ঈদ কথাটি শুনলেই মনের ভেতর নিশ্চয়ই একটা বর্ণিল উৎসবের ছবি ভেসে ওঠে। সবার আগে নতুন চাঁদ দেখার মিশন , চাঁদরাতে হৈহুল্লোড়, নতুন জামা, বাড়ি ফেরা , ইচ্ছেমত খাওয়া আর সালামি আদায় কিংবা সালামি থেকে বাঁচতে পালিয়ে বেড়ানো এবং ঈদুল আযহা উপলক্ষে দুই এক দিন আগে কুরবানির পশু ক্রয় করার ঝামেলায় নিজেকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি এক আনন্দেরও বটে। কিন্তু গোটা বিশ্বজুড়ে নিশ্চয়ই ঈদের চিত্র এমনটা নয়, দেশে দেশে রয়েছে নিজস্ব ঈদ সংস্কৃতি , তবে আনন্দের বিষয়টি একই সূত্রে গাঁথা।

কোনো কোনো দেশে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর উদ্দেশ্যে যে ভাষা ব্যবহার করা হয় তা হচ্ছে আস সাল্লাহ, যার অর্থ সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো। আর স্রষ্টাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে নতুন পোশাক পরে প্রতিটি পরিবারের নারী-পুরুষ ছেলে-বুড়ো সবাই মিলে ঈদের সকালে নামাযে যায়, যা স্থানীয় ভাষায় ‘দুরবার’ নামে পরিচিত।

আফ্রিকান দেশ নাইজেরিয়া অনেকটা আমাদের দেশের মতোই ঈদের জামা কাপড় কেনাকাটা করে থাকে। বাংলাদেশের মতোই রমযানের প্রথম সপ্তাহেই মেয়েরা নতুন কাপড় কিনে ফেলে এবং পরের তিন সপ্তাহ ধরে সব দর্জির দিন কাটে চূড়ান্ত ব্যস্ততায়। আমাদের দেশে গৃহিণীরা ঈদের আগে রাতভর ঈদের রান্না নিয়েই ব্যস্ত থাকেন বিশেষ করে বিভিন্ন পদের মিষ্টান্ন সামগ্রী তৈরি করে থাকেন। ঈদের দিন মেয়েদের পোশাক অসম্ভব উজ্জ্বল হয় যেন তারা কোন বিয়ে বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছে। পুরুষদের পোশাকেও বিশেষ করে পাঞ্জাবিতে বৈচিত্র্য দেখা যায়।

মরক্কোতে ঈদের নামাযকে স্থানীয় ভাষায় বলে মুসাল-লা। মুসাল-লা তে সবাই একসঙ্গে নামায পড়তে আসে। সাধারণত নিউক্লিয়ার পরিবারগুলো নামাযের পর দিনের প্রথম ভাগে স্বামীর বাবার বাড়িতে আর তারপর স্ত্রীর বাবার বাড়িতে বেড়াতে যায়।

নামায শেষে ঈদ উদযাপন অনেকটা ঘরোয়াভাবে বৃহত্তর পরিবারের সঙ্গে হয়ে থাকে। নামাযের পর পরিবারের সবাই একত্র হয়ে নানারকম মিষ্টি ও অন্যান্য স্বাদের খাবার গ্রহণ করে। মরক্কোর সাথে আমাদের দেশের ঈদের মিল হল ঈদের সালামি বা যেটাকে আমরা ঈদি বলে থাকি।

ঈদ সংস্কৃতিতে আমরা আরো যেটা দেখেছি মেহেদি হাতে দেওয়া বা মেহেদির ব্যবহার। গ্রামাঞ্চলে মেহেদি গাছ থেকে পাতা তুলে এনে শলিপাটায় বেটে ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। নিজের বাড়িতে মেহেদি গাছ না থাকলেও পাড়ার অন্যত্র কোন বাড়ি থেকে তা সংগ্রহ করে সন্ধ্যায় শিলপাটায় বাটা হতো এবং রাতে খাওয়ার পর তা হাতে দেওয়া হত। খুব সতর্কভাবেই রাতটা কেটে যেত যাতে করে হাত থেকে মেহেদি পড়ে না যায়। ভোর বেলায় খসখস করা হাত আস্তে আস্তে ধুয়ে ফেলা হতো। এরপর সরিষার তেল মাখা হতো ,তাতে অন্যরকম সৌন্দর্য ফুটে উঠতো। এই সংস্কৃতি শহরে এখন অন্যরূপ ধারণ করেছে। মেহেদি যেটা পাওয়া যায় তা অনেকটা কৃত্রিম। প্রাকৃতিক সেই বিষয়গুলো এখন আমাদের সমাজ থেকে উঠে যাচ্ছে।

ঈদের মাঠে আরেকটি বৈচিত্র্য ছিল যা না বললেই নয়। গ্রাম বাংলায় আগেকার দিনে ঈদের মাঠে চাল নিয়ে যেতেন অনেকেই। ঈদ ময়দানে সবুজ ঘাসের মধ্যে বিছানো লম্বা কাপড়ের মধ্যে এগুলো রাখা হতো যা গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। আসলে বিশ্বব্যাপী ঈদের নানা রকম বৈচিত্র্যের বিষয় রয়ে গেছে যা এক দেশের সাথে আরেক দেশের মিলে যায় অথবা মিলে না। তবে ঈদ সম্প্রীতির , মানুষের পরস্পরের ভালোবাসার এ বিষয়গুলো সব দেশে বিদ্যমান।

ঈদের জামাত : দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাতটি কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ময়দানে হয়ে আসছে। এই মাঠে নামায পড়তে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন মুসল্লিরা। শোলাকিয়া ময়দানের একটা মজার ইতিহাস রয়ে গেছে যা না বললেই নয়। প্রবাদ আছে ১৮২৮ সালের ঈদের জামাতে এখানে এক লাখ পঁচিশ হাজার অর্থাৎ সোয়া লাখ মুসল্লি একসাথে নামায পড়েছিলেন। ফারসি শব্দ ‘সোয়া’( সোয়া) এবং ‘লাখ’(লাখ) থেকে ‘সোয়ালাখিয়া’বা শোলাকিয়া নামের উৎপত্তি। ময়মনসিংহ জেলার তৎকালীন জেলা কালেক্টর রবার্ট ককবারন-এর স্থানীয় দেওয়ান মজিদ খান এই ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেন। দেওয়ান মজিদ খান সোয়ালাখ টাকা ওয়াকফ করে এই ঈদগাহের ব্যয়ভার নির্বাহের ব্যবস্থা করেছিলেন, এই মত প্রচলিত আছে। ওই সময়কালের প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তীতে এটি বাংলাদেশ তথা এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম এবং ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দান।

তবে কয়েক বছর ধরে শোলাকিয়ার পাশাপাশি নতুন একটি নামও শোনা যাচ্ছে, সেটি হল গোর -এ - শহীদ মাঠ। দেশভাগের পর থেকে দিনাজপুরের এই মাঠে ঈদের জামাত হচ্ছে। ঈদ জামাতের জন্য প্রস্তুত আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় ঈদগাহ মিনার ও মাঠ দিনাজপুরের গোর-এ -শহীদ। যেখানে ঈদের জামাতের জন্য সমবেত হন লাখও মুসল্লি।

ঈদের জামাতকে ঘিরে এখানে সৌহার্দ্যের পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এখানে নামায পড়লে বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে এ ধারণা থেকে অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে আসেন। দিনাজপুর শহরের মধ্যভাগে অবস্থিত ময়দানে সাত থেকে আট বছর আগেও ছোট পরিসরে ঈদের জামাত আদায় করা হত। কিন্তু ২০১৭ সালে এখানে সংস্কার কাজ স্থাপনা নির্মাণসহ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়। এরপর থেকে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদগাহ মাঠ হিসেবে পরিচিতি পায়। দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মুসল্লী এদের নামায আদায় করতে আসেন এই মাঠে।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে ছোট পরিসরে এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। ২০১৫ সালে জেলা পরিষদের অর্থায়নে ঈদগাহ মিনারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালে শেষ হয়। এরপর থেকে ঈদের জামাতে লোকসমাগম বেড়েছে কয়েকগুণ। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি জেলায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে মিনারটি।

গোর-এ -শহীদ ময়দানে স্থাপিত ঈদগাহের মিনারটি তৈরি করা হয়েছে মোগল স্থাপত্য রীতিতে। এর অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে ছিল দিনাজপুর জেলা প্রশাসন। নির্মাণ কাজে ব্যয় হয়েছিল ৪ কোটি টাকা। সবুজ ঘাসে মোড়ানো মাঠের আয়তন ২২ একর। মিম্বারের উচ্চতা ৫৫ ফুট। ৫২ গম্বুজবিশিষ্ট ঈদগাহ মিনারের দুই প্রান্তে দুটি মিনারের উচ্চতা ৬০ ফুট। মাঝের দুটির উচ্চতা ৫০ ফুট ও টাইলস করা মিম্বারের উচ্চতা ৪৭ ফুট। প্রতিটি গম্বুজে রয়েছে বৈদ্যুতিক বাতি। মসজিদে নববী , কুয়েত, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের স্থাপত্যশৈলীর আদলে তৈরি করা হয়েছে মিনারগুলো।

ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ মাঠের নাম নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে। জেলার কয়েকটি ইতিহাসগ্রন্থ থেকে জানা যায়, এ মাঠের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর উত্তর ফ্রন্টের সমাবেশ হয়েছিল। পরে মাঠটি সেনাবাহিনীর নামে রেকর্ড ভুক্ত হয়।

জানা যায়, পারস্য থেকে এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে এসে মৃত্যুবরণ করেন শাহ আমির উদ্দিন ঘুরি (রহ.)। পরে মাঠসংলগ্ন স্থানে তাকে দাফন করা হয়। আমির উদ্দিন ঘুরি ঘোড়ায় চড়ে দিনাজপুরে ইসলাম প্রচার করেন। সে জন্য এ মাঠের নামকরণ করা হয়েছে গোর -এ -শহীদ।

