আহসান হাবিব বুলবুল
ইসলামকে বলা হয় প্রকৃতির ধর্ম। এর বিধি-বিধান প্রকৃতির মতই সহজ ও সাবলীল। প্রকৃতির আলো-বাতাস, পানি, বৃক্ষের ছায়া যেমন আমরা বাধাহীনভাবে পাই, তেমনি তা আমাদের জন্য উপাদেয় ও সহনীয়। ইসলামের বিধি-বিধানও মানুষের জন্য কল্যাণকর। কেননা এই বিধি-বিধান আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে। আল্লাহ জানেন, তার সৃষ্টির জন্য কি প্রয়োজন ও কল্যাণের। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, ‘ইসলামই আল্লাহর একমাত্র মনোনীত দ্বীন (আল কুরআন, সূরা আল ইমরান-১৯)’। ইসলামকে সাধারণ অর্থে ধর্ম বলা হলেও একে কুরআন মাজিদে দ্বীন বলা হয়েছে। দ্বীন অর্থ জীবনব্যবস্থা। জীবনের জন্য যা কিছু প্রয়োজন, জীবনের যত দিক ও ক্ষেত্র রয়েছে তা আল্লাহ ইসলামে দিয়ে পূর্ণাঙ্গতা দান করেছেন। আল্লাহ্ বলেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম। (আল কুরআন, সূরা আল মাইদাহ-৩)’
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। যার প্রতিটি বিধান মানুষের সর্বাঙ্গীন কল্যাণের জন্য। আনন্দ বা খুশি মানুষের জন্য একটি স্বাভাবিক দাবি ও প্রাকৃতিক নিয়ম। দ্বীন মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা ও গুরুত্ব অনুভব করে এবং কতিপয় সীমারেখা ও শর্তসাপেক্ষে ওই প্রয়োজনগুলো পূরণ করতে উৎসাহ প্রদান করে। দ্বীন কখনো এটা চায় না যে, তুমি কপট গাম্ভীর্য, অবাঞ্ছিত মর্যাদা, সর্বদা মনমরা ভাব ও নির্জীবতা দ্বারা তোমার কর্মকুশলতা ও যোগ্যতাকে নিস্তেজ করে দিবে। সে (দ্বীন) তোমাকে খুশি ও আনন্দ প্রকাশের পূর্ণ অধিকার প্রদান করে, এও দাবি করে যে, তুমি সর্বদা উচ্চ আকাক্সক্ষা, সজীব উদ্যম ও নবউদ্দীপনায় সজীব থাকো। বিধি-বিধানের সীমালঙ্ঘন না করে আল্লাহর নেয়ামতের শোকর গুজারের মাধ্যমে যে কোন খুশির প্রকাশ ইসলামে অনুমোদিত। সে কারণে আল্লাহ্ তায়ালা ইসলামে তথা মুসলমানদের জন্য বছরে দু’টি খুশির দিন দিয়েছেন। একটি ‘ঈদ-উল-ফিতর’ অন্যটি ‘ঈদ-উল-আযহা’। ঈদ উল ফিতর রোজার সাথে সম্পৃক্ত এবং ঈদ উল আযহা কুরবানির সাথে সম্পৃক্ত। আযহা শব্দের অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গ। আর ঈদ শব্দের অর্থ আনন্দ বা উৎসাহ। সে দিক বিবেচনায় ঈদ উল আযহা শব্দের অর্থ ত্যাগের বা উৎসর্গের উৎসব। জিলহজ¦ মাসের নয় তারিখে হজ¦ব্রত পালনের পরের দিন দশ জিলহজ¦ তারিখে মুসলিম সমাজে বিশ্বব্যাপী ঈদ উল আযহা ও পশু কুরবানি করা হয়। কুরবানি আত্মত্যাগ মহান আল্লাহর নিকট নিঃসংশয় আত্মসমপর্ণের এক মহত্তম নিদর্শন। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.) কে কুরবানির ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ পালনের যে পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন তা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক চিরন্তন আদর্শ। এই কুরবানির মাধ্যমে কিভাবে স্বার্থ, ভালোবাসা ও সম্পদের লোভ ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর আদেশের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করতে হয় তা শেখা যায়। এরচেয়ে বড় আত্মত্যাগ আর যেমন হতে পারে না, আত্মসমর্পণের এর চেয়ে বড় নজির পৃথিবীতে আর নেই। ইবরাহিম (আ.) এর আত্মত্যাগ ও আত্মসমর্পণের এই মহত্তম দৃষ্টান্ত সমগ্র বিশ্ববাসীর নিকট চির অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
কুরবানির সেই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের সবারই কমবেশি জানা। সেই ঘটনার বর্ণনায় না গিয়ে আসুন আমরা এই দিনের খুশির বাহ্যিক তথা সামাজিক ও অন্তর্নিহিত বা আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের দিকে একটু আলোকপাত করি।
সামাজিক সৌন্দর্য : ঈদ উল আযহা বা কুরবানির ঈদ ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হয়ে সমাজে সাম্য, মৈত্রী ও ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এটি ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলিয়ে দেয়। আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের মাঝে গোশত বিতরণের মাধ্যমে পারস্পরিক সহানুভূতি, উৎসবের আমেজ সৃষ্টি এবং সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করে। উৎসবের এই বাহ্যিক রূপটি মানুষের মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে সামাজিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে।
ঐতিহ্যবাহী উৎসবের আমেজ : নতুন পোশাক পরিধান, বিশেষ সুস্বাদু খাবার তৈরি এবং শিশু-কিশোরদের ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার মাধ্যমে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়।
পারিবারিক ও সামাজিক মিলন মেলা : ঈদের নামায শেষে পশু কুরবানির করা, পরিবার ও আত্মীয় স্বজনদের সাথে সময় কাটানো, এক সাথে খাওয়া-দাওয়া করা এবং কোলাকুলির মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে। হাদীসে এসেছে, ঈদগাহে একপথে যাও এবং অন্যপথে ঘরে ফেরো এবং তাকবির বলে বলে আল্লাহর মাহাত্ম্য ঘোষণা করো। এতে ঈদের আনন্দ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং এক মনোহর দৃশ্যের সৃষ্টি হয়।
গোশত বণ্টন ও সামাজিক সাম্য : কুরবানির পশুর গোশত আত্মীয়, প্রতিবেশী এবং দরিদ্র মানুষের মধ্যে তিন ভাগে বণ্টন করার নিয়ম রয়েছে। এটি সমাজের বিত্তবান ও অভাবী মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে ঈদের আনন্দ সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। ফলে সমাজে পারস্পরিক সাহায্য, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে এবং আনন্দের সমবণ্টন হয়।
সামর্থ্যবানদের ওপর ওয়াজিব : সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর কুরবানির করা ওয়াজিব, যা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে এবং দরিদ্রকেও ঈদের আনন্দে শরীক করে।
অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য : কুরবানির পশু কেনাবেচা কেন্দ্র করে গ্রামীণ ও নগর অর্থনীতিতে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়; যা অনেক মানুষের আয়ের উৎস হিসাবে কাজ করে।
ত্যাগের মানসিকতা ও উদারতা : নিজের প্রিয়বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি দেয়ার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য ও ত্যাগের মনোভাব সমাজের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
-‘তোমরা কখনো পুণ্য অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয়বস্তু থেকে ব্যয় করবে (আল্লাহর পথে)। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, আল্লাহ তা খুব ভাল করেই জানেন’ (আল কুরআন, সূরা আল-ইমরান, আয়াত : ৯২)।
মুসলিম উম্মাহর ঐকতান : চাঁদ দেখা সাপেক্ষে নয় জিলহজ¦ তারিখে পবিত্র মক্কা শরীফে হজ¦ব্রত পালন এবং পরদিন দশ জিলহজ¦ তারিখে দেশে দেশে ঈদ উল আযহা উদযাপন ও পশু কুরবানি মুসলিম উম্মাহকে এক সুতায় গেঁথে দেয়। সৃষ্টি হয় মুসলিম উম্মাহর ঐকতান।
‘তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, আর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (আল কুরআন, সূরা আল ইমরান : ১০৩)।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রেরণা : পশু কুরবানির পর স্বাভাবিকভাবেই পশুর রক্ত ও বর্জ্য পরিবেশকে অপরিচ্ছন্ন ও দূষিত করে। মুসলমানরা একটি পরিচ্ছন্ন জাতি। তারা পবিত্রতা পছন্দ করে। এ প্রেরণা ও শিক্ষা তারা তাদের নবী-রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছ থেকেই পেয়ে থাকে। ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ বা অর্ধেক।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর : ২২৩)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্রতা পছন্দ করেন। (তিরমিযী)
এ কারণেই মুসলমানরা কুরবানির পর নিজ উদ্যোগে পশুর রক্ত ও বর্জ্য পরিষ্কার করে ফেলে। এ ব্যাপারে তারা পৌর বা সিটি করপোরেশনকে সহযোগিতা করে।
কিছু যে ব্যত্যয় ঘটে না, তা নয়। কিন্তু আমাদের কর্তব্য হবে কুরবানির বর্জ্য দ্রুত পরিষ্কার করে ফেলা, যাতে পরিবেশ দূষিত না হয়। তবে আমরা সবাই নিরাপদ থাকবো। এভাবেই সমাজে প্রতিভাত হয় ঈদ উল আযহার বাহ্যিক ও সামাজিক সৌন্দর্য, সাম্য, মৈত্রী ও ভালোবাসার মেলবন্ধন।
ঈদ উল আযহার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য : যুগে যুগে প্রত্যেক জাতির জন্য কুরবানির বিধান ছিল। আল্লাহ বলেন, ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির বিধান করে দিয়েছি। তিনি জীবনোপকরণের জন্য যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর ওপর তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে (আল কুরআন, সূরা হজ¦ : ৩৪)।
আমাদের সৌভাগ্য যে, আল্লাহ ঘোষণা দিয়ে পরীক্ষা নিয়েছেন এবং দু’জন মহান পয়গম্বর সেই পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে আমাদের জন্য ত্যাগ ও উৎসর্গের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যা মুসলিম জাতির জন্য গৌরবের।
কুরবানির উদ্দেশ্য : কুরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাকওয়া অর্জন। কুরবানির ঈদ হলো আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের উৎসব, যা হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর ত্যাগের স্মৃতি বহন করে। এর মূল সৌন্দর্য পশুর রক্ত ঝরানো নয় বরং মানুষের ভেতরের পশুত্ব, অহংকার ও লোভকে কুরবানি দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। এই উৎসব সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং ত্যাগের শিক্ষায় সমাজকে উজ্জীবিত করে।
মহান ত্যাগের আদর্শ : প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে হযরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশে তাঁর প্রিয়পুত্র ইসমাইল (আ.) কে কুরবানি দিতে প্রস্তুত ছিলেন। ঈদ উল আযহা আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকেও ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকতে হয়। ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল কিনে নিয়েছেন, বিনিময়ে তারা লাভ করবে জান্নাত। (আল কুরআন, সূরা আত তাওবা : ১১১ আংশিক)।
আত্মশুদ্ধি ও পশুত্ব বিসর্জন : কুরবানি শুধুমাত্র একটি পশু জবাই নয় বরং এটি নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তি, অহংকার ও লোভকে বিসর্জন দেয়ার আধ্যাত্মিক প্রতীক। পশুর রক্ত এখানে পবিত্রতা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম।
‘আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ (সূরা হজ¦ : ৩৭ আংশিক)।
আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য : কুরবানি হলো আল্লাহর আদেশের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ । এটি ঈমানকে দৃঢ় করে এবং স্রষ্টার প্রতি অবিচল বিশ্বাস স্থাপন করতে শেখায়। ‘বল, আমার সালাত, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর উদ্দেশে। তার কোনো শরীক নেই এবং আমি এটাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে আমিই প্রথম।’ আল কুরআন, সূরা আন’আম : ১৬২-১৬৩)।
বস্তুত ঈদ উল আযহা হলো, ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। ভোগ নয়, বরং ত্যাগের মধ্যেই জীবনের প্রকৃত আনন্দÑ এই দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করা।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় কুরবানির এই দর্শনই বিধৃত হতে দেখি।
‘তোরা ভোগের পাত্র ফেলরে ছুঁড়ে
ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ।
অথবা
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন,
আজি আল্লাহর নামে জান কোরবানে
ঈদের পূত বোধন।
ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন।
পরিশেষে বলবো, ঈদ উল আযহা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নৈকট্য হাসিল, সামর্থ্য থাকার শর্তে কুরবানি করা এবং আল্লাহর হুকুম মেনে জীবনযাপন করার শিক্ষা দেয়। কুরবানির তাৎপর্য ও শিক্ষা মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ বা উৎসব।
লেখক:
সাংবাদিক