মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
মানব ইতিহাস পরিক্রমায় মানুষের প্রকৃত মুক্তি, সাম্য এবং ঐক্যের অন্বেষণ একটি চিরন্তন বিষয়। ইসলাম ধর্মে এই অন্বেষণের বাস্তব, ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক রূপায়ণ ঘটে হজ¦ এবং কুরবানির মাধ্যমে। ‘হজ¦ ও কুরবানি: মানব মুক্তি’ শীর্ষক এই আলোচনাটি কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানবজাতির আধ্যাত্মিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মুক্তির এক সুসংগঠিত ঐশী রূপরেখা। মহান আল্লাহ মানবজাতির কল্যাণের জন্যই সুনির্দিষ্ট কিছু ইবাদতকে ফরজ বা আবশ্যিক করেছেন, যার মধ্যে হজ¦ অন্যতম। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, “মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই গৃহের হজ¦ করা তার অবশ্য কর্তব্য।” একইসাথে কুরবানি সম্পর্কে সূরা আল-কাওসারে বলা হয়েছে, “অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যেই সালাত আদায় করো এবং কুরবানি করো।” এই আয়াতসমূহ প্রমাণ করে যে, হজ¦ ও কুরবানি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার ওপর অর্পিত এক অলঙ্ঘনীয় বিধান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন আল্লাহ এই বিষয়গুলোকে আবশ্যিক করেছেন? এর উত্তর নিহিত রয়েছে মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ ও মুক্তির দর্শনে। স্রষ্টার প্রতি পূর্ণাঙ্গ সমর্পণ ছাড়া মানুষের অহমিকা, স্বার্থপরতা এবং পাশবিক প্রবৃত্তির বিনাশ ঘটে না। মানুষের ভেতরের এই পাশবিকতা ও অহংকার যখন দূরীভূত হয়, তখনই কেবল একটি সুস্থ, সাম্যভিত্তিক ও কল্যাণকামী সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। হজ¦ এবং কুরবানি মানুষকে সেই আত্মশুদ্ধি এবং আত্মত্যাগের শিক্ষাই প্রদান করে, যা তাকে প্রকৃত অর্থেই মানবীয় মুক্তির স্বাদ আস্বাদন করায়।
হজ¦ এবং কুরবানির মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, নিবিড় ও অবিচ্ছেদ্য। হজে¦র একটি অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো কুরবানি। কুরবানি কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনে পশু জবাই করার নাম নয়, এটি হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই মহান আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক স্মারক, যা কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত মানুষের জন্য এক চূড়ান্ত পরীক্ষার মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু, নিজ পুত্রকে কুরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, স্রষ্টার সন্তুষ্টির কাছে পৃথিবীর কোনো মোহ, কোনো মায়া বা কোনো সম্পর্কই বড় নয়। হজ¦ পালনের সময় একজন হাজী যখন মিনা প্রান্তরে কুরবানি করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ভেতরের পশুত্ব, অহংকার, লোভ এবং পার্থিব মোহকেই জবাই করেন। হজে¦র মাধ্যমে মানুষ তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, আর কুরবানির মাধ্যমে সেই পরিশুদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো সমস্ত জাগতিক মোহকে ছিন্ন করার শপথ নেয়। এই দুটি ইবাদত একে অপরের পরিপূরক। হজ¦ যদি হয় স্রষ্টার সকাশে নিজেকে সমর্পণ করার এক বৈশ্বিক মহাসম্মেলন, তবে কুরবানি হলো সেই সমর্পণের পথে নিজের সর্বস্ব ত্যাগের চূড়ান্ত মহড়া। এই ত্যাগের মাধ্যমেই মানুষ তার প্রবৃত্তিগত দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে, যা মানব মুক্তির প্রথম ও প্রধান শর্ত।
সামাজিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, হজ¦ বিশ্বের সকল মানুষকে একত্রিত করে একটি অখণ্ড জাতিতে বা ‘উম্মাহতে পরিণত করার এক বিস্ময়কর ঐশী প্রক্রিয়া। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, বর্ণ, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে লক্ষ লক্ষ মানুষ একই সময়ে, একই উদ্দেশ্যে মক্কায় সমবেত হন। এই মহামিলনের দৃশ্য সামাজিক সাম্যের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। মানুষের মাঝে গোত্রীয়, ভাষাগত বা বর্ণগত যে ভেদাভেদ, তা মুছে ফেলার জন্য হজে¦র চেয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা পৃথিবীতে নেই। ইহরামের শুভ্র বসন পরিধান করার সাথে সাথেই একজন রাজা এবং একজন ফকিরের মধ্যকার সমস্ত বাহ্যিক পার্থক্য ঘুচে যায়। সেলাইবিহীন দুটি সাদা কাপড় যেন মৃত্যুর পর পরানো কাফনেরই প্রতিচ্ছবি, যা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জাগতিক ক্ষমতা, সম্পদ বা বংশমর্যাদা স্রষ্টার কাছে সম্পূর্ণ মূল্যহীন। বিদায় হজে¦র ভাষণে নবী করিম (সা.) অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, “অনারবের ওপর আরবের, আরবের ওপর অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের, শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, একমাত্র তাকওয়া বা আল্লাহভীতি ছাড়া।” এই ঐতিহাসিক ঘোষণা এবং হজে¦র বাস্তব অনুশীলন মানুষকে গোত্রীয় অহমিকা থেকে বের করে এনে ‘বনী আদম’ বা এক মানবজাতির কাতারে দাঁড় করায়। আরাফাতের ময়দানে যখন বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই প্রভুর কাছে ফরিয়াদ জানায়, তখন সেখানে কোনো জাতীয়তাবাদ, কোনো বর্ণবাদ বা কোনো আঞ্চলিকতার স্থান থাকে না। মানুষের সৃষ্ট কৃত্রিম বিভাজনের প্রাচীরগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যায় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় এক অকৃত্রিম বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ববোধ।
হজ¦ মানুষকে একটি জাতিতে পরিণত করার পর মানুষের মাঝে গোত্রীয় ভেদাভেদ ভুলে যে মুক্তির কথা বলে, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে তার তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মানবতা যখন দিশেহারা, তখন হজ¦ একটি বিকল্প রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম দেয়। এই দর্শনটি হলো ‘সীমান্তহীন উম্মাহ’ বা বর্ডারলেস সোসাইটির ধারণা। হজে¦র এই রাজনৈতিক চেতনা মানুষকে শেখায় যে, তাদের মূল আনুগত্য কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, রাষ্ট্রনায়ক বা রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়, বরং তাদের চূড়ান্ত আনুগত্য একমাত্র বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর প্রতি। যখন পৃথিবীর সমস্ত মুসলমান এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের এক জাতি বা এক দেহের অংশ হিসেবে ভাবতে শুরু করে, তখন কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের শোষণ করার সাহস পায় না। রাজনৈতিকভাবে হজ¦ একটি বার্ষিক বৈশ্বিক কংগ্রেস বা মহাসম্মেলন। এখানে একত্রিত হয়ে মুসলমানরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মজলুম মানুষের ওপর হওয়া অত্যাচার, বৈষম্য এবং অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা পায়। গোত্রীয় বা ভৌগোলিক পরিচয় মুছে ফেলার অর্থ হলো, ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, সিরিয়া বা মিয়ানমারে নির্যাতিত একজন মানুষের ব্যথা পৃথিবীর অন্য প্রান্তের একজন মুসলমান সমানভাবে অনুভব করবে। এটিই প্রকৃত রাজনৈতিক মুক্তি, যেখানে মানুষ মানুষের রচিত শোষণমূলক আইন ও আধিপত্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্রষ্টার দেওয়া ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখে। হজে¦র রাজনৈতিক মুক্তির ধারণাটি হলো মানব রচিত সার্বভৌমত্বের অবসান ঘটিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা, যার মাধ্যমে পৃথিবীতে শান্তি, সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হতে পারে।
বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্লেষক এবং দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে হজ¦ ও কুরবানির এই তাত্ত্বিক রূপরেখা আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রখ্যাত ইরানি সমাজবিজ্ঞানী ও ইসলামি চিন্তাবিদ ড. আলী শরিয়তি তাঁর বিশ্বনন্দিত হজ¦ গ্রন্থে অত্যন্ত চমৎকারভাবে হজে¦র দার্শনিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। তিনি হজ¦কে মানুষের আদিতে ফিরে যাওয়া বা রিটার্ন টু অরিজিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, তাওয়াফ হলো মহাবিশ্বের ঘূর্ণায়মান ব্যবস্থার সাথে মানুষের আত্মার একাত্ম হওয়া, আর সাফা ও মারওয়ার সায়ী হলো জীবন সংগ্রামে মানুষের নিরন্তর ছুটে চলার প্রতীক। কুরবানি প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ইব্রাহিমের জন্য তাঁর কুরবানি ছিল ইসমাইল, কিন্তু প্রতিটি মানুষের জীবনেই নিজস্ব একটি ইসমাইল থাকেÑহতে পারে তা তার সম্পদ, পদমর্যাদা, ক্যারিয়ার বা অন্য কোনো মোহ। প্রকৃত মুক্তির জন্য সেই নিজস্ব ইসমাইলকে কুরবানি করতে হয়। অন্যদিকে, উপমহাদেশের বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী তাঁর ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ গ্রন্থে হজে¦র আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কথা আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে হজ¦ মুসলমানদের মধ্যে একটি সম্মিলিত শক্তি ও সংহতি তৈরি করে, যা যেকোনো আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে একটি মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তব প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। আল্লামা ইকবাল তাঁর কবিতায় হজে¦র এই ঐক্যের সুরকেই ধারণ করেছেন, যেখানে তিনি মুসলিম উম্মাহকে ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে এক তাওহিদের পতাকাতলে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আধুনিককালের ইসলামি স্কলার সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভীও মনে করতেন যে, হজ¦ হলো মুসলিম উম্মাহর হারানো জীবনীশক্তি ফিরে পাওয়ার এক আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক কর্মশালা, যা তাদের বিশ্বনেতৃত্ব প্রদানের উপযুক্ত করে গড়ে তোলে।
শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে হজ¦ ও কুরবানির ভূমিকা কেবল আধ্যাত্মিক নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো প্রদান করে। হজে¦র সফরে ধনী ও দরিদ্র একই বাহনে, একই তাঁবুতে এবং একই পোশাকে অবস্থান করে। এখানে সম্পদের অহংকার দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে, কুরবানির অর্থনৈতিক দর্শনটি শ্রেণি বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্পদ কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত থাকে, কিন্তু ইসলামি ব্যবস্থায় কুরবানির মাধ্যমে সম্পদের একটি বিশাল অংশ দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী কুরবানির গোশতের তিন ভাগের এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য বণ্টন করা মুস্তাহাব। এর মাধ্যমে সমাজের সেইসব মানুষ, যারা সারা বছর হয়তো পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত থাকে, তারা উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পায়। এটি কেবল দান নয়, বরং এটি সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের অধিকার। কুরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ সম্পূর্ণভাবে দরিদ্র ও অসহায়দের মাঝে বিতরণ করা হয়, যা সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় বিশাল ভূমিকা পালন করে। কুরবানির এই অর্থনৈতিক বণ্টন ব্যবস্থা মানুষকে স্বার্থপরতা থেকে বের করে এনে একটি কল্যাণকামী এবং পারস্পরিক নির্ভরশীল সমাজ গঠনে উৎসাহিত করে, যেখানে কেউ অনাহারে থাকবে না এবং সম্পদশালীদের সম্পদের ওপর দরিদ্রের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
