- সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ঢাকায় আসছে ভারত সরকারের বিশেষ দূত
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কে সম্প্রতি নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়েছে। ক্ষমতাচ্যুত, পলাতক ও মৃত্যু দণ্ডপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীতে প্রকাশ্য গণমাধ্যমের সামনে ভার্চুয়ালি মতবিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়ার ঘটনায় দিল্লীর ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ঢাকা। যে সময়ে বাংলাদেশের জনগণ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক অর্জন উদযাপন করছে, ঠিক সেই সময়ে ভারতের মাটিতে বসে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করার সুযোগ দেওয়াকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং জুলাই গণাভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে দেখছে বাংলাদেশের সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দেশের জনগণ। তবে এই চরম কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও বরফ গলানোর লক্ষ্যেই হঠাৎ গতিশীল হয়ে উঠেছে ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গন। আজ সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারের কথা রয়েছে। একই সঙ্গে দিল্লী থেকে ভারত সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিশেষ বার্তা নিয়ে ঢাকায় আসছেন, যার মূল উদ্দেশ্য দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো। ঢাকা ও দিল্লীর মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্ক এবং সাম্প্রতিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের পক্ষ থেকে এই উচ্চপর্যায়ের পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য মতে, আজ সোমবার ১০ আগস্ট ভারতীয় হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাতের পাশাপাশি দিল্লী থেকে আসা বিশেষ দূতের মাধ্যমে ভারত সরকার বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের বার্তা পাঠাতে চায়। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লীর মাটিতে ফ্যাসিস্ট হাসিনার গণমাধ্যমে কথা বলা এবং বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত বিতর্কের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা প্রশমিত করাই এই বিশেষপত্রের মূল লক্ষ্য।
এদিকে গতকাল রবিবার ঢাকায় ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে শিশুদের জন্য খেলার জায়গা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একসঙ্গে আলোচনায় বসলে দুই দেশের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনবান্ধব ব্যক্তি। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও জনবান্ধব ব্যক্তি। দুই দেশের প্রধান একসঙ্গে হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমার পুরো আত্মবিশ্বাস আছে। মানুষ এক আছে, সমাধান হবেই। কোনো নেতিবাচক বিষয় নেই, সব ইতিবাচক আছে।’ বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের মানুষের এই সম্পর্ক সরকারি পর্যায়েও বজায় রাখতে হবে। তাঁর ভাষায়, সরকার আসবে-যাবে, কিন্তু দুই দেশের মানুষ থাকবে। তাই জনগণের মধ্যকার সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করার পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ের সম্পর্কও ভালো করা প্রয়োজন।
এছাড়াও নয়াদিল্লী চাইছে বাংলাদেশকে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্পর্কের একটি নতুন ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে। তবে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বড় ধরনের অভাবনীয় বা নাটকীয় পরিবর্তন না ঘটলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লী সফর করার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। প্রায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ব্রিকস সম্মেলনের ওই একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পূর্বনির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র সফরের সূচি রয়েছে, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে পশ্চিমের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নয়াদিল্লীতে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিতর্কিত উপস্থিতি এবং বক্তব্যের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি জরুরি কড়া বার্তা জারি করা হয়েছিল। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় ভারত সরকারের অবস্থান নিয়ে ক্ষোভ পুনর্ব্যক্ত করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্তায় বলা হয়, “পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লীতে গণমাধ্যমের সাথে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়া এবং সেখানে তিনি ও তাঁর দোসররা বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও তাঁর জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করায় বাংলাদেশ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর এই ঘটনার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ভারত সরকারকে পূর্বেই উদ্বেগ জানানো সত্ত্বেও এই প্রকাশ্য অনুষ্ঠানটি আয়োজনের অনুমতি দেওয়াতে ঢাকা দিল্লীর আচরণে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করছে।” পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে অত্যন্ত কড়া ভাষায় উল্লেখ করা হয় যে, চব্বিশের জুলাই-আগস্ট মাসে গণঅভ্যুত্থানকালে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুসহ শত শত নির্দোষ নাগরিককে হত্যার বিষয়টি আন্তর্জাতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত সত্য। ভারতের মাটিতে বসে এই গণহত্যার ইতিহাসকে অস্বীকার করার অপচেষ্টা মূলত একটি দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী চক্রকে সহায়তার শামিল। বার্তায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণ কোনো অবস্থাতেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি বরদাস্ত করবে না এবং দেশ আর কখনোই কারও অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।
প্রত্যর্পণ চুক্তি ও দিল্লীর দ্বিমুখী নীতির সংকট: কূটনৈতিক সূত্র গুলো বলছে, ঢাকা-দিল্লী সম্পর্কের মূল বিরোধের জায়গায় রয়েছে ২০১৩ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে বিচারিক প্রক্রিয়ায় পরোয়ানাভুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী হিসেবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ জানানো হলেও নয়াদিল্লীর কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাদের চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আসামীকে ফেরত দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে গিয়ে, উল্টো তাঁকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার মঞ্চ বানিয়ে দেওয়া বাংলাদেশের কোটি মানুষের অনুভূতিতে মারাত্মক আঘাত হেনেছে। এ ধরনের একপাক্ষিক আচরণ দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশ সবসময় সার্বভৌম সমতা, পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, কিন্তু ভারতের তরফ থেকে সমান দায়িত্বশীল আচরণের অভাব স্পষ্ট।
সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বহুমাত্রিক সম্পর্ক যেমন কেবল একটি একক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়, তেমনি বারবার শেখ হাসিনার বক্তব্য দানে সুযোগ দেওয়র মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কূটনৈতিক সম্পর্কের সার্বিক ভারসাম্য নষ্ট করে। জুলাই বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌম সুরক্ষার প্রশ্নে আপসহীন মনোভাব স্পষ্ট। তিনি আরও বলেন, এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কড়া বার্তা ও ক্ষোভের পর ভারত সরকার তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে কি না। ভারতের উচিত হবে আন্তর্জাতিক আইন, দুই দেশের বিদ্যমান চুক্তি এবং বাংলাদেশের জনগণের জাতীয় মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি দায়িত্বশীল প্রতিবেশীসুলভ ভূমিকা গ্রহণ করা। অন্যথায়, ঢাকা-দিল্লী সম্পর্কের চলমান এই শীতলতা ও উত্তেজনা দীর্ঘমেয়াদী রূপ নিতে পারে, যা কোনো দেশের জন্যই কল্যাণকর নয়।
এদিকে বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখালেও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এমপি বলেছেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের অনেক ইস্যু আছে। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক অনেক ইস্যু আছে। যেগুলো আলোচনার মাধ্যমে, সমাধান করতে হবে। আমরা অবশ্যই বসতে চাই, তবে সিদ্ধান্তটা ভারতকে এখন নিতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, সম্পর্ক উন্নয়নের যে ধারণা বা প্রচেষ্টাটা ছিল, এই ধরনের ঘটনা সেটার জন্য অনুকূল বা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে না। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার সেই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। অনুষ্ঠানের বক্তব্যকেও সমর্থন করে না তারা। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানকে ঘিরে ভারতের পক্ষ থেকে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ‘ভারত সরকার কোনো দায়-দায়িত্ব নিচ্ছে না বা তারা এর সঙ্গে যুক্ত নয় বা তারা এই মতের সঙ্গে একমত নয়, এই কথাগুলো সত্যিকার অর্থেই কোনো অর্থ বহন করে না।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রি: জে: মোহাম্মদ হাসান নাসির (অব:) বলেন, বাংলাদেশের একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা বাঞ্চনীয়। এরই অংশ হিসাবে চীন-যুক্তরাষ্ট্রসহ আঞ্চলিক বন্ধু প্রতিম শক্তির সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত অংশীদারত্ব বৃদ্ধি করা বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার। বিচারপ্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া কোনো পলাতক আসামীকে রাজনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে রাখা অবস্থায় বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের দিল্লী সফর করা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী হবে বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশ যেহেতু ব্রিকস এর সদস্য নয়, তাই বিশেষ অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণে অংশ নেওয়ার চেয়ে রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে গমনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ওয়াশিংটন ও অন্যান্য বৈশ্বিক সহযোগীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক জোরদার করার মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল একটি একক আঞ্চলিক পরাশক্তির ওপর নির্ভরতার দিন যে শেষ হয়েছে, সেই বার্তাই স্পষ্ট করবে।