• জনবল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্ময় ফারুকীর

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গতকাল শুক্রবার জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের সামনে প্রচন্ড ভিড় ছিল। সকাল থেকেই পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে অনেকেই জাদুঘর পরিদর্শনে এসেছেন। তবে সময় পরিবর্তন করায় বিড়ম্বনায় পড়তে হয় অনেককে। দুপুরে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের প্রধান ফটক ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি, শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী এবং গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন ঘুরে দেখতে রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ আসেন। তবে অতিরিক্ত দর্শনার্থীর চাপে ব্যবস্থাপনায় কিছুটা বিশৃঙ্খলাও দেখা যায়।

সরেজমিনে বেলা আড়াইটার দিকে জাদুঘরের মূল প্রবেশ ফটকে দেখা যায়, টিকিটের জন্য শত শত মানুষ দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করছেন। প্রচণ্ড গরমে নারী, শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে দুর্ভোগে পড়েন অনেকে। অপেক্ষমাণ কয়েকজন অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও টিকিট মিলছিল না। একপর্যায়ে উত্তেজিত কয়েকজন জোর করে টিকিট কাউন্টারের ভেতরে ঢুকে পড়েন। পরে দায়িত্বরত নিরাপত্তারক্ষীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। রাজধানীর পল্লবী থেকে পরিবার নিয়ে আসা আজাদুল ইসলাম বলেন, বাচ্চা নিয়ে আধা ঘণ্টার বেশি রোদে দাঁড়িয়ে আছি। টিকিট পাইনি এখনো। মূল প্রবেশ গেটে টিকিট না পেয়ে অনেকে বের হওয়ার গেট দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করেন, এতে সেখানেও ভিড় জমে যায়। জাদুঘরের কর্মীরা তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। এ সময় নিরাপত্তারক্ষীদের উদ্দেশ করে এক দর্শনার্থী বলেন, ছুটির দিনে একটু সুযোগ তো দিতে হয়। এতগুলো মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, তারা কি কিছুই দেখবে না? বেলা তিনটার পরপরই টিকিট বিক্রি শুরু হয় এবং দর্শনার্থীরা ভেতরে ঢুকতে শুরু করেন। জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আলোকচিত্র, শহীদদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, নথিপত্র, ভিডিও চিত্র এবং ঘটনার ধারাবিবরণী প্রদর্শন করা হচ্ছে।

দর্শনার্থীদের কেউ কেউ জানান, প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে জাদুঘর খোলা থাকে, এমন ধারণা নিয়ে তারা সেখানে এসেছিলেন। তবে ছুটির দিনের কারণে সময়সূচি পরিবর্তন করে বিকেল ৩টা থেকে জাদুঘর খোলা হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানায়। হঠাৎ সময়সূচির এই পরিবর্তনের বিষয়টি আগে থেকে না জানায় অনেক দর্শনার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে ফিরে যেতে বাধ্য হন, আবার অনেকে বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় এদিন আগেই জুলাই জাদুঘরের সামনে ভিড় করেন অসংখ্য দর্শনার্থী। কেউ কেউ এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেউবা আবার ঘুরতে আশা শিশুদের নিয়ে জাদুঘর খোলার অপেক্ষায় বসে আছেন। তবে অধিকাংশ দর্শনার্থীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে ফিরে যেতে দেখা গেছে। এছাড়াও জাদুঘরের দেয়ালে ছুটির দিনে জাদুঘর খোলার এবং বন্ধের সময়সূচি পরিবর্তন করে প্রিন্টেড কাগজ লাগিয়ে দিতে দেখা গেছে। কর্তৃপক্ষের দেওয়া সময়সূচিতে বলা হয়েছ, এদিন বিকাল ৩টা থেকে ৬টা ৩০ পর্যন্ত খোলা থাকবে। এর মধ্যে দর্শনার্থীরা সবশেষ ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত জাদুঘরে প্রবেশ করতে পারবেন বলে জানানো হয়। জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সময়সূচি পরিবর্তনের এমন সিদ্ধান্ত ক্ষোভ জানান উপস্থিত দর্শনার্থীরা।

