হারুন ইবনে শাহাদাত
দুনিয়া ও আখেরাতের জীবন সাজাতে ইসলামের শাশ্বত ভারসাম্যপূর্ণ সৌন্দযর্ময় বিধান অনুসরণের বিকল্প নেই। ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই অশান্তি আর হানাহানিতে ভরা দুনিয়ায় আসবে জান্নাতি সুখ। জাহান্নামের অন্ধকার পথের দুষ্ট শয়তান পরাজিত হবে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন আল্লাহর অনুগত বান্দাদের ত্যাগের নাজরানা। সেই ত্যাগ কতটা হতে পারে তার অনুপম উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন আমাদের জাতির পিতা হজরত ইবরাহীম আ.। উল্লেখ্য, ইহুদি এবং খ্রিস্টানরাও হযরত ইবরাহীম (আ.)-কে (ইংরেজি ও হিব্রুতে আব্রাহাম) তাদের জাতির পিতা ও আদিপুরুষ হিসেবে শ্রদ্ধা করে। পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,‘ আমি প্রতিটি উম্মতের (জাতির) জন্য (কুরবানীর) নিয়ম করে দিয়েছি। তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যে রিযক্ দেয়া হয়েছে সেগুলোর উপর তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে, (এই বিভিন্ন নিয়ম-পদ্ধতির মূল লক্ষ্য কিন্তু এক- আল্লাহর নির্দেশ পালন), কারণ তোমাদের তিনিই একমাত্র উপাস্য, কাজেই তাঁর কাছেই আত্মসমর্পণ কর। আর সুসংবাদ দাও সেই বিনীতদেরকে -‘আল্লাহ’ নামের উল্লেখ হলেই যাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে, যারা তাদের বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করে, নামায কায়েম করে, আর তাদেরকে আমি যে রিযক্ দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।’ সূরা হজ-৩৪-৩৫।
মানব জাতির আদি পিতা হজরত আদম আ, থেকে নিয়ে প্রত্যেক নবী ও রাসূলের উম্মতরাই বিধান পালন করেছেন। তবে আমরা হজরত মুহাম্মদ সা. এর উম্মতরা কুরবানীর বিধান পালন করি মহান আল্লাহর নিদের্শে হজরত ইবরাহীম আ, এর ত্যাগের উদাহরণকে স্মরণ করে।
হজরত ইবরাহীম (আ.)-এর বৃদ্ধ বয়সের জন্ম নেয়া একমাত্র পুত্র ইসমঈল আ-কে আল্লাহর রাহে কুরবানী করতে বিনা বাক্য ব্যয়ে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এটি সত্যপন্থী মানব জাতির এমন এক উপমা যে,পৃথিবী থেকে শয়তানী মতবাদ দূর করতে যদি প্রয়োজন হয় আল্লাহ রাহে তার মোকাবিলায় প্রাণাধিক প্রিয় একমাত্র পুত্রের জীবনের মায়া করা যাবে না। তাঁর বিধান প্রতিষ্ঠার জিহাদে জীবন-সম্পদ সব আল্লাহর জন্য, তার প্রয়োজনে তা ব্যয় করতে প্রস্তত থাকতে হবে। প্রয়োজনে রক্ত ঝরাতে হবে। রক্তপাত দেখে ভয় পেলে চলবে না। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, বল, ‘নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী,আমার জীবন ও আমার মরণ, বিশ্ব-জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। সূরা আল আন আম-১৬২।
অর্থাৎ দুনিয়া থেকে শয়তানের রাজত্ব দূর করে মানবতার মুক্তির জন্য আন্দোলন,সংগ্রাম ও জিহাদে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির তালাশ করতে হবে। প্রয়োজনে প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে যোদ্ধার সাজে সাজিয়ে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠাতে হবে। সত্য ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করে মহান আল্লাহর দেয়া, খেলাফতের দায়িত্ব পালন করতে হবে। ওয়া ইজ-ক্বা-আলা রাব্বুকা লিল মালা-ই কাতি ইন্নি-জ্বা-ইলুন ফিল আরদ্বি খালীফাহ যার বাংলা অর্থ যখন মহান আল্লাহতায়ালা ফেরেস্তাদের বললেন,নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা বানাতে চাই। ( সূরা বাকারা:৩০)। খলিফা অর্থ প্রতিনিধি। আল্লাহর প্রথম প্রতিনিধি হচ্ছেন, হযরত আদম (আ.)। দুনিয়ায় নেতৃত্ব দেয়ার জন্য, আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করে ন্যায় ও ইনসাফের শাসন কায়েম করে মানব জাতিকে জালিমের দুঃশাসন থেকে মুক্তির দায়িত্ব পালনকারী বান্দারা আল্লাহর দেয়া প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনকারী। আদি পিতা হজরত আদম আ. এর ধারাবাহিকতায় মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহীম আ.-কে আল্লাহর এ দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি সেই সময়ের আল্লাহদ্রোহী শাসক নমরুদকে তার রাজত্বে আল্লাহর দেয়া বিধান অনুসরণ করে পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাদশা নমরুদ আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে নয়, নিজের তৈরি করা আইনে রাজত্ব পরিচালনা করে। কল্পিত দেব-দেবির পূজা অর্চনা করতো এবং তার রাজ্যর সবাইকে তার বিধান মানতে বাধ্য করতো। হজরত ইবরাহীম আ.এর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে তাকে হত্যা করতে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিলো। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সেখান থেকে রক্ষা করেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার বিখ্যাত বিদ্রোহী কবিতায় এ উপমা তুলে ধরে লিখেছন,‘আমি জাহান্নামের আগুনি বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি।’ অর্থাৎ আমি সেই পিতার সন্তান যিনি জালিম বাদশা নমরুদের দুঃশাসনের প্রতিবাদ করে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। সেখান থেকে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে রক্ষা করেছেন। নমরুদের আগুনের কুণ্ডকে তিনি ফুলের বাগানে পরিণত করেছিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ উপমায় স্বৈরাচারী শাসকদের এই বার্তাই দিয়েছেন যে, কোন জালেমকে আমরা ভয় করি না। মানবতার মুক্তির সংগ্রাম থেকে কেউ আমাদের বিচ্যূত করতে পারবে না।
অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হয়েও হজরত ইবরাহীম আ.-আল্লাহর দেয়া পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মহান রাব্বুল আলামীন তাঁকে খলিল বা বন্ধু বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন, তার বংশধরদের যেন যুগে যুগে আল্লাহ মানব জাতির নেতৃত্ব দান করেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়,‘রাব্বানা-হাবলানা মিন আজওয়া-জিনা ওয়া যুররিয়্যা-তিনা কুররাতা আ’য়ুনিওঁ ওয়াঝ-আলনা লিল-মুত্তাক্বিনা ইমামা । অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের আমাদের জন্য চোখের শীতলকারী করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানান।’ সূরা ফুরকান: ৭৪। ‘আমাদের’ মানে ইবরাহীম আ. এর সন্তান হিসেবে আমরাও আছি।
ঈদুল আজহা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমাদেরও আত্মত্যাগের পরীক্ষার দিন। ঈদুল আজহার ঈদ উৎসবের সাথে জড়িয়ে আছে জড়িয়ে এক কিশোরের আত্মত্যাগের মহান স্মৃতি। সেই মহান আত্মত্যাগী কিশোরের নাম হযরত ইসমাইল আ.। তিনি হলেন মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম আ. এর পুত্র । যাঁর সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন,‘এই কিতাবে ইসমাঈলকেও স্মরণ কর। তিনি ছিলেন ওয়াদায় সত্যতাবিধানকারী। এবং তিনি ছিলেন রাসূল ও নবী’। ‘তিনি তাঁর পরিবারবর্গকে সালাত ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিতেন এবং তিনি স্বীয় পালনকর্তার নিকট পসন্দনীয় ব্যক্তি ছিলেন’ (সুরা: মারিয়াম ৫৪-৫৫)।
আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইবরাহীম আ. তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাঈল আলাইহি সাল্লামকে কোরবাণী করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, পুত্র ইমাঈল আ. দ্বীধা ও ভয়হীন চিত্তে খুশী মনে আল্লাহর ইচ্ছা ও পিতার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ধারালো ছুড়ির নীচে গলা পেতে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মত্যাগের এমন মহিমা সত্যি তুলনাহীন। পিতা-পুত্র দু’জনই ছিলেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা এবং নবী।
ইবরাহীম আ.-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাঈল আ. ছিলেন মা হাজেরার গর্ভের একমাত্র সন্তান। তাঁর জন্মের সময় হযরত ইবরাহীম আ.-এর বয়স ছিল ৮৬ বছর। ইসমাঈল আ- যখন শিশু সেই সময় তাঁকে ও তাঁর মা হাজেরাকে পিতা ইবরাহীম আ. আল্লাহর নির্দেশে মক্কার রেখে আসেন। সেই সময় মক্কা ছিলো জন-মানবহীন মরু প্রান্তর। ইবরাহীম আ.- এর দোয়া করেন, দোয়ার বরকতে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে যমযম কূপের সৃষ্টি হয়। অতঃপর ইয়ামনের ব্যবসায়ী কাফেলা বনু জুরহুম গোত্রের লোকেরা মা হাজেরার সম্মতিক্রমে সেখানে চাষ-আবাদ শুরু করে।
হযরত ইসমাঈল আঃ এর বয়স যখন মাত্র ১৪ বছর। তিনি তখন দুরন্ত এক কিশোর। কিন্তু তাঁর সমস্ত দুরন্তপনা বাধা পড়েছিলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আনুগত্য আর মহান পিতা নবী ও রাসুল হযরত ইবরাহীম আ. এর প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালবাসার বন্ধনে। আল্লাহর নেয়া পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন পিতা-পুত্র দু’জনই। আল্লাহর আদেশে মক্কার অনতিদূরে মিনা প্রান্তর আজও পিতা-পুত্রের ত্যাগ ও কুরবানীর ঘটনার সাক্ষী আছে। সেই ত্যাগের স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে আল্লাহ-তায়ালা ঈদুল আজহার দিন সামর্থবান মুসলমানদের জন্য গৃহপালিত পশু কুরবানী ওয়াজেব করেছেন। এই মিনার ময়দানে শতবর্ষ বয়সী পিতা ইবরাহীম আ. আল্লাহর আদেশে প্রিয় পুত্র ইসমাঈল আ.কে নিজের হাতে কুরবানীর সকল আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন। আল্লাহতায়ালা হযরত ইবরাহীম আ.কে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কুরবানীর আদেশ করেন। আল্লাহর আদেশের কথা শোনার পর চৌদ্দ বছরের তরুণ ইসমাঈল আ. ঈমান ও আত্মত্যাগের যে একমাত্র নমুনা উপস্থাপন করেছেন, তার তুলনা তিনি নিজেই। তিনি স্বেচ্ছায় নিজেকে সমর্পণ না করলে পিতার পক্ষে পুত্র কুরবানীর ঘটনা সম্ভব হত কি-না সন্দেহের অবকাশ আছে। হযরত ইসমাঈল আ. তখনও নবীয়াত লাভ করেননি। তিনি আল্লাহর প্রিয় নবী ও রাসুল খলিলুল্লাহ (আল্লাহর বন্ধু) হযরত ইবরাহীম আ. এর প্রিয় পুত্র। নবী না হলেও নবীপুত্র ইসমাঈলের আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ও দৃঢ় ঈমানের পরিচয় দিয়েছেন। আল্লাতায়ালা পবিত্র কুরআনে তাঁর সেই দৃঢ়তার কথা বর্ণনা করেছেন এভাবে সেই ছেলেটি যখন তার সাথে দৌড়াদৌড়ি করার বয়সে পৌছি, তখন (একদিন) ইবরাহীম তাকে বলল,‘ পুত্র আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি। এখন তুমি বল,‘ তোমার মত কি?’ সে বল.‘ যা কিছু আপনাকে হুকুম দেয়া হচ্ছে, তা আপনি করুন! আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ শেষে যখন এই দুইজনই আনুগত্যে মাথা নোয়াইয়া দিল এবং ইবরাহীম পুত্রকে ললাটের অভিমুখে শয়ন করিয়ে দিলো এবং আমরা আওয়াজ দিয়ে বললাম,‘ হে ইবরাহীম তুমি তো স্বপ্নকে প্রমাণ করে দেখালে! আমরা সৎ লোকদেরকে এই রূপ প্রতিফলই দান করে থাকি। নিঃসন্দেহে ইহা একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষার ব্যাপার ছিলো। আমার এক মহান কুরবানীর বদলে সেই ছেলেটিকে ছাড়িয়ে নিলাম। আর তার প্রশংসা ও গুণ পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে প্রচলিত রাখলাম। সালাম ইবরাহীমের প্রতি।’ সুরা:(ছাফফাত: ১০২-১০৯)। হযরত ইবরাহীম আ. এর সামনে হযরত ইসমাঈল আ. এর বদলে একটি দুম্বাকে কুরবানীর জন্য আল্লাহতায়ালা পেশ করেন। হযরত ইসমাঈলকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী করতে উদ্যোগী হওয়ায় আল্লাহতায়ালা তাঁকে আরেক পুত্র ইসহাক আঃকে দান করার সুসংবাদ দান করেন। আল্লাহ বলেন,‘ আর আমরা তাকে ইসহাক সম্পর্কেও সুসংবাদ দিলাম। (সুরা ছাফফাত:১১২)। ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা তাঁর নিয়ামতকে আরো বাড়িয়ে দেন ইসহাক আ. এর আগমনের সুসংবাদ দিয়ে আল্লাহতায়ালা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছেন।
অতঃপর কা‘বা নির্মাণকালে পিতা-পুত্রের দোয়ার (বাক্বারাহ ১২৭-২৯) বরকতে প্রথমতঃ কা‘বা গৃহে যেমন হাযার হাযার বছর ধরে চলছে তাওয়াফ ও ছালাত এবং হজ্জ ও ওমরাহর ইবাদত, তেমনি চলছে ঈমানদার মানুষের ঢল। দ্বিতীয়তঃ সেখানে সারা পৃথিবী থেকে সর্বদা আমদানি হচ্ছে ফল-ফলাদির বিপুল সম্ভার। তাঁদের দোয়ার তৃতীয় অংশ মক্কার জনপদে নবী প্রেরণের বিষয়টি বাস্তবায়িত হয় তাঁদের ইন্তিকালের কয়েক আড়াই হাজার বছর পরে ইসমাঈলের বংশে শেষনবী মুহাম্মাদ সা.-এর আবির্ভাবের মাধ্যমে।
ইসমাঈল আ. মক্কায় আবাদকারী ইয়ামনের বনু জুরহুম গোত্রে বিবাহ করেন। তাদেরই একটি শাখা গোত্র কুরায়েশ বংশ কা‘বা গৃহ তত্ত্বাবধানের মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত হয়। এই মহান বংশেই শেষ নবীর আগমন ঘটে। উল্লেখ্য যে, হযরত ইসমাঈল আ. সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ৯টি সূরায় ২৫টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
ইসমাঈল সম্পর্কে শেষ নবী ও রাসুল হযরত মোহাম্মদ সা. বলেন, ‘সর্বপ্রথম ‘স্পষ্ট আরবি’ ভাষা ব্যক্ত করেন ইসমাঈল। যখন তিনি ছিলেন মাত্র ১৪ বছর বয়সের তরুণ’। এখানে ‘স্পষ্ট আরবি’ অর্থ ‘বিশুদ্ধ আরবি ভাষা’ এটাই ছিল কুরায়শী ভাষা, যে ভাষায় পরে কুরআন নাযিল হয়।
হযরত ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ. এর ত্যাগ ও কুরবানীর মহান শিক্ষার আলোকে যদি আমরা ঈদ আজহা উদযাপন করি, তাহলে সবার আগে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কে কত বড় কুরবানী কিনলাম? কয়টা ফ্রিজ ভরতে পারলাম তারমধ্যে কুরবানীর আনন্দ ও খুশী বা আল্লাহর সন্তুষ্টি কোন কিছু নিহিত নেই। আল্লাহতায়ালা চান ঈদের এই দিনে তার বান্দারা সবাই মিলে খুশীতে সামিল হবে। সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর দেয়া পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে। পথের ধারে বসে কোন এতিম অসহায় শিশু ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাঁদবে না। প্রতিটি মানুষ তার ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে। হযরত ইবরাহীম আঃ এর মতো প্রিয় পুত্রকে কুরবানীর মতো বড় কোন পরীক্ষা আমাদের ঈদুল আজহার দিন দিতে হয় না। আল্লাহর আমাদের প্রতি রহম করেছেন।
আামদের জন্য আত্মঅংহকার, গর্ব, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ভেঙে উচু নীচুর পার্থক্য ভুলে শোষণমুক্ত ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ গড়ার শপথ নেয়ার দিন- ঈদুল আজহা।
গৃহপালিত পশু কুরবানীর সাথে সাথে মানবিকবোধ জাগাতে হবে, আত্মার পশুত্ব বর্জন বা কুরবানী করতে হবে। যারা এ কুরবানীতে শুধু পশু হত্যা আর রক্তপাত দেখেন, পশু হত্যা বন্ধের বাহানা তুলে কুরবানী বন্ধ করার ধৃষ্টতা দেখান তাদের উদ্দেশে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাহসী উচ্চারণ. ‘ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্বোধন।/ দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খাম্খা ক্ষুব্ধ মন!/ ধ্বনি ওঠে রণি দূর বাণীর-,/ আজিকার এ খুন র্কোবানির!/ দুম্বা-শির রুম্-বাসীর/ শহীদের শির-সেরা আজি।-রহমান কি রুদ্র নন? / বাস্! চুপ খামোশ রোদন!’ কবির ভাষায়. ‘শহীদের শির-সেরা আজি’ -অর্থাৎ ইনসাফ কায়েম করতে.ভাঙা কেল্লায় বিজয় নিশান উড়াতে জিহাদ করার সংকল্প থাকতে হবে শহীদ হওয়ার স্বপ্ন হৃদয়ে লালন করতে হবে। মানবতার মুক্তির জন্য যুদ্ধ করতে হবে। জালিমের চাপিয়ে দেয়ার যুদ্ধের বিরুদ্ধে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করতে হবে।
তাই তো কবি আল মাহমুদ লিখেছেন, দমাঝে মাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে/মনে হয় রক্তই সমাধান, বারুদই অন্তিম তৃপ্তি;/আমি তখন স্বপ্নের ভেতর / জেহাদ, জেহাদ বলে জেগে উঠি।’ নব্বইয়ের দশকের কবি ওমর বিশ্বাস বিশ্বাস করেন যুদ্ধ ছাড়া সত্য ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়- তার কবিতার ভাষায়,‘আমি যুদ্ধের পক্ষে/ আমি শান্তির পক্ষে/ আমি প্রতিরোধের পক্ষে/ যদি সেটা হয় যুদ্ধ।’
তবে হ্যা সেই যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে সবার আগে নিজের নফসের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। আত্মগঠন করতে হবে। নিজেকে করতে হবে পাক,সাফ, বিশুদ্ধ কামেল ইনসান- সত্যিকারে মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ। আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পনকারী বান্দা রূপে নিজেকে গড়তে হবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়- হতে হবে প্রকৃত মুসলিম। তবেই এ অশান্ত পৃথিবীতে আসবে শান্তি। শান্তির আরেক নামই ইসলাম। লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক।
লেখক :
সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক