সাইদুর রহমান

মা ফোন দিয়ে বলল, আবির ঈদে বাড়ি আসবি না। আমি বললাম, ছুটি পেলে আসব।

মা বলল, কতদিন হয়ে গেল তোকে দেখি না। পারলে বাড়িতে আসিস।

মা আমিও তো তোমাকে দেখি না। তোমাকে দেখতে আমারও খুব ইচ্ছে করে। তোমাকে ছাড়া আমি একটু ভালো নেই। শুধু বাধ্য হয়ে এই ঢাকায় পড়ে আছি।

মা যখন তোমার কথা, ভাইবোনদের কথা, গ্রামের সেই ছোটবেলায় খেলাধুলা করে বেড়ে ওঠার জায়গাগুলোর কথা মনে পড়ে তখন মনে হয় সবকিছু ছেড়ে বাড়িতে তোমার কাছে, সেই খোলা মাঠে আবার ফিরে যাই। কিন্তু দারিদ্র্যর কথা যখন মনে পড়ে তখন আর ফিরে যেতে পারি না। মনে হয়, মা কত কষ্ট করে আমাকে বড় করেছে, আমার কষ্ট হলেও আমি যেন আমার মাকে কোনোদিনও কষ্ট না দিই। মা আসলে আমরা সুখের দিনগুলো কেউ মনে রাখি না। মনে রাখি শুধু কষ্টের দিনগুলো। কত কষ্ট করেছ তুমি। তোমার আমাদের নিয়ে যে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, যে কষ্ট, যে সাহস দেখেছি সেগুলো মনে হলে আজ তোমাকে শুধু শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, একটা মা কিভাবে পারে তার সন্তানের জন্য এমন কষ্ট সহ্য করতে। আসলে মা শুধুই মা। তার তুলনা হয় না।

মা আজ আর বাবা বেঁচে নেই। যখন আমি, হাবিবুর, তৃপ্তি এবং অঙ্কুর খুবই ছোট তখন মারা গেছে। বাবাকে খুবই মিস করি। কারণ বাবা আমাকে সব থেকে বেশি বাজারে নিয়ে যেতেন। যখন যেখানে যেটা দরকার বড় ভাইরা ঢাকাতে আসার পর আমাকে দিয়েই করাতেন। আর মা তুমিও বলতে আবিরকে সাথে নিয়ে যাও। ও তোমার সাথে গেলে তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। আর আমিও কিছু খেতে পারব এই আশায় আব্বার সাথে প্রায়ই বাজারসহ এখানে ওখানে যেতাম।

ছোটবেলায় ঈদের আগে বাজার করা নিয়ে আব্বার মধ্যে যেই চঞ্চলতা আমরা দেখতাম তা আজ নিভে গেছে। এবার বাড়িতে গিয়ে আব্বাকে দেখেছি সারা দিন জানালা দিয়ে বাইরে শূন্যে তাকিয়ে থাকতে। জানি না আব্বা আসলে শূন্যে কি দেখতেন। হয়তো অতীতের রঙিন দিনগুলোর কথা ভাবতেন। সেই অসহায় আব্বার সহায়ও এখন তুমি মা।

তারপর বাবা হঠাৎ ক্যান্সারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হলেন। দীর্ঘদিন রোগে ভুগে একদিন বাবা মারা গেলেন। আমরা সব ভাইবোনরা পড়লাম আকুলপাথারে। আব্বার মৃত্যু আমাদের সবাইকে অভিভাবকহীন করে দিল। আব্বার মৃত্যুতে মা হয়ে গেল আরও নিঃসঙ্গ। মার ওপর এসে পড়ল সংসারের সব দায়িত্ব। আমাদের লেখাপড়া থেকে শুরু করে সমস্ত সংসারের হাল ধরল মা। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আমাদের লেখাপড়া শেখালো। বড় করল। কিন্তু কখনো আমাদের গায়ে একটা ফুলের টোকাও লাগতে দিল না। সব কাটার আঘাত নিজে সয়ে, আমাদের আগলে রাখল আঁচল দিয়ে। তোমার তুলনা মা তুমি নিজে।

মাগো, তোমার ছেলে আর এখন ঈদ আসলে বাজারে যায় না। ঢাকার এই গ্রীষ্মকালীন দীর্ঘ সময়ের তপ্ত গরমে শুকনো গলায় কষ্ট পেলেও কেউ আদর করে বলে না, বেশি কষ্ট হচ্ছে বাবা? কষ্ট বেশি হলে আজ আর অফিসে যাওয়ার দরকার নেই।

মনে পড়ে মা, মাঝে মাঝে আমি ঘুমের মধ্যে চোখ বন্ধ করেই তোমার সামনে বসে থাকতাম আর তুমি ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিতে। আমি খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে গেলে, সেই আধো খাওয়া এঁটো ভাতই হতো তোমার তৃপ্তির আহার। তুমি সুন্দর করে ভাত মাখাতে পারতে। তোমার সেই হাতে মাখা ভাত কতদিন হলো খায়নি।

মনে পড়ে মা আমার প্রায়ই রাত একটা-দেড়টার দিকে ঘুম ভেঙে যেত। আমার ঘর তখনো অন্ধকার থাকত। পাশের ঘর পেরিয়ে একটু দূরেই ছিল আমাদের রান্নাঘর। আধো ঘুমে তখনো রান্নাঘর থেকে হাঁড়ি পাতিলের শব্দ শুনতে পেতাম। বুঝতে পারতাম তুমি তখনো ঘুমাওনি। তোমার কষ্টটা অনুভব করতে পারিনি কখনো। ভেবেছি, মায়েরা এমনই হয়। আমায় ক্ষমা করে দিয়ো মা। বিশ্বাস করো আমি এখন সব বুঝি। মাঝরাতে না ঘুমিয়ে পাতিল মাজা থেকে শুরু করে প্লেট মাজার কষ্ট। আমি সবই এখন করি।

মাগো তুমি তো জানো, আমি ঢাকায় চাকরি করি। এখানে সপ্তাহে অফিস করি সাত দিন। ছুটি নেই একদিনও। তুমি বিশ্বাস করবে না মা, একটু ছুটি পাবো এজন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করি। কিন্তু তুমিও তো ছুটি পেতে না মা। সপ্তাহের সাতটি দিনই তুমি পরিবারের ডিউটি করতে। তাও কোনো নির্দিষ্ট টাইম-টেবিল ছিল না। চব্বিশটা ঘণ্টা তুমি ডিউটি করেছ। কীভাবে পারতে তুমি? অসুখ-বিসুখেও দেখেছি তোমার রান্নার কোনো বিরতি থাকত না। হাতে গরম পানির ছ্যাঁকা লাগত, তেল ছিটিয়ে পড়ে তোমার হাত পুড়ে যেত। আমার মনে আছে, তুমি পোড়া জায়গাটি পানিতে ডুবিয়ে রাখতে। আমি তোমার দেখাদেখি কাটা জায়গায় একদিন পানি দিয়েছিলাম, খুব যন্ত্রণা হয় মা। এটা খুব কষ্টের।

মনে আছে মা? আমরা যখন খাওয়ার সময় গোল হয়ে বসতাম। আমি, আব্বা, হাবিবুর, তৃপ্তি খাবার খেতে বসতাম খাটের ওপরে আর তুমি, বড় আপা, ভাবী, মেঝেতে মাদুর পেতে বসতে। কিন্তু তোমার খাবারগুলো আমাদেরকে ভাগ করে দিতে।

জানো মা এখন আর বাসায় খাবার খেতে পারি না। প্রতিদিনই বাইরে খাবার খেতে হয়। কোনোদিন রাত এগারোটা, কোনোদিন রাত বারোটায় বাসায় ফিরি। ফিরে দেখি সবাই ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু শুধু ঘুমায় না কাইফ। ও আমাকে না দেখে ঘুমাতেই পারে না। তারপর বাথরুমে ফ্রেস হয়ে কোনোদিন কিছু খেতে ইচ্ছে করলে খায় কোনোদিন খায় না। না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ি।

মা তোমার এখন বয়স হয়েছে। মাগো তুমি এখন অনেক রোগে আক্রান্ত।

মাগো, রান্নাঘর থেকে তুমি ছুটি নিয়েছ। আল্লাহ তোমায় বাধ্য করেছেন ছুটি নিতে। আমি জানি, তুমি ছুটি নিতে চাওনি। তোমার বুকের হাহাকার আমি দূর থেকে এই শক্ত ইট-পাথরে ঢাকা শহরে থেকে টের পাই। তোমাকে মাঝরাতে আর খাবার রান্না করতে হয় না। বাসায় আজ আমরা কেউ নেই। শুধু তুমি আর বড় ভাই-ভাবী।

খেতে বসে আজ তুমি একটুও আনন্দ পাও না। নীরবে কাঁদো। আমি টের পাই মা। জানি না মা, বড় ভাবী আজ তোমাকে কি রান্না করে খাওয়াচ্ছে।

বারবার তোমার কাছে যেতে ইচ্ছে করে মা। কিন্তু অফিসের ব্যস্ততার জন্য পারি না। এই অপারগতাকে তুমি ক্ষমা করো। আল্লাহর অশেষ রহমতে ভালো থেক। শুধু দোয়া করবে আমাদের জন্য। যেন আমরা তোমার এবং আব্বার দেখানো আদর্শ থেকে একটুও দূরে সরে না যাই।