অন্তর্গত সৌন্দর্যের বিকিরণ
হাসান হাফিজ
‘ত্যাগ’ শব্দ মূলত ঐশী এক অনুষঙ্গ
ঝলসে ওঠে যেন সে রোদ্দুর
শুষে নেয় আঁধার-কলুষ
শুদ্ধতার মহতী সিঞ্চন।
‘ত্যাগ’ শব্দ বহতা নদীর ধর্মে
প্রবাহিত অনন্ত অবধি
সুন্দরের পরম্পরা পুষ্পিত প্রতীক
অপেক্ষারও অবসান
নিপুণ রচনা করে
আনন্দ ও কৌতূহল ভরে
স্বাগত সে সঞ্চালন উৎসব-মহিমা
কী আশ্চর্য মানবিক
কী সুন্দর স্বাভাবিকও
ভোগে নয় ত্যাগেরই আড়ালে
মহত্ত্ব ও মর্যাদা লুকানো।
যে নাম কেউ মনে রাখে না
কামাল হোসাইন
সে এসেছিল
ছায়ার মতো,
চোখেমুখে পুড়ে যাওয়া আগুন,
কাঁধে ব্যাগ,
মাথায় কোনো পোস্টার ছিল না,
শুধু একটা খাতাÑ
শেষ পাতায় ছিল কবিতা।
তাকে কেউ ডাকেনি সংবাদ সম্মেলনে,
কোনো ফেসবুক লাইভে দেখা যায়নি
তার শেষ হাসি।
সে পড়েনি প্রথম সারির শহিদ তালিকায়,
কারণ তার কাছে কোনো পরিচয়পত্র ছিল না,
শুধু ছিল বুকভরা না-বোধক শব্দ!
রক্ত শুকিয়ে গেছে রাস্তায়,
তার হাতের ছাপ মুছে দিয়েছে বৃষ্টির জল।
এখন তুমি যদি জিজ্ঞেস করোÑ
‘কে ছিল সে?’
উত্তরে কেউ বলে না কিছু।
শুধু বাতাসে ভেসে আসে একটা কান্না,
একটা ফেলে আসা নামহীন দীর্ঘশ্বাস।
সে হলো সেইÑ
যে নাম কেউ মনে রাখে না,
তবু যার শূন্যতাতেই গড়ে ওঠে ইতিহাসের খেরোখাতা।
ত্যাগের মহিমা
মোশাররফ হোসেন খান
হাতে ধারালো ছুরি, চোখ বাঁধা ইবরাহিম
ছুরির নিচে হাত-পা বাঁধা স্থির শিশু ইসমাঈল
এখনই কুরবানি হবেন তিনি-
কেঁপে ওঠে সাত আসমান,
আড়ালে হাসেন জিবরাইল!
নিস্তব্ধ আকাশ, পৃথিবী শোকে মুহ্যমান
পিতার হাতে পুত্র কুরবানি! -এমন নজির দেখেছে কি কেউ!
কম্পিত জিন-ইনসান, কম্পিত সাত সাগরের ঢেউ!
কী যে তাঁদের ত্যাগের মহিমা!
সে কথা কেউ ভোলে না-
তাঁদের আত্মত্যাগের কোনো তুলনাই চলে না
আমরাও যদি হতে পারি তেমনি সাহসী, ত্যাগী
তাহলে অকুণ্ঠ চিত্তে বলতে পারি-
‘ইন্নাস সালাতি ওয়া নুসুকি
ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি
রাব্বিল আলামিন!’
আমাদের সাথে ফেরেশতারাও সমস্বরে বলুন :
‘আমিন, আমিন’।
কোথাও সুস্থির নেই! কেঁপে উঠি দারুণ যাতনায়,
হৃদয়ে রক্তের ঝঙ্কার তোলে ত্যাগের চেতনায়।
আমি তো কেবল তাঁরই-
আমার সকল সত্তা জুড়ে
উপস্থিতি রয়েছে তাঁর,
‘ফাছাল্লি লি রাব্বিকা অনহার’!
এ এক অপূর্ব আত্ম ত্যাগ
মান্নান নূর
আনুগত্যের চূড়ান্ত নিদর্শন এটি-
“ সাতাজিদুনী ইনশা-আল্লাহ মিনাস্ সাবিরীন”
পিতার নজরানায় ছেলে ইসমাইলের সদুত্তর।
বিজন প্রান্তরের হাওয়া আশ্চর্য হয়ে থেমে গেল,
মরুপাখিদের চোখ ছানাবড়া, নির্বাক।
বালির ওপর সূর্যের রশ্মি স্তম্ভিত;
পাহাড়ের মৌনতা ভেদ করে পাথর আরও শক্ত, নিথর।
এ কেমন আত্মত্যাগ?
পৃথিবীর ইতিহাসে এ কেমন কুরবানি?
পিতার ধারালো ছুরির নিচে ভয়হীন চোখে, মৃদু হেসে
তাকিয়ে আছেন পুত্র- ইশারায় বললেন, পিতা!
“ খোদার অসন্তুষ্টির কারণ হবেন না।”
চোখ বেঁধে নবী ইবরাহিম ছুরি চালিয়ে দিলেন,
গলগল করে গরম রক্ত হাতে লেগে গেল-
ইবরাহিম চিৎকার করে বললেন, “ প্রভু! আমার কুরবানি
হয়েছে কি? প্রভু ডেকে বললেন,
“ ওয়া ফাদাইনাহু বি-যিবহীন আজীম।”
ইবরাহিম চোখ মেলে দেখেন-প্রিয় সন্তান সামনে দাঁড়িয়ে
সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। মহান প্রভু ডেকে বললেন,
“ আমার খলিল, আমার বন্ধু! ওঠ।”
কুরবানি, ঈদ
নয়ন আহমেদ
আমরা তোমার জন্যই কুরবানি দেবো, প্রভু।
তোমার আদেশ আমরা ছড়িয়ে দিয়েছি কতো যুগযুগান্তর থেকে!
যেরকম সূর্য ছড়ায় আলো।
যেমন নবি ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম যেদিন আদেশ পেলেন-
কুরবানি দাও তোমার আকাক্সিক্ষত বস্তুকে;
আমরা সেদিন থেকেই কুরবানি দিয়ে আসছি সবকিছু।
আমাদের প্রাণ। ধন। তাবৎ ইচ্ছা ও রুচির দৌলত।
ব্যক্তিগত অভিলাষ থেকে শুরু করে সকল পদক্ষেপ তোমার দিকেই।
আমরা একনিষ্ঠতার নিশান উড়াই।
এ আমাদের ঈদ।
আমাদের আত্মার উৎসব।
কেবল তোমার জন্যই দিন ও রাত্রির উদয়। জয়গান।
তোমার সন্তুষ্টির দানা পেলে অনন্তের ফুল ও ফসলের বাগান বানাবো।
যেখানে থাকবো চিরকাল।
পরম রোদ খেলা করবে মাছদের সাথে-
যার অস্ত যাবে না কোনও দিন।
তাই আমরা কুরবানি দেই।
তাই উপহার দেই বাঞ্ছিত, পরম।
আমরা জানি, পৃথিবীর কোনও শয়তান ভয় দেখাতে পারে না আমাদের।
ভয় দেখাতে পারেনি মাতা হাজেরাকে।
শয়তান যতই সুসজ্জিত হোক, সে পরাজিত হবে।
তাই আজও পাথর নিক্ষেপ করে আজাজিল তাড়াই।
তাওয়াফ করি।
আজও বলি- বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই।
আজও জিহাদ করি।
শত্রু তাড়াই।
আমরা বদরে ছিলাম। ওহুদে ছিলাম।
ছিলাম খায়বরে।
সবখানে আছি আজও।
আর তোমার পতাকে উঁচু করে তুলেছি তো আমরাই।
নবি ইসমাইল আলাইহিস সালাম আমাদের ভাই।
তার মতো বলি- অন্ধকার দূর হোক। অভিশপ্ত যত বদমাশ দূর হোক।
তোমার ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আমারাই কি বিলিয়ে দিইনি আমাদের প্রাণ, সম্পদ?
আমাদের রক্ত কি পবিত্র করিনি বারবার?
তবে কেন আমাদের বিমুখ করবে আজ?
প্রভু, আজ আমাদের দাও হযরত ইসমাইলের মতোন কল্যাণ।
দাও, মুক্ত পৃথিবী, যেন কেবল তোমারই রোদ ওঠে চরাচরে।
ছেয়ে যায় গাছের ছায়ার মতো পরিব্যাপ্ত শামিয়ানা।
চক্রান্তকারীদের হাত বিনষ্ট করো তুমি।
আমাদের হাতগুলো আরও শক্তিশালী করো, যেন ঐক্যব্দ্ধ হই সীসাঢালা প্রাচীরের মতো।
এই সবুজ মাঠ, দিগন্তবিস্তৃত আকাশ আবার যেন খুলে দেয় প্রেমের দরোজা।
যেন মানুষ মানুষের জন্য হয়।
যেন পৃথিবী সবার জন্য প্রশান্তির বাসগৃহ হয়।
আজ তোমার নামেই আমরা কুরবানি দেবো।
পশুত্ব ও অহংকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করবো-
আল্লাহু আকবর। আল্লাহ মহান।
পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেবো শান্তি ও প্রগতির এই বাণী।
বৃষ্টির মতো আসবে করুণা ও ভালোবাসা।
মথিত আটা থেকে যেমন করে চুল বের করে আনা যায়-
তেমন করে বের করে আনো তুমি সত্যের কণা। গুচ্ছ গুচ্ছ আলো।
এইভাবে নেমে আসবে আমাদের ঈদ।
আয়নার ইতিকথা
জসীম উদ্দীন মুহম্মদ
একটি নির্ঘুম খোলা জানালা রোজ আকাশের
সাথে কথা বলে, তার কাঁটায় ঝুলে থাকে পুরোনো
বিকেলের ছিন্নরোদ! আমি দেখি একটি ভবঘুরে
প্রজাপতি আর অন্ধ চিল... ওরা কুয়াশার ভেতর
একবার মরে আর একবার বাঁচে!
শহরের সমস্ত জলসিঁড়ি নদীর দিকে নেমে গেছে
যেখানে জীবন্মৃত ভাষারা মরতে মরতে জেগে উঠে
ওরাও কাঁদে নিয়ন বাতির নিচে; যেমন একদিন
আমিও কেঁদেছিলাম তোমার নাদান চোখের জলে!
আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই তোমার নিগ্রহ
তোমার চোখে জ্বলছিল অদ্ভুত সব লবণাক্ত গ্রহ।
ওপাশে আছে কিছু ভ্রমণ পিয়াসি ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ
ছেঁড়া পকেট থেকে ছড়িয়ে দেয় পুরোনো ডাকটিকিট
আমিও কিন্তু কম যাইনি... নিঃশব্দ ট্রেন
আমার ছায়াকে ভিজিয়ে রাখি অচেনা চাঁদের জলে
এই শতাব্দী এখনো আয়না জন্ম দেয় মানুষের বদলে!
পানশে ঈদ
মুন্সি আব্দুল কাদির
ঈদ
প্রতি বছর ঘুরে ঘুরে আসে
বছরে একবার তার সাথে মোলাকাত হয়ই হয়
জন্মের পর থেকেই দেখছি
একটু আকল হওয়ার তাকে একটু আধটু বুঝতে শিখছি
দিন দিন ঈদ নিয়ে আবেগ অনুভুতি
কেন যেন পানশে মনে হয়।
ঈদ আসে
ঈদের নামাজ হয়
কোরবানি হয়
হরেক রকম বাহারী রান্না, বাহারী বেশভূষা সবই হয়
যাকে কেন্দ্র করে এই আয়োজন
মাওলার কাছে রোনাজারী
মাওলার প্রেম ভালবাসার উপ¯ি’তি কমতির দিকে!
প্রভুর নিখাঁদ সš‘ষ্টি
নবীর নিখাঁদ ভালোবাসা
দ্বীনের সঠিক বুঝ ও ভালোবাসার
অনুপ¯ি’তি আমাদের তলিয়ে দি”েছ নিম্নস্তরে
আসছে ভেদাভেদ জেদজেদ
হিংসা অহংকার
কুৎসা, চোগলখুরী সহ মন্দ সব কিছু
ঈদ ঐক্য ভ্রাতৃত্ব আহবান করে
আমার কর্ণকুহরে পৌছাতে পারে না
শয়তান এখানে পর্দা দিয়ে রেখেছে
হৃদয়ে প্রভু প্রেমর অনুভূতি নেই।