রাজধানীর খিলক্ষেত থেকে এক ছেলেকে নিয়ে জাদুঘরে ঘুরতে এসেছেন আরিফুর ইসলাম। তিনি বলেন, ছুটির দিনে সাধারণত মানুষ নামাজের পর ঘুরতে বের হয়। বিকালের দিকে ঘুরতে আসলে সাধারণত ভিড় থাকে। বাচ্চাদের সেভাবে দেখার সুযোগ হয় না। যার কারণে সকাল সকাল ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি জাদুঘর বন্ধ রয়েছে। ৩ টার সময় খুলবে। এত সময় অপেক্ষা করবো কীভাবে। তাই ছেলেকে নিয়ে ফিরে যাচ্ছি। অন্য কোনদিন আসতে হবে। সাভার থেকে এক ছেলে জিহাদ ও এক মেয়ে রোমানাকে নিয়ে ঘুরতে এসেছেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ছেলে-মেয়েকে নিয়ে সাভার থেকে আসছি জাদুঘর দেখতে। কিন্তু আসার পর দেখছি বন্ধ। বলছে নাকি ৩টার সময় খুলবে। অনেকদূর থেকে এসেছি। ফিরে গিয়ে আবার আসার সুযোগ নেই। তাই এখন বসে থাকবো। জাদুঘর খুললে দেখে তারপর ফিরবো।

রিয়াজ নামের আরেক দর্শনার্থী বলেন, জুলাই আন্দোলনে আমি ঢাকার বাইরে থেকে আন্দোলনের অংশগ্রহণ করেছিলাম। রাস্তায় ছিলাম। তখন ঢাকায় আসা হয়নি। তাই এখন দেখতে এসেছি। কিন্তু এসে দেখছি বন্ধ। তিনি বলেন, আমরা দূরদূরান্ত থেকে এসেছি। এখানে এমন কোন লোক নেই যে বলবে কখন খুলবে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষের এমন একটা লোকও এখানে নেই যে ঘুরতে আসা মানুষকে সব তথ্য দেবে। রাজশাহী থেকে ঘুরতে ঢাকায় এসেছেন আইনাল হক। শুধু জাদুঘর দেখতে এসেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আবেগের জায়গা থেকেই দেখতে এসেছিলাম। অনেক দূর থেকে জার্নি করে এসেছি। এসে দেখলাম জাদুঘর বন্ধ, শুক্রবার তাই বিকাল তিনটার সময় খুলবে। এটা আমাদের জন্য অনেক কষ্টকর। না দেখেই আবার আমাদের জার্নি করে ফিরে যেতে হবে।

জাদুঘরের জনবল ও নিরাপত্তা নিয়ে বিস্ময় ফারুকীর

এদিকে, জাদুঘরের জনবল ও নিরাপত্তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি গতকাল বিকেলে এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, কোনো রকম স্টাফ না দিয়ে, সিকিউরিটি প্রটোকল রিহার্সাল না করে এই ভাবে মিউজিয়ামটা কোন বিবেচনায় খোলা হইলো এটা আমার কাছে বিস্ময়কর লাগছে। জুলাই নিয়ে মানুষের আগ্রহ আমাদের অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু এই যাদুঘরে শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন আছে, অনেক ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্ট আছে। এভাবে যদি মিউজিয়াম একসেস দেয়া হয় তাহলে বহু জিনিস নষ্ট হয়ে যাবে। এবং এমন অনেক জিনিস আছে যেটা একবার নষ্ট হলে আর পাওয়া যাবে না। আর যে ভিজিটর এই ভাবে দেখতে বাধ্য হন, উনি মিউজিয়ামের সঠিক অভিজ্ঞতা কিভাবে পাবেন? দর্শকদের জন্যও তো এটা একটা শাস্তি। এই বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এই পাঁচ মাস কি পর্যাপ্ত ছিলো না মিউজিয়ামের অপারেশনাল দিক ঠিক করার? ইটস রিয়ালি হার্টব্রেকিং। প্লিজ আপনারা জরুরি উদ্যোগ নিয়ে মিউজিয়ামটা প্রপারলি অপারেশনাল করেন। এই যাদুঘর কেপিআই ওয়ানভুক্ত ইনস্টলেশন। এরকম সেনসিটিভ ইনস্টলেশন এইরকম এতিম দশায় ওপেন করা হইলো কেনো? সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর সত্যিকারের উদ্যোগী হইলে এতোদিনে প্রপার ভাবেই ওপেন করা যাইতো। দরকার হইলে সাময়িক বন্ধ রাখেন। তারপর প্রপার স্টাফিং, সিকিউরিটি প্রটোকল রিহার্সাল করে চালু করেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জনসাধারণের জন্য জাদুঘর উন্মুক্তের প্রথম দিন দায়িত্বরতরা জানান, জাদুঘরটির সাপ্তাহিক ছুটির দিন নির্ধারণ করা হয়েছ বৃহস্পতিবার। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা। আবার বেলা ১টা থেকে ৩টা এবং শেষ ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারবেন। জাদুঘরটিতে প্রবেশে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০টাকা। আর শিশুদের জন্য ২০ টাকা। জুলাই ৩৬ স্মৃতি জাদুঘরের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট সংগ্রহ করা যাবে। একই সঙ্গে জাদুঘরে গিয়ে সরাসরি টিকিট সংগ্রহ করা যাবে।