স্টাফ রিপোর্টার : টিসিবির ডিলার হিসেবে কাজ করছেন অন্তত ৮ হাজার ২৭২ জন। কিন্তু তাদের পুরাতন লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। অপরদিকে নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। তাই আশঙ্কা রয়েছে, লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ না পেয়ে বাদ পড়তে পারেন পুরাতন ডিলাররা।
এ কারণে গতকাল রবিবার সকাল ৯টা থেকে রাজধানীর কাওরান বাজারে লাইসেন্স নবায়নের দাবিতে টিসিবি ভবন অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন ডিলাররা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। সারা দেশ থেকে আসা ডিলাররা ‘টিসিবি ডিলার বাঁচাও আন্দোলন’-এর ব্যানারে এই কর্মসূচি পালন করছেন এবং তাদের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ডিলার অমিত হাসান হৃদয় বলেছেন, ‘সরকার চাইলে আরও নতুন ডিলার নিতে পারে। তবে পুরাতন যারা আছে তাদের অযৌক্তিকভাবে বাদ দিতে পারে না। ২০২৫ সালে অযৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়ণ করেছে সরকার। সেই নীতিমালা অনুযায়ী ২০২৬ সালে আগে যারা ডিলার ছিল সবাইকে বাদ দিয়েছে। আমাদের লাইসেন্স নবায়ন করতে দেওয়া হচ্ছে না।’
‘আমাদের কে এস বি ভেরিফিকেশন করছে। অনেক মানুষ টিসিবির সঙ্গে জড়িত। আমাদের অধীনস্ত অনেক কর্মচারী আছে। ডিলারশিপ যদি নবায়ন না করা হয় তবে আমরা তো পথে বসবই, বিপদে পড়বে আমাদের কর্মীরাও। আমরা এই ৮ হাজার ২৭২ জন পুরাতন ডিলারদের লাইসেন্স নবায়নের এর দাবিতে টিসিবি ভবন ঘেরাও করেছি,’ বলছিলেন অমিত হাসান।
নতুনদের এই নিয়োগ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘নতুনদের আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু পুরাতনদের অযৌক্তিকভাবে বাদ দেওয়া উচিত হবে না। যদি কেউ অনিয়ম করে থাকে তাদের বাদ দিক।’ তার পাশে বসে থাকা আরেক আন্দোলনকারীকে দেখিয়ে বললেন, ‘তিনিও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একজন ডিলার। নাম সোনিয়া জামান। তিনি ক্যানসারের লাস্ট স্টেজের রোগী। শুরু থেকেই আন্দোলনে মোক্ষম ভূমিকা পালন করছেন। লাইসেন্স নবায়নের দাবিতে প্রায় ৬৩ ঘণ্টা যাবত অনশন করছেন তিনি।’
প্রকৃত মুদি ব্যবসায়ী ছাড়া টিসিবির ডিলার হওয়া যাবে না :
নি¤œআয়ের পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ডিলার নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৫ জারি করেছে সরকার। গত বছর এপ্রিলে জারি করা এই নীতিমালায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, নতুন সংশোধিত নীতিমালায় ডিলারদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে, কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে ডিলারশিপ নবায়নের সময়সীমা ও নিয়মে।
জানা গেছে, সারা দেশে এক কোটি ফ্যামিলি কার্ডধারী নি¤œআয়ের পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ, সহজ ও জবাবদিহিমূলক করতে চায় সরকার। এ কারণে ডিলার নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় সংশোধন করা হয়েছে। এখন থেকে প্রকৃত মুদি ব্যবসায়ীদের বাইরে কেউ ডিলারশিপের আবেদন করতে পারবেন না। এর জন্য হালনাগাদ মুদি ব্যবসায়ীর ট্রেড লাইসেন্সের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। পরিষ্কার করা হয়েছে কোনো ধরনের চাকরিজীবীর আবেদনের অযোগ্যতার বিষয়টি।
এছাড়া তদারকি জোরদারে প্রশাসনের তদন্তকালে ডিলারদের দোকানে সশরীরে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করাসহ যুক্ত হয়েছে একাধিক নতুন শর্ত। আবার পণ্য সরবরাহ সচল রাখতে একই এলাকায় বিকল্প ডিলার নিয়োগের সুযোগও থাকছে নতুন নীতিমালায়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, এর আগে অনুমোদিত মূল নীতিমালায় কিছু ব্যবহারিক জটিলতা ও তদারকি দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ায় দ্রুত এই সংশোধিত নীতিমালা জারি করা হয়েছে।
এদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশে (টিসিবি) কালোবাজারি ও অনিয়ম রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। সুনির্দিষ্ট ২০ কারণে ডিলারশিপ বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্তের বিধান রেখে ‘টিসিবির ডিলার নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা (সংশোধিত), ২০২৫’ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর ফলে যদি কোনো ডিলার অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত কেন্দ্র পরিবর্তন করে অন্য কোথাও পণ্য বিক্রি করে বা অবৈধ মজুদ করে, তবে তার লাইসেন্স বাতিল হবে।
বাজারের স্থিথিশীলতা বজায় রাখতে এবং নি¤œ আয়ের এক কোটি কার্ডধারী পরিবারের কাছে ভর্তুকি মূলে সয়াবিন তেল, মশুর ডাল, চিনি, ছোলা, পেঁয়াজ, খেঁজুর, রাইস ব্রান তেলসহ বিভিন্ন পণ্য সরকারী নির্দেশনায় বিক্রি করে টিসিবি। তবে দীর্ঘদিন ধরেই ডিলারদের বিরুদ্ধে কালোবাজারি, ভুয়া ফ্যামিলি কার্ড তৈরি করে স্বজনপ্রীতি, ওজনে কম দেওয়া, ডিলারশিপ নিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ছিল। গুরুতর এসব অনিয়ম রোধেই সংশোধিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী যেসব কারণে বাতিল হতে পারে লাইসেন্স
কালোবাজারে পণ্য বিক্রি ও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্য রাখলে বাতিল হতে পারে লাইসেন্স এবং বাজেয়াপ্ত হবে জামানত। এছাড়া ওজনে কম দেওয়া বা কার্ডধারীর পরিবর্তে অন্যের কাছে পণ্য বিক্রি ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে দাখিল করা কোনো কাগজপত্র নকল প্রমাণিত হলেও ডিলারশিপ বাতিল হবে। এছাড়া ডিলারশিপ নবায়নে এক মাসের বেশি বিলম্ব করলে বা ডিলার কোনো ফৌজদারি মামলায় দ-িত হলেও লাইসেন্স বাতিল বলে গণ্য হবে।
নীতিমালায় সিন্ডিকেট রোধেও কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ডিলাররা নিজেদের মধ্যে কোনো ধরনের সমিতি বা অ্যাসোসিয়েশন গঠন করতে পারবেন না। এছাড়া একই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে বা একজন ব্যক্তির নামে একাধিক ডিলারশিপ থাকলে তা বাতিল করা হবে। টিসিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারের সদস্যরাও ডিলার হতে পারবেন না।
এতে আরও বলা হয়েছে, পরপর দুইবার পণ্য উত্তোলনে ব্যর্থ হলে, প্রাথমিক যোগ্যতার শর্ত ভঙ্গ করলে, লিখিত আদেশ অমান্য করলে বা আগে ডিলারশিপ বাতিল হয়ে থাকলে আর লাইসেন্স দেওয়া হবে না। এছাড়া জেলা প্রশাসকের তদন্ত প্রতিবেদন না পেলে এবং প্রমাণিত অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসক সুপারিশ করলে ডিলারশিপ বাতিল করা হবে। অন্যদিকে অস্থায়ী ডিলাররা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করলেও লাইসেন্স হারাতে হবে।
নতুন এই নীতিমালা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন হয়েছে। এই নীতিমালা যথাযথ বাস্তবায়ন করলে ডিলার-সংক্রান্ত বিশৃঙ্খলা ও ভোগান্তি দূর হবে। এর ফলে নি¤œ আয়ের মানুষেরা উপকৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যেসব কারণে লাইসেন্স বাতিল হতে পারে
কালোবাজারে পণ্য বিক্রি করা,নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্য নেওয়া, ওজনে কম দেওয়া, কার্ডধারীর পরিবর্তে অন্যের কাছে পণ্য বিক্রি করা, ডিলার নিয়োগের সময় নকল কাগজপত্র জমা দেওয়া,’লাইসেন্স নবায়নে এক মাসের বেশি দেরি করা, ফৌজদারি মামলায় ডিলারের সাজা হওয়া