মহিব্বুল আরেফিন, রাজশাহী
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও রাজশাহীতে আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষের ওপর সংঘটিত হত্যা, গুলীবর্ষণ ও সশস্ত্র হামলার অধিকাংশ ঘটনার বিচারে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় প্রকাশ্যে ব্যবহৃত অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৫ আগস্টের পর থানা-পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের বড় অংশ উদ্ধার হয়নি। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি, অবৈধ অস্ত্রের অদৃশ্য উপস্থিতি এবং জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শহীদ পরিবার, জুলাই যোদ্ধা ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘসূত্রতায় ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি অস্ত্র উদ্ধারে ব্যর্থতা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে রাজশাহীতে দায়ের হওয়া ৩০টি মামলার মধ্যে ২১টির তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে আদালতে জমা দিয়েছে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি)। আরও দুটি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য দিতে অনীহা, নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা এবং ভিডিও ফুটেজ ও ফরেনসিক আলামত সংগ্রহে জটিলতার কারণে তদন্তে সময় লেগেছে। তবে আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন মহানগর দায়রা জজের পদ শূন্য থাকায় চার্জশিট দাখিল হলেও অনেক মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে বিচারক নিয়োগের পর মামলাগুলো ধীরে ধীরে কার্যতালিকায় এলেও দ্রুত রায়ে পৌঁছাতে আরও সময় লাগতে পারে।
সবচেয়ে আলোচিত দুটি হত্যা মামলা সাকিব আঞ্জুম ও আলী রায়হান হত্যা মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হলে গত ৩০ জুলাই আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও মহানগর আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। সাকিব আঞ্জুমের মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শী আসনা খাতুন বলেন, ৫ আগস্ট গুলীবিদ্ধ অবস্থায় সাকিব তাদের বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। এক গ্লাস পানি পান করার পরই তিনি তাদের চোখের সামনে মারা যান। সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য আজো ভুলতে পারেননি তিনি। তার ভাষায়, “দুই বছর পার হলেও এই নির্মম হত্যাকা-ের বিচার দেখতে পাইনি। যারা জড়িত, তাদের অনেকেই এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা সব শহীদের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার চাই।” ফিনল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা সাকিব আঞ্জুমের বাবা মাইনুল ইসলাম বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর বিচার দ্রুত এগোবে বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রম এখনো অত্যন্ত ধীরগতির। “আমরা প্রতিশোধ চাই না, আইনের মাধ্যমে সঠিক বিচার চাই,”- বলেন তিনি। একই হতাশার কথা জানান রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী শহীদ আলী রায়হানের ভাই রানা ইসলাম। তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া। কিন্তু চার্জশিট হলেও বিচারিক অগ্রগতি নেই। এতে শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা বাড়ছে।”
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চার্জশিট দেয়া মামলাগুলোতে প্রায় আড়াই হাজার আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ শতাধিক আসামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পলাতকদের ধরতে অভিযান চলছে। অধিকাংশ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, রাজশাহীর সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বহু নেতাকর্মী আসামী হয়েছেন।
অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনের সময় রাজশাহীর সাহেববাজার, আলুপট্টি, সোনাদীঘির মোড়, মালোপাড়া, তালাইমারী, কাজলা, বিনোদপুর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে অবস্থান করার অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের বহু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, আন্দোলনের শেষ কয়েক দিনে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি রামদা, চাপাতি, কিরিচ ও লাঠিসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাজপথে অবস্থান করলেও অন্তত ৩০ থেকে ৫০ জনের হাতে পিস্তল এবং কয়েকজনের হাতে শটগানও দেখা গেছে। সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসব অস্ত্রধারী এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যায়। এরপর অস্ত্রগুলোর আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
একই সময়ে আন্দোলন দমনে পুলিশের শর্টগান, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট, পেলেট কার্টিজ এবং কিছু ঘটনায় প্রাণঘাতী গুলী ব্যবহারের অভিযোগও উঠে। এর পাশাপাশি ৫ আগস্টের পর রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে মোট ৩৪৯টি আগ্নেয়াস্ত্র লুণ্ঠিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে হামলায় অংশ নেয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করা গেলেও ব্যবহৃত অধিকাংশ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। অস্ত্র উদ্ধারে একাধিক দফায় রিমান্ডে নেয়া হয় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার এবং যুবলীগ নেতা জহিরুল ইসলাম রুবেলকে। তদন্তকারীদের দাবি, রুবেল অস্ত্র ব্যবহারের কথা স্বীকার করলেও অস্ত্র দুটি নিজের নয় বলে দাবি করেন। তিনি জানান, মহানগর যুবলীগের এক নেতার কাছ থেকে অস্ত্র নিয়েছিলেন এবং ৫ আগস্টের পর তা ফেরত দিয়েছেন। কিন্তু অস্ত্রের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনো কার্যকর তথ্য দিতে পারেননি। ডাবলু সরকারের কাছ থেকেও অস্ত্র উদ্ধারে সহায়ক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশের তদন্তে আরো উঠে এসেছে, আলী রায়হান ও সাকিব আঞ্জুম ছোট আগ্নেয়াস্ত্রের গুলীতে নিহত হয়েছেন বলে প্রাথমিক ফরেনসিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে। ব্যবহৃত গুলীর ধরন পুলিশের প্রচলিত অস্ত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো রাজনৈতিক সংঘাত বা গণআন্দোলনে প্রকাশ্যে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র দীর্ঘ সময়েও উদ্ধার না হওয়া শুধু প্রক্রিয়ার দুর্বলতাই নয়, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্যও বড় সতর্কসংকেত। তাদের ভাষায়, এসব অস্ত্র উদ্ধার না হলে ভবিষ্যতে সেগুলো আবারো রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাস বা সংঘবদ্ধ অপরাধে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। শহীদ পরিবারগুলোর দাবি, বিচারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি আন্দোলনে ব্যবহৃত ও লুণ্ঠিত সব অবৈধ অস্ত্র দ্রুত উদ্ধার করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।