যিকারার্থে যারা আল্লাহকে নিজের রব হিসাবে গ্রহণ করে, তাঁর আদেশের অনুগত হয়, আল্লাহর ওপর পূর্ণ মাত্রায় নির্ভরশীল হয় এবং তাদের ভবিষ্যত আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে, তাদের দুশ্চিন্তা করার কোনই কারণ থাকতে পারে না।

হযরত ইব্রাহিম (আ:) আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রেখে তাঁরই নির্দেশক্রমে অতিবৃদ্ধকালে প্রাপ্ত সন্তানকে স্ত্রী হাজেরাসহ তৃণলতাহীন মরুভুমিতে রেখে যান। তিনি জানতেন তাঁর প্রভু এঁদের বিনাশ করবেন না। তাঁর এ নির্ভরশীলতা প্রকাশ পেয়েছে মহান প্রতিপালকের কাছে করা তাঁর দো’আ থেকে। দো’আটিতে তিনি বলেছেন, “তুমি মানুষের অন্তরকে তাদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফল-মূল দিয়ে তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করে দাও। যাতে তারা তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।” পক্ষান্তরে অভিবাসিত মা হাজেরা তাঁর শিশুকে বুকে জড়িয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে এ অভিবাসনকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিয়েছিলেন। যখন তাদের পানি ও খাদ্য শেষ হয়ে গেল, তখন মা ও শিশু ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর হয়ে গেলেন। শিশু ইসমাঈলকে উপত্যকায় রেখে মা পানির জন্য সাফায় দৌঁড়ালেন, চারদিকে দৃষ্টি মেলে পানির সন্ধান পেলেন না। দৌঁড়ালেন মারওয়ায় সেখানেও পানির সন্ধান মেলেনি। এভাবে সাফা-মারওয়া ও মারওয়া-সাফা দু-পাহাড়ের মাঝে বেশ কয়েকবার দৌড়ানোর পর প্রিয় সন্তানের অবস্থা অবলোকন করার জন্য শিশুর কাছে এলেন। এসে দেখেন শিশুর পাদদেশে মাটি ফুুঁড়ে আল্লাহর রহমতের বারিধারা প্রবলবেগে উতলে উঠছে। মা হাজেরা পানির উৎসের চারদিকে বাঁধ দিলেন এবং মশক পুড়ে শিশুকে পান করান এবং নিজেও পান করেন। এভাবে আল্লাহ তা’আলা তাঁর ধৈর্য ও নির্ভরশীলতার ফলস্বরূপ তাঁর দুঃখ, চিন্তা, কষ্ট ও দূর্ভাবনা দুর করে দিলেন।

এখান থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে যে, ভবিষ্যত সúর্কে আমাদের জ্ঞান নেই, কিন্তু আল্লাহ তা’আলা পূর্ণজ্ঞান রাখেন। সুতরাং আপনার ভবিষ্যত সম্পূর্ণভাবে তাঁর হাতে ছেড়ে দিন এবং তাঁর ওপর পূর্ণ তায়াক্কুল করুন। আমাদের জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম (আ:) এবং মা হাজেরার উল্লেখিত ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে যে, একজন নি:সঙ্গ নারী জনমানবহীন এ মরভূমিতে কিভাবে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করেছিলেন, কিভাবে তিনি নিজেকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দিয়ে ছিলেন। কিভাবে তিনি শুস্ক ধূলি-ধুসর মরভূমি ও পাথরসমৃদ্ধ দুটো পাহাড়ে ছুটোছুটি করে আল্লাহর অনুগ্রহের তালাশ করেছিলেন। আমাদেরকেও আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হতে হবে এবং তাঁর ফযল ও করমের জন্য তাঁরই দরবারে ধরনা দিতে হবে। বলতে হবে আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা মা কাদাইতা লি মিন আমরি আন তাজআলা আকিবাতাহু রাশাদা।” অর্থাৎ হে আল্লাহ ! আমার কাজের কারণে যা নির্ধারণ করেছো তার শেষ পরিণতি তোমার কাছে ভালো চাই। “আউযুবিকা মিন শাররি মা ছানা’তু” অর্থাৎ হে রব! আমি যা করি তার মন্দ ফলাফল থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই।

লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।