আমরা রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করি, সরকারের সমালোচনা করি। এটা অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। কারণ, তাদের সমালোচনা করার মতো অনেক বিষয় আছে। কিন্তু যারা সমালোচনা করছেন তারা কারা, তাদের পরিচয় কী? নিরীহ নাগরিকদের কথা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে যারা অঘটন ঘটাচ্ছেন, অশান্তি সৃষ্টি করছেনÑ তাদের কি সমালোচনার বাইরে রাখা যায়? এসব মানুষ কখনো বংশগত পরিচয়, কখনো ভৌগোলিক অবস্থান, কখনোবা খেলায় সমর্থনকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের ওপর দাপট দেখানোর চেষ্টা করেন। এখানে বিবেচনাবোধ কাজ করে না। ফলে সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত। অনেক সময় এ সংঘাতের ফলাফল বেশ বড় হয়ে দেখা দেয়। এ কারণেই হয়তো একটি জাতীয় দৈনিক তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে, ‘ভৈরবে স্থানীয় দ্বন্দ্বে জাতীয় দুর্ভোগ’।

২ আগস্ট মুদ্রিত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় বিরোধ কীভাবে জাতীয় দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে, তার উদাহরণ ভৈরবের সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনা। প্রথম ঘটনার সূত্রপাত ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে স্থানীয় দুটি এলাকার মানুষের মধ্যে কথা কাটাকাটি থেকে। দ্বিতীয় ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে মাইক্রোবাস স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ। আর তৃতীয় ঘটনার পেছনে কাজ করেছে বাজারের নামকরণ নিয়ে বিরোধ। এ তিনটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত দেড় মাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেটসহ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে একদিন টানা ছয়ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। আরেক দিন সাড়ে পাঁচঘণ্টা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। আর তৃতীয় ঘটনায় মানুষের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়। এতে সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণ যায় দু’জনের। ভৈরবে ব্যক্তিগত ও বংশগত বিরোধ, এলাকায় প্রভাব বজায় রাখা নিয়ে মারামারি, ফেস বুকে করা মন্তব্য কিংবা খেলা নিয়ে কথাকাটাকাটি থেকে সংঘর্ষের প্রভাব এখন আর স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না। পাড়া বা গ্রামভিত্তিক সংঘর্ষের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে মহাসড়কে এবং রেললাইনে। এতে মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তির পাশাপাশি ক্ষতি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদেরও। এ প্রসঙ্গে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ভৈরবের সাম্প্রতিক সংঘর্ষগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়Ñ ঘটনার মূলে বড় কোনো কারণ নেই, কিন্তু এর পরিণতি ভয়াবহ। প্রভাব স্থানীয় এলাকা ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে বেড়েছে অস্থিরতার মাত্রা।

স্থানীয় দ্বন্দ্ব জাতীয় দুর্ভোগে পরিণত হওয়ার বিষয়টি কোনো ছোট বিষয় নয়। বিষয়টি নিয়ে অনেকেই ভাবছেন। পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ বলছেন, মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে ভাবার মতো নৈতিক বোধ যেন সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। সবাই শক্তি ও ক্ষমতার দাপট দেখতে চায়। কেউ বংশগত পরিচয়কে বড় করে দেখছে। কেউ ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর দাপট দেখাচ্ছে, কেউবা নিজের মতামত বা সমর্থনের বিষয়টি অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। এসব প্রবণতা সমাজের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এর সাথে জড়িয়ে আছে অহংকার ও জুলুমের মনোভাব। এসব দোষ থেকে সমাজের মানুষকে মুক্ত হতে হবে। মুক্তির এ পথ হলো আত্মশুদ্ধির পথ। আর এ পথে ব্যক্তি মানুষকেই এগিয়ে যেতে হবে আগে। তবে পরিবার ও সমাজ এক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। এছাড়া দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে স্থানীয় ইসুগুলোতে, মতবিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোতে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা একজোট হয়ে কাজ করতে পারেন। তবে প্রথমেই শুরু করতে হবে জ্ঞান ও তথ্যভিত্তিক সচেতনতা তৈরির কাজটি। সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে হয়তো মানুষ আর স্থানীয় দ্বন্দ্বকে জাতীয় দুর্ভোগে পরিণত করতে চাইবে না।