ড. ইমদাদুল হক হেলালী

ইসলামে বাৎসরিক দু’টি উৎসবের দিন। একটি হলো ঈদুল ফিতর অন্যটি ঈদুল আজহা। ঈদুল আযহাকে আবার কুরবানির ঈদ বা বকরা ঈদও বলা হয়। ঈদুল আযহায় প্রধানত দু’টি ইবাদত। প্রথমতÑঈদুল আযহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামায জামাআতের সাথে আদায় করা এবং দ্বিতীয়ত-কুরবানির পশু যবেহ করা। এজন্য কুরবানি ঈদুল আযহার অন্যতম একটি অনুষঙ্গ। এ পর্যায়ে কুরবানির পরিচয়, ইতিবৃত্ত, বিবিবিধান, ফজিলত ও তৎপ্রাসঙ্গিক আলোচনা উপস্থাপন করা হলো:

কুরবানির পরিচয় : ‘কুরবানি’ আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ নৈকট্য, Nearness, Proximity। (আল-কামুসুল ওয়াযিজ, পৃ. ২৮৭) যেহেতু কুরবানির মাধ্যমে আল্ল¬াহ্র নৈকট্য লাভ হয়, তাই একে কুরবানি নামে অভিহিত করা হয়। ইসলামী শরীয়াহ’র পরিভাষায়Ñ আল্ল¬াহ্র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট মাসের নির্দিষ্ট দিনসমূহে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সাহেবে নিসাব ও সক্ষম ব্যক্তি কর্তৃক হালাল পশু যবেহ করাকে ‘কুরবানি’ বলা হয়। জ্ঞাতব্য যে, ১০ই জিলহজ্জ ঈদুল আযহার দিনÑঈদুল আজহার দুই রাকআত ওয়াজিব নামায জামা‘আতের সাথে আদায় করার পর ঐ দিন ও তৎপরবর্তী তিন দিন অর্থাৎ জিলহজ্জের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ সাহেবে নিসাব বা শরীআহ্ অনুযায়ী কুরবানি প্রদানে সক্ষম ব্যক্তি কর্তৃক আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে হালাল পশু যাবেহ করাকে কুরবানি বলা হয়।

কুরবানির ইতিবৃত্ত: মানব ইতিহাসের প্রারম্ভ থেকেই কুরবানির বিধান সূচিত হয়েছে। সকল নবী ও রাসূলগণের জামানায় কুরবানির বিধান ছিল। যেমন পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আদম (আ.)-এর ঔরসজাত পূত্রদ্বয় হাবিল ও কাবিলের প্রদত্ত কুরবানিই মানব ইতিহাসের প্রথম কুরবানি। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “আর আপনি তাদের নিকট আদমের দুই পুত্রের সংবাদ যথাযথভাবে বর্ণনা করুন, যখন তারা উভয়ে কুরবানি পেশ করল।” (আল-কুরআন, ৫:২৭) এরপর হযরত নূহ (আ.)-এর জামানায় কুরবানির বিধান ছিল। তিনি কুরবানি করার জন্য একটি কুরবানিগাহ্ নির্মান করেছিলেন। (ঈদুল আজহা ও আমাদের কুরবানী, পৃ. ২) মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ.)-কে তাঁর প্রিয় পূত্র ইসমাঈল (আ.)-কে কুরবানি করার ঘটনাও পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। যেমন ইবরাহীম আ. বলেন, “হে প্রিয় পুত্র, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি।” (আল-কুরআন, ৩৭:১০২) এরপর হযরত মূসা (আ.)-এর যামানায় কুরবানির বিধান ছিল। যেমন: “আর স্মরণ করুন, যখন মূসা তাঁর কওমকে বললেন, নিশ্চয় আল্ল¬াহ্ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা একটি গাভী যবেহ করবে।” (আল-কুরআন, ২:৬৭। সর্বোপরি হিজরি দ্বিতীয় সালে মুহাম্মদ সা.-এর উম্মতের ওপরও নামাযের সঙ্গে কুরবানির বিধান প্রবর্তিত হয়।

কুরবানির বিধান : কুরবানি করা ওয়াজিব। দলীল হলোÑপবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “অতএব আপনার রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড়ুন এবং কুরবানি করুন।” (আল-কুরআন, ১০৮:২) রাসূলুল্ল¬াহ্ (সা.) বলেছেন, কেউ যদি সামর্থ থাকা সত্ত্বেও কুরবানি না করে; তবে সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেই না আসে। (সুনান ইব্ন মাজাহ, হাদীস নং ৩১২৩)

কুরবানি ওয়াজিব হবার শর্তাবলি : সুনির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে পুরুষ ও নারী উভয়ের ওপর কুরবানি ওয়াজিব হয়। তাহলো: (১) মুসলিম হওয়া (২) সুস্থ মস্তিস্ক সম্পন্ন হওয়া (৩) বালেগ হওয়া (৪) মুকীম হওয়া (৫) সাহেবে নিসাব ও সক্ষম হওয়া। (৬) স্বাধীন হওয়া। ইমাম আবুল হাসান আল-কুদুরী (রহ.) বলেন, আযাদ মুসলিম, মুকীম (মুসাফির নয়) এবং কুরবানির দিনে বিত্তশালী অর্থাৎ সাহেবে নিসাব পরিমাণ মালের মালিক এ জাতীয় ব্যক্তির ওপর তার নিজের পক্ষ হতে এবং নিজের নাবালক সন্তানদের পক্ষ হতে কুরবানি করা ওয়াজিব। (আল-হিদায়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ১৩৯)

যে পশু কুরবানি করা যায়েজ নয় : যে পশু কুরবানি করা যায়েজ নয় সে পশুর বিবরণ হাদীসে এসেছে, ‘উবায়দ ইব্ন ফিরূয হযরত বা’রা ইব্ন আযিব (রা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্ল¬াহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কুরবানির জন্য কোন কোন পশু হতে বেঁচে থাকা উচিত? তিনি তাঁর হাত ইশারা করে বললেন, চার প্রকার পশু হতে। হযরত বা’রা (রা.)-ও তাঁর হাত দ্বারা ইশারা করতেন এবং বলতেন, আমার হাত রাসলুূল্ল¬াহ (সা.) এর হাতের চেয়ে খাটো। চার প্রকার হলো: (১) খোঁড়া পশু, যার খোঁড়া স্পষ্ট; (২) অন্ধ পশু, যার অন্ধত্ব স্পষ্ট; (৩) রোগাক্রান্ত পশু, যার, রোগ স্পষ্ট; (৪) এমন দুর্বল পশু, যার হাড় মজ্জা শূন্য। (তাহাবী শরীফ, চতুর্থ খণ্ড, হাদীস নং ৫৭৩) আরেকটি হাদীসে বর্ণিত আছে, শুরাহ্ ইব্ন নু’মান হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণনা করেন, যে পশুর সম্মুখ দিক দিয়ে কান কাটা, তার কুরবানি যায়েজ নয়। আর যে পশুর কানের নিচের দিকে কাটা, তারও কুরবানি যায়েজ নয়। আর এমন পশুও কুরবানি যায়েজ নয় যার কান গোলাকারে, লম্বাকারে কাটা হয় এবং এমন পশুও যায়েজ নয়, যে পশু অন্ধ ও কানা। (তাহাবী শরীফ, চতুর্থ খণ্ড, হাদীস নং ৫৭৩৬)

কুরবানির পশুর বয়স : নবী করীম (সা.) বলেছেন, তোমরা ‘ছানায়া’ পর্যায়ের পশু কুরবানি করবে। কিন্তু তোমাদের কারো জন্য যদি এরূপ পশু কুরবানি করা কঠিন হয়, তবে সে যেন ‘জাযা’ কুরবানি করে। এখানে ‘ছানায়া’ হলো: ভেড়া ও বকরীর এক বছরী বয়সের বাচ্চা, গরুর দুই বছরের, বাছুর আর উটের পাঁচ বছর বয়সের বাচ্চাকে ‘ছানায়া’ বলা হয়। গরুর মধ্যে মহিষও শামিল। (আল-হিদায়া, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫১) আর ‘জাযা’ হলো, ঐ ভেড়ার বাচ্চাকে বলা হয়, যার বয়স ছয় মাস পূর্ণ হয়ে গেছে। ইমাম যা‘আফরানী (রহ.) বলেন, সাত মাসের বাচ্চাকে ‘জাযা’ বলা হয়। (আল-হিদায়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ১৫১)

অন্যের পক্ষ হতে কুরবানি: অন্যের পক্ষ হতে কুরবানি করা যায়েজ। যা আমরা রাসূলুল্ল¬াহ্ (সা.) এর আমল থেকে পাই; যেমন হাদীসে এসেছে, হযরত জাবির (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (সা.) নিজ হজ্জে তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ হতে একটি গরু কুরবানি করেছিলেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫১৩)

ভাগে কুরবানির বিধান : ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ও মেষ জাতীয় পশু একটি পশু একটি কুরবানি সাব্যস্ত হবে। তবে উট, গরু ও মহিষ জাতীয় পশুর কুরবানির ক্ষেত্রে একটি পশু সাত জনের পক্ষ থেকে জবেহ করা যাবে। এ বিষয়ে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, আমর ইব্ন দীনার ও আবূ-যুবাইর হযরত জাবির (রা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, একবার আমরা রাসূলুল্ল¬াহ্ (সা.)-এর সঙ্গে সাতজনের পক্ষ হতে একটি উট জবেহ করলাম। অতঃপর হযরত জাবির (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, গরু কয় জনের পক্ষ হতে যবেহ করা যায়? তিনি বললেন, গরুরও উটের মতই (সাতজনের পক্ষ হতে যাবেহ করা যায়)। আর জাবির (রা.) হুদায়বিয়ার বছর উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, আমরা সেদিন সত্তরটি উট যবেহ্ করেছিলাম। (তাহাবী শরীফ, চতুর্থ খণ্ড, হাদীস নং ৫৭৫৯) অন্য হাদীসে এসেছে, মানসূর রিবাঈ (রা.) হতে বর্ণনা করেন মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবাগণ বলতেন, গরু সাত ব্যক্তির পক্ষ হতে যবেহ্ করা যাবে। (তাহাবী শরীফ, চতুর্থ খণ্ড, হাদীস নং ৫৭৭৪)

কুরবানির পশুর গোশত ও চামড়ার বিধান : কুরবানির পশুর গোশত ও চামড়ার বিধান সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, হযরত আলী ইব্ন আবি তালিব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) আমাকে তাঁর কুরবানির উটগুলোর তত্ত্বাবধান করতে নির্দেশ দেন এবং এর গোশত, চামড়া ও ঝুল-আবরণ সদকা করে দিতে বলেন। আর কসাইকে যেন কুরবানির কোনো অংশ মজুরি হিসেবে না দিই, এ নির্দেশও দেন। তিনি বলেন, আমরা তাকে আমাদের পক্ষ থেকে (আলাদা) পারিশ্রমিক দেব।” (সহীহ আল-বুখারী, হাদীস নং ১৭১৬, ১৭১৭) তবে আমাদের সমাজে কুরবানির গোশত তিন ভাগ করা হয়। এক ভাগ নিজের পবিরারের জন্য, দ্বিতীয় ভাগ আত্মীয়-স্বজনদের জন্য আর তৃতীয় ভাগ এলাকার ফকীর ও মিসকীনদের জন্য।

ঈদের নামাজের আগে কুরবানি না করা : ঈদের নামাজের আগে কুরবানি না করা বিষয়ে হাদীসে বর্ণিত আছে, জুন্দুব ইব্ন আবদুল্ল¬াহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন নবী (সা.) ইরশাদ করেন, ঈদুল আযহার নামাযের পূর্বে যে ব্যক্তি কুরবানির পশু যবেহ করেছে, সে যেন তার স্থলে পুনরায় যবেহ্ করে। আর যবেহ করে না থাকলে সে যেন নামায বাদ যবেহ্ করে। (তাহাবী শরীফ, চতুর্থ খণ্ড, হাদীস নং ৫৭৫০)

কুরবানির দিনে কুরবানি দাতার করণীয় : কুরবানির দিনে কুরবানি দাতার করণীয় প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে, সাঈদ ইব্নুল মুসায়্যিব হযরত উম্মে সালমা (রা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি যিলহজ্জ্ মাসের চাঁদ দেখে কুরবানি করার ইচ্ছা করবে, সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে যাবত না সে কুরবানি করবে। (তাহাবী শরীফ, চতুর্থ খণ্ড, হাদীস নং ৫৭৮৮)

কুরবানির ফজিলত: কুরবানির গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশ্ত ও রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” (আল-কুরআন, ২২:৩৭) এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কুরবানির দিনে আদম সন্তানের কোনো আমল আল্লাহর নিকট কুরবানির রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে বেশি প্রিয় নয়। (সুনান আত-তিরমিযি, হাদীস নং ১৪৯৩) পশু যবেহের এ নজরানা পেশ করার মাধ্যমে তাকওয়া লাভই হলো কুরবানির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

লেখক:

ইসলামিক স্কলার, রিসার্চ ফেলো