ড. ইকবাল কবীর মোহন

বিশ্বজুড়ে মুসলিমপ্রধান ও উল্লেখযোগ্য মুসলিম রয়েছে এসব দেশে ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যপকতা লাভ করে। বিশেষ করে ঈদুল আযহার কুরবানি পশুপালন ও সংশ্লিষ্ট খাত দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় প্রভাব বিস্তার করে। এর মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে পশুর সংখ্যা, এর বাজারমূল্য, পশুপালন ঘিরে কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাবের বিচারে কুরবানিকেন্দ্রিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ। আমাদের দেশে বছরে মুসলমানদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা পালিত হয়। দুই ঈদকে কেন্দ্র করে পোশাক তৈরি ও বিক্রি, পোশাক আমদানি, মসলাপাতি আমদানি ও বিক্রি, চাকরিজীবীদের বোনাসপ্রাপ্তি, কোরবানির গরু-ছাগল, মহিষ, ভেড়া ইত্যাদির ব্যাপক চাহিদা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। ফলে দেশের অর্থনীতিতে বিপুল গতিশীলতা, কর্মতৎপরতা ও প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে কুরবানিকে ঘিরে যে অর্থনীতি তার আকার ৫.৭ বিলিয়ন ডলার, টাকার অঙ্কে যা ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

প্রথমত বলা যায়, ঈদুল আযহা উপলক্ষে পশু লালন-পালন ও কুরবানির পশু বিক্রি দেশের অর্থনীতিতে প্রচণ্ড গতি সঞ্চার করে। ২০২৫ সালে ঈদুল আযহায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পশু কুরবানি হয়েছে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি। এর মধ্যে গরু-মহিষের সংখ্যা ছিল ৪৭ লাখ পাঁচ হাজার ১০৬টি। ছাগল ও ভেড়া ছিল ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি এবং উট, দুম্বাসহ অন্যান্য প্রাণী ছিল ৯৬০টি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এর আগের বছরের হিসাব অনুযায়ী ঈদুল আযহায় সারা দেশে মোট এক কোটি চার লাখ আট হাজার ৯১৮টি পশু কুরবানি করা হয়েছিল, যা এ বছরের তুলনায় ছিল ১২ লাখ ৭২ হাজার ১৮৪টি বেশি। কুরবানির ঈদ উদযাপন উপলক্ষে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় পশুর বাজারে।

কুরবানিকৃত পশুর সরবরাহ ও বেচাকেনার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চাঁদা, টোল, বকশিশ, চোরাকারবার, ফড়িয়া, দালাল, হাসিল, পশুর হাট ইজারা, রশি, বাঁশ ও খুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবার ও পশু কোরবানি ও গোশত বানানো, এমনকি পশুর সাজগোজের জন্য বিপুল আর্থিক লেনদেন হয়। ফলে অর্থনীতিতে আর্থিক লেনদেন ও মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়। তা ছাড়া কুরবানি করা পশুর চামড়া বেচাকেনা, সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য প্রচুর আর্থিক লেনদেন হয়। পশুর চামড়া রপ্তানি বাণিজ্য, পাদুকাশিল্প এবং হস্তশিল্পেও ব্যাপক আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে।

এক তথ্য মতে, দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে ১৭ লাখ ছোট-বড় খামার আছে। এই কর্মকাণ্ডের সাথে প্রায় কোটি মানুষ জড়িত। এরা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করে। এ সময় চামড়াশিল্পে ব্যাংক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। কুরবানির ঈদে পশুর চামড়া সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা জড়িত। এ সময় চামড়াশিল্পে সরকারি ব্যাংকগুলো প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে থাকে। এতে ব্যাংকের আয় যেমন বাড়ে, তেমনি চামড়াশিল্পের আয়-উন্নতিও বৃদ্ধি পায়। তা ছাড়া এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

উল্লেখ্য চামড়াশিল্পে চামড়া সংরক্ষণের একটি অন্যতম উপাদান লবণ। এ জন্য কুরবানি উপলক্ষে দেশি শিল্পে লবণ উৎপাদন এবং চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রয়োজনে আমদানি বাণিজ্যও বেড়ে যায়। ফলে ব্যবসায়ী, লবণশিল্প এবং পাদুকাশিল্পের আর্থিক তৎপরতা ও কর্মকাণ্ড অনেক বেড়ে যায়। আমাদের দেশে কুরবানির মাংস সারা বছর খাওয়ার জন্য তা সংরক্ষণের প্রয়োজন দেখা যায়। ফলে ঈদ উপলক্ষে প্রতিবছর ফ্রিজ বিক্রির চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে তিন-চার হাজার কোটি টাকার ফ্রিজ বিক্রি হয় বলে জানা যায়। ফলে এই শিল্পের উৎপাদন ও তৎপরতা অনেক বেড়ে যায়, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

কুরবানির সময় ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সবার ঘরে ঘরে মাংস রান্নার হিড়িক পড়ে যায়। সেদিন দুপুরবেলায় মানুষ পরম আনন্দে সতেজ মাংস রান্না করে তৃপ্তিসহকারে খেতে বসে। এই খাবার সুস্বাদু করার জন্য মাংস রান্নার কাজে মানুষ হরেক রকম মসলা ব্যবহার করে। গরম মসলা, বিশেষ করে এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতার ব্যবহার কুরবানির সময় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। এসব পণ্যের প্রায় সবই বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এক হিসেব মতে, কুরবানির বাজারে এসব পণ্যে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই হিসাবের বাইরেও ঈদের আগে চোরাপথে পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার ও ভারত থেকে প্রচুর মসলা আসে। এর ফলেও অর্থের লেনলেন অনেক বেড়ে যায়। রান্নার কাজে ব্যবহৃত বড় একটি উপাদান পেঁয়াজ। প্রতিবছর দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টন। রসুন ও আদার চাহিদা যথাক্রমে পাঁচ লাখ ও তিন লাখ টন। এই চাহিদার বড় অংশ কুরবানির সময়কে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়।

এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, কুরবানির সময় ছুরি, বঁটি, দা, চাপাতি, কুড়াল, রামদা, কাঠের গুঁড়ি, চাটাই, পলিব্যাগ ইত্যাদি ছাড়া কুরবানির পশু জবাই, কাটাকাটি সম্ভব হয় না। এর পেছনে খরচের কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, কুরবানিতে এসব পণ্যগুলোর বাজার প্রায় এক হাজার কোটি টাকারও বেশি।

কুরবানিকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে বিপুল অঙ্কের টাকার জোগান বেড়ে যায়। ঈদ উপলক্ষে দেশে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঈদের সময় ঈদ বোনাস দেওয়া হয়। এক হিসাব মতে, দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে বোনাস বিতরণ করা হয় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। দেশব্যাপী ৬০ লাখ দোকান কর্মচারীদের বোনাস আসে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিকের সম্ভাব্য বোনাস তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তা ছাড়া আছে বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঈদ বোনাস মিলে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অর্থনীতিতে বাড়তি যোগ হয়। ফলে অর্থনীতিতে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যায়। এই অর্থ কিন্তু বসে থাকে না, বরং তা বাজারে চাহিদা সৃষ্টি করে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিকে প্রভাবিত করে। তখন মানুষ জামা-কাপড়, জুতা, প্রসাধনী, আতর, জায়নামাজ ইত্যাদিসহ নানা খাতে যেমন অর্থ ব্যয় করে, তেমনি গরিব-দুঃখী ও অভাবী মানুষকে দান করার ফলে অর্থনীতিতে অসাধারণ প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।

তখন দেশের বেশির ভাগ শহুরে মানুষ মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার জন্য গ্রামের বাড়িতে ছুটে যায়। ফলে ট্রেন ও বাস মালিক সবার ব্যবসায় গতি আসে। এতে কুরবানির সময় পরিবহন খাতে যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়, তাতে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যবসা ও লেনদেন হয়ে থাকে। এই কর্মকাণ্ডের ফলে অর্থনীতির চাকা গতি লাভ করে।

কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে প্রবাসী রেমিট্যান্সের প্রবাহ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। প্রবাসীরা তাঁদের পরিবার-পরিজনের নানা ধরনের ঈদ খরচ ও কুরবানির জন্য প্রচুর বিদেশী মুদ্রা পাঠিয়ে থাকেন। এতে অর্থনীতিতে লেনদেন বেড়ে যায় এবং জাতীয় অর্থনীতির ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে দেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহ নতুন রেকর্ড করেছে। পুরো বছরে মোট রেমিট্যন্স আসে ২৬.৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। আগস্ট বিপ্লবের পর থেকে প্রতি মাসে দেশে গড়ে রেমিট্যান্সপ্রবাহ রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যায়। ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত (মানে ঈদের ঠিক আগের মাস) দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছিল তা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। এবারেও ঈদ উপলক্ষে রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের মতই রেকর্ড পরিমাণ আসবে বলে আশা করা যায়। ঈদ উপলক্ষে আসা এই বিশাল অঙ্কের রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির চাকাকে যেমন সচল করছে, তেমনি দেশের রিজার্ভকেও শক্তিশালী করছে।

প্রতি বছরের ন্যায় ২০২৬ সালের ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে পশু সরবরাহ ও বিক্রি আশাব্যঞ্জক হবে বলে আশা করা যায়। সরকারি এক তথ্যমতে, এ বছর কুরবানির জন্য ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশুর সরবরাহ হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকায় সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত কুরবানির পশুর চাহিদা নিরূপণ ও সরবরাহবিষয়ক সেমিনারে মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী এ তথ্য প্রকাশ করেন। এই সংখ্যা মোট চাহিদার চেয়ে ২২ লাখের বেশি বলে প্রাণিসম্পদ সচিব জানিয়েছেন। এ বছরের চাহিদার মধ্যে রয়েছে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু-মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল-ভেড়া, এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রাণী। ফলে চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি হবে, যা দেশে পশু উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভ করেছে। আশা করা যায়, আগের বছরগুলোর মতো, এবারের ঈদুল আযহাকেন্দ্রিক পশু সরবরাহ ও লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট খাতসমূহে তৎপরতা সুন্দরভাবে সুসম্পন্ন হবে এবং জাতীয় অর্থনীতির পরিমণ্ডলে তা ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা তৈরি করতে সক্ষম হবে।

পরিশেষে বলা যায়, ঈদুল আযহা আমাদের জাতীয় জীবনে ধর্মীয় দিক থেকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির সমৃদ্ধি ও অগ্রগতিতে এর অবদান অনস্বীকার্য। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, কুরবানির ঈদ শুধৃ একটি ধর্মীয় উৎসবই নয়, এটি গ্রামীণ ও শহরকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করার অন্যতম বড় উৎসব।

লেখক :

প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক ও সাবেক ডিএমডি, ইসলামী ব্যাংক এবং অ্যডিশনাল ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।