এই বৃহত্তর ঐক্যের প্রেক্ষাপটে বিশ্বমুসলিম উম্মাহর সাথে বাংলাদেশের মুসলমানদের একটি পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে লক্ষাধিক ধর্মপ্রাণ মুসলমান হজ¦ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় গমন করেন এবং লাখ লাখ পশু কুরবানি করা হয়। বাংলাদেশের মুসলমানরা যখন হজে¦র ময়দানে অন্যান্য দেশের মুসলমানদের সাথে মিলিত হন, তখন তারা একটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের অংশ হয়ে ওঠেন। এই অংশগ্রহণ কেবল একটি ধর্মীয় সফর নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সাথে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের এক মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সেতুবন্ধন। বিশ্বায়নের এই যুগে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে টিকে থাকার জন্য মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। একটি পতাকার তলেÑঅর্থাৎ তাওহিদ বা একত্ববাদের পতাকার তলে সমবেত হওয়ার অর্থ হলো, যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশের মুসলমানরা উম্মাহর পাশে দাঁড়াবে এবং উম্মাহও বাংলাদেশের পাশে থাকবে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা যখন নানাভাবে নির্যাতিত, পশ্চিমাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে যখন ইসলামি মূল্যবোধ হুমকির সম্মুখীন, তখন এই হজে¦র চেতনাই হতে পারে আমাদের মুক্তির একমাত্র পথ। বাংলাদেশের মুসলিমরা যদি হজ¦ ও কুরবানির প্রকৃত শিক্ষাকে ধারণ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করে, তবে সমাজে কোনো দুর্নীতি, জুলুম বা বৈষম্য থাকতে পারে না।
সামাজিক ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেসব মানুষ হজ¦ থেকে ফিরে আসেন বা যারা সঠিক চেতনায় কুরবানি আদায় করেন, তাদের ব্যক্তিজীবনে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হয়। তারা সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও জনকল্যাণকর কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেন। বাংলাদেশে প্রতি বছর কুরবানির সময় যে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকার পশুর হাট বসে এবং এর সাথে জড়িত যে গ্রামীণ অর্থনীতি আবর্তিত হয়, তা দেশের দরিদ্র কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর বিধানের মধ্যে মানুষের জন্য কেবল পরকালীন মুক্তিই নয়, বরং ইহকালীন অর্থনৈতিক মুক্তিও নিহিত রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ‘হজ¦ ও কুরবানি: মানব মুক্তি’ কেবল একটি শিরোনাম নয়, এটি ইসলামি জীবনব্যবস্থার এক শাশ্বত দর্শন। হজ¦ মানুষকে শেখায় কীভাবে সকল কৃত্রিম বিভেদ ভুলে এক মানবজাতিতে পরিণত হতে হয়, কীভাবে ভৌগোলিক ও জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে এসে এক বিশ্বজনীন রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হয়। আর কুরবানি শেখায় কীভাবে নিজের ভেতরের পশুত্ব ও মোহকে বিসর্জন দিয়ে একটি সাম্যভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও কল্যাণকামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হয়। মানুষের প্রকৃত মুক্তি কোনো মানব রচিত মতবাদের মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং এই মুক্তি নিহিত রয়েছে স্রষ্টার কাছে নিজেকে নিঃশর্তভাবে সমর্পণ করার মধ্যে। হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক ত্যাগের আদর্শ এবং আরাফাতের ময়দানে লাখো মানুষের সমবেত কণ্ঠের লাব্বাইক ধ্বনি বিশ্ববাসীকে আজও এই বার্তাই দেয় যে, যতদিন মানুষ স্রষ্টার দাসত্ব কবুল না করবে, ততদিন সে অন্য মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্তি পাবে না। হজ¦ ও কুরবানির এই শাশ্বত শিক্ষা যদি পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের মুসলমান, বিশেষ করে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ তাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে ধারণ করে এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে, তবেই একটি শোষণমুক্ত, ইনসাফভিত্তিক এবং প্রকৃত অর্থে স্বাধীন মানবসমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এটাই হজ¦ ও কুরবানির চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং এটাই মানবতার প্রকৃত মুক্তি।
লেখক :
প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক