বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং শিল্প উৎপাদনের স্থবিরতা একসঙ্গে দেশের উন্নয়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। গ্যাস বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই গ্যাসনির্ভর। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, কাচ, সার, সিমেন্ট, ইস্পাতসহ