ড. মুহাম্মদ নুরউদ্দিন কাওছার

গ্রামের সেই রাতটি কেটেছিল এক অপার্থিব আবেশে। প্রভাতের আলো তখনও পূর্ণতা পায়নি; পূর্ব দিগন্তে মৃদু রক্তিম আভা, যেন প্রকৃতি নীরবে বয়ে আনছে এক গভীর বার্তা ত্যাগ, আত্মসমর্পণ আর অনন্ত ভালোবাসার। দূর থেকে ভেসে আসা গরুর ঘণ্টাধ্বনি, মাঝে মাঝে কুকুরের স্বর, আর মসজিদের মাইকে আজানের প্রতীক্ষা সব মিলিয়ে চারপাশে তৈরি হয়েছিল এক শান্ত, তবু ভাবগম্ভীর আবহ। নগরের নিরন্তর ব্যস্ততায় অভ্যস্ত আমার কাছে এই নীরবতা ছিল নতুন, অথচ অপরিচিত নয়; বরং বহুদিন হারিয়ে যাওয়া এক অন্তর্লোকের অনুভূতির পুনরাবিষ্কার যেন।

পাখিদের মৃদু কূজন, শিশিরস্নাত ঘাসের সতেজ স্পর্শ, আর দূর মসজিদ থেকে ভেসে আসা তাকবিরের ধ্বনি সব মিলিয়ে চারপাশে গড়ে উঠেছিল এক অনির্বচনীয় আবহ। আজ ঈদুল আযহা; তবু এই ঈদ যেন অন্যসব দিনের তুলনায় ভিন্নতর কারণ এর আনন্দের অন্তরালে লুকিয়ে থাকে গভীর উপলব্ধি, অনন্য এক ত্যাগের শিক্ষা। প্রভাতের পূর্বমুহূর্তে নেমে আসা সেই নিবিড় নীরবতা যেন মানুষের অন্তর্লোকে প্রবেশের এক অপূর্ব দ্বার উন্মোচন করে। ঈদুল আযহার সেই পবিত্র ভোরে আমি প্রথম অনুধাবন করেছিলাম ত্যাগ কেবল বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আত্মার গভীরে জেগে ওঠা এক মহিমান্বিত জাগরণ।

ভোরের আলো ফোটার আগেই উঠোনে গিয়ে দেখি দাদা নীরবে আকাশপানে চেয়ে বসে আছেন; তার চোখে যেন সময়ের অসংখ্য স্তর জমাট বেঁধে আছে। এদিকে পূর্বাকাশে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে রক্তিম আভা, নিঃশব্দে জেগে উঠছে নতুন এক প্রভাত।

আমি পাশে গিয়ে বসতেই তিনি বললেন,

“ দেখেছিস, আকাশটা কেমন লাল হয়ে উঠছে? এই রঙটা শুধু সূর্যের নয় এটি ত্যাগের রঙ।”

আমি হালকা বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলাম, “ত্যাগেরও আবার রঙ হয় নাকি?”

দাদা মৃদু হেসে বললেন, “যে হৃদয় দিয়ে ত্যাগ করা হয়, সেই হৃদয়ের রঙই তো এতে মিশে থাকে।”

“যে মানুষ কখনো কিছু ছাড়েনি, সে বুঝবে না। ত্যাগের একটা নিজস্ব আলো আছে, আর সেই আলো অনেক সময় লাল হয়ে ওঠে কারণ তাতে থাকে হৃদয়ের রক্তিম স্পর্শ।”

তার কথার গভীরতা তখন পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারিনি, কিন্তু কোথাও যেন গেঁথে গেল।

ঈদের দিন মানেই এতদিন আমার কাছে ছিল আনন্দ, নতুন পোশাক আর নানান আয়োজনের সমাহার। কুরবানি যেন কেবল একটি প্রথা যার সঙ্গে অনুভবের গভীর যোগ খুব একটা ছিল না। কিন্তু সেই দিনটি ছিল ভিন্ন।

সেই বছর, সেই গ্রাম, সেই ভোর সবকিছু যেন নিঃশব্দে এক নতুন অর্থে রূপ নিতে শুরু করল।

উঠোনে বাঁধা সাদা-কালো মিশ্র রঙের গরুটিকে ঘিরে চাচাতো ভাই নকিবের ব্যস্ততা ছিল সত্যিই লক্ষণীয়। কখনো সে গরুটির গলায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, কখনো বা তার পাশেই নিঃশব্দে বসে থাকছে মনে হচ্ছিল, তাদের মাঝে অদৃশ্য এক মমতার বন্ধন গড়ে উঠেছে।

আমি মৃদু হাসিতে বললাম, “এত আদর করছিস কেন? ওকে এত ভালোবাসিস কেন? জানিস তো, আজই ওকে কুরবানি দেওয়া হবে?”

নকিব থেমে গেল। তার ছোট্ট মুখটা কেমন গম্ভীর হয়ে উঠল।

“জানি,” সে বলল, “তাই তো বেশি করে আদর করছি।”

“ কেন?” আমি অবাক হলাম।

সে নিচু গলায় বলল,

“যাতে ও কষ্ট না পায়।”

এই সরল উত্তর আমাকে যেন নিঃশব্দে আঘাত করল। আমরা যারা বড়, আমরা অনেক কিছু বুঝি কিন্তু অনুভব করি কতটুকু?

কিছুক্ষণ পর দাদা এসে নকিবের মাথায় হাত রাখলেন।

“তুই কাঁদবি?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

নকিব একটু ভেবে বলল,

“হয়তোৃ কিন্তু আমি জানি, এটা আল্লাহগ ল্প

র জন্য।”

দাদা মৃদু কণ্ঠে বললেন,

“কুরবানি শুধু পশুর নয়; এটি মানুষের নিজের অন্তরের অশুদ্ধতা ত্যাগ করার শিক্ষা।”

তারপর মাথা নেড়ে ধীরে যোগ করলেন, “এই ‘জানাটাই’ আসল কথা। তবে মনে রাখিস কুরবানি কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি নিজের ভেতরের কোনো প্রিয়, কিন্তু অনুচিত আসক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার সাধনা।”

দাদার এই কথাগুলো শুনে মনে হলো চারপাশের সবকিছু যেন নিঃশব্দে বদলে যেতে শুরু করেছে।

তারপর তিনি আমার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

“তুই কি কিছু কুরবানি করতে পারিস?”

প্রশ্নটি ছিল সরল, অথচ তার অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল বিস্তৃত ও জটিল। আমি নীরব হয়ে গেলাম। মনে হলো, আমার ভেতরে যেন অদৃশ্য এক তালিকা খুলে বসেছে অহংকার, স্বার্থপরতা, অলসতা, অব্যক্ত কষ্ট, অপ্রকাশিত দুঃখৃ কিন্তু এগুলোর কোনোটি কি আমি সত্যিই ত্যাগ করার মতো প্রস্তুত?

কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না। উপলব্ধি করলাম প্রশ্নটি যতটা সহজ শোনায়, তার উত্তর দেওয়া ততটাই সাহসের ব্যাপার। কারণ নিজের অহংকার, স্বার্থপরতা কিংবা মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা দুঃখ এসব ত্যাগ করা কি সত্যিই এত সহজ?

তাকবিরের ধ্বনি চারদিকে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল

“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবারৃ”

এই ধ্বনি যেন কেবল আকাশে নয়, অন্তরের গভীরেও অনুরণিত হচ্ছিল।

কুরবানির মুহূর্তটি ছিল গভীর তাৎপর্যে পূর্ণ। সেই ক্ষণে আমি দৃষ্টি সরাতে পারিনি—যা আগে ছিল নিছক একটি দৃশ্য, আজ তা রূপ নিল এক গভীর প্রতীকে। মনে হচ্ছিল, এই ত্যাগের মধ্য দিয়েই মানুষ নিজস্ব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার সাধনায় ব্রতী হয়।

এটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; বরং আত্মসমর্পণ, অটল বিশ্বাস ও ত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক। সেই দৃশ্য আমাকে যেন নতুন এক দৃষ্টিতে ভাবতে শিখাল নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার পথ দেখাল।

কুরবানি শেষ হওয়ার পর মাংস ভাগ করা শুরু হলো। দাদা নিজে দাঁড়িয়ে তদারকি করছিলেন কে পেল, কে পেল না। দরিদ্র প্রতিবেশীদের বাড়িতে মাংস পৌঁছে দিতে গিয়ে আমি প্রথমবার অনুভব করলাম, ‘দেওয়া’ শব্দটার ভেতরে কতটা আলো লুকিয়ে আছে। অন্যকে দেওয়ার আনন্দ।

এক বৃদ্ধা, যার ঘরে আমরা মাংস দিয়ে এলাম, আমার হাত ধরে বললেন,

“আল্লাহ তোদের ভালো রাখুক বাবা।”

তার চোখে পানি ছিল, কিন্তু সেই পানি দুঃখের না- কৃতজ্ঞতার।

ফিরে আসার পথে আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম, এই ঈদের আনন্দ শুধু নিজের ঘরে সীমাবদ্ধ না; এটি ছড়িয়ে পড়ে অন্যের জীবনে, অন্যের মুখে হাসি হয়ে ফুটে ওঠে।

বৃদ্ধা যখন কৃতজ্ঞতায় ভেজা চোখে দোয়া করলেন, তখন উপলব্ধি করলাম ত্যাগের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই।

বাড়িতে ফিরে দেখি নকিব চুপচাপ বসে আছে। তার চোখে অশ্রুর চিহ্ন, কিন্তু মুখে প্রশান্তি।

আমি পাশে বসতেই সে বলল,

“ভাইয়া, আমি একটু কেঁদেছিৃ কিন্তু এখন ভালো লাগছে।”

“কেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

সে বলল, “কারণ আমি ভাবছি, আল্লাহ খুশি হয়েছেন।”

এই সরল বিশ্বাসের শক্তি আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল। আমরা বড় হতে হতে অনেক হিসাব শিখি, কিন্তু এই বিশ্বাস কোথায় যেন হারিয়ে ফেলি।

বিকেলের দিকে দাদা আবার আমাকে ডাকলেন।

“আজ কী শিখলি?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম,

আমি ধীরে বললাম, “শিখলাম, ত্যাগ আসলে খুব কঠিনৃ কিন্তু খুব সুন্দরও।”

দাদা মৃদু হেসে বললেন, “ঠিক তাই। ত্যাগ মানুষকে ভাঙে না; বরং তাকে নতুনভাবে গড়ে তোলে।”

তারপর তিনি মাথা নেড়ে আরও নরম কণ্ঠে যোগ করলেন,

“ত্যাগ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং তাকে এক গভীর পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়।”

সূর্য তখন পশ্চিমাকাশে ধীরে ধীরে হেলে পড়েছে। তবু আমার অন্তরে তখনও অম্লান সেই ভোরের রক্তিম আভা। মনে হচ্ছিল, সেই প্রভাত কেবল একটি দিনের সূচনা ছিল না—তা ছিল আমার ভেতরে এক নতুন যাত্রার, এক গভীর উপলব্ধির জন্ম।

সেই দিন থেকে আমি নিজেকে বদলানোর এক নীরব প্রয়াসে নেমেছি। প্রতিদিন কিছু না কিছু ত্যাগ করার চেষ্টা করি—হয়তো বড় কিছু নয়, কিন্তু ছোট ছোট বিষয়: সামান্য অহংকার, ক্ষণিক রাগ, কিংবা অল্প স্বার্থপরতা। প্রতিদিন ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের নেতিবাচকতাকে বিসর্জন দেওয়ার সাধনা করি।

হয়তো এসব ক্ষুদ্র ত্যাগ, কিন্তু প্রতিটি ছোট ত্যাগই যেন এক একটি নতুন প্রভাতের জন্ম দেয়। কারণ আমি এখন অনুধাবন করি—প্রতিটি ত্যাগই এক একটি নতুন ভোরের সূচনা করে। আর সেই ভোর নীরবে, অদৃশ্যভাবে, এক অনন্য আলো ও গভীর সৌন্দর্যে আমাদের জীবনকে রাঙিয়ে তোলে এক অপূর্ব রঙে।

সেই রঙ—ত্যাগের রঙ।

লেখক :

ব্যাংকার,নির্বাহী সম্পাদক, দ্বিমাসিক আল-মাকতাব, ঢাকা