আরেকটি জনশ্রুতি রয়েছে, সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহের আমলে ইসলাম প্রচার নিয়ে ৪০ জন সুফির সঙ্গে ওই সময়ের এক হিন্দু রাজার যুদ্ধ হয়েছিল। সুফিদের একজন প্রাণ হারান। সেখানেই তাকে কবর দেওয়া হয়। ফারসিতে আরবি শব্দ কবরকে বলা হচ্ছে গোর। ওই সময়কার মুসলিম শাসকের ভাষা ফারসি হওয়ায় মাঠটি পরিচিতি পায় গোর -এ -শহীদ ময়দান হিসেবে।

আয়তনের আকারে গোর-এ -শহীদ ময়দানটি বৃহৎ এতে কোন সন্দেহ নেই। সে তুলনায় শোলাকিয়া মাঠের আয়তন মাত্র সাত একর। তবে ঈদগাহ এ মুসল্লী সংখ্যা তুলনামূলক শোলাকিয়ায় বেশি নিঃসন্দেহে। নরসুন্দা নদীর তীরে শোলাকিয়ার অবস্থান। বর্তমানে শোলাকিয়ার পূর্ব প্রান্তে দো’তলা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এই ঈদগাহ মাঠটি চারপাশে উঁচু দেয়ালে ঘেরা হলেও মাঝে মাঝে ফাঁকা রাখা হয়েছে যাতে মানুষ মাঠে প্রবেশ ও বের হতে পারে। এছাড়া এ মাঠের প্রাচীর দেয়ালে কোন দরজা নেই। শোলাকিয়া মাঠে ২৬৫ সারির প্রতিটিতে ৫০০ করে মুসল্লী দাঁড়াবার ব্যবস্থা আছে। ফলে মাঠের ভেতর সব মিলিয়ে ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ মুসল্লি নামায আদায় করতে পারেন। তবে ঈদুল ফিতরের সময় দেখা যায় আশেপাশের সড়ক, খোলা জায়গা , এমনকি বাড়ির উঠানেও নামায আদায় করেন মুসল্লিরা। এভাবে সর্বমোট তিন লাখ মুসল্লী ঈদের নামায পড়ে থাকেন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের জামাতে প্রায় ছয় লক্ষাধিক মুসল্লী অংশগ্রহণ করেন। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, নামায শুরুর আগে ঐতিহ্য অনুযায়ী শর্টগানের ফাঁকা গুলির শব্দে মুসল্লিদের প্রস্তুতির জন্য সংকেত প্রদান করা হয়।

শোলাকিয়ার ইতিহাস সম্পর্কে আরো জানা যায়, ইসলামের ঐশী বাণী প্রচারের জন্য সুদূর ইয়েমেন থেকে আগত শোলাকিয়া ‘সাহেব বাড়ির’ পূর্বপুরুষ সুফি সৈয়দ আহমেদ তার নিজস্ব তালুকে ১৮২৮ সালে নরসুন্দা নদীর তীরে ঈদের জামাতের আয়োজন করেন। ওই জামাতে ইমামতি করেন সুফি সৈয়দ আহমেদ নিজেই। অনেকের মতে, মোনাজাতে তিনি মুসুল্লিদের প্রাচুর্যতা প্রকাশে ‘সোয়া লাখ’ কথাটি ব্যবহার করেন। আরেক মতে সেদিনের জামাতে এক লাখ ২৫ হাজার ( অর্থাৎ সোয়া লাখ) লোক জমায়েত হয়। আবার কেউ কেউ বলেন, মোগল আমলে এখানে অবস্থিত পরগনার রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়া লাখ টাকা। উচ্চারণের বিবর্তনে সোয়া লাখ থেকে সোয়ালাখিয়াÑ সেখান থেকে শোলাকিয়া। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালে ঈসা খা’র বংশধর স্থানীয় দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁ এই ময়দানকে অতিরিক্ত ৪.৩৫ একর জমি দান করেন।

আমরা পবিত্র ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা আনন্দ উৎসব মুখর পরিবেশে উদযাপন করে থাকি। ঈদে প্রতিবেশীসহ সমাজে আরো যারা বিত্তহীন পরিবার রয়েছে তাদের মধ্যেও এ আনন্দের ভাগ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ঈদ উপলক্ষে মনমানসিকতারও অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ঈদুল আযহা উপলক্ষে কুরবানির অর্থ হিসেবে নিজের অন্তরকেও অন্যের জন্য কুরবানি দেয়ার শিক্ষার বিষয়টি আসে। মানুষ মানুষের জন্য এগিয়ে আসা, কিছু করা , এই ধারণা কুরবানির শিক্ষা থেকে অনেকটা এগিয়ে রেখেছে আমাদেরকে। এই শিক্ষা শুধু ঈদের সময় নয় সারা বছরব্যাপী হওয়া উচিত। তাহলে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষ নিজেদেরকে অসহায় মনে করবে না । এক সময় তারাও অন্যদের সহায়তায় এগিয়ে আসবে এতে করে ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা কায়েম হতে পারে।

লেখক :

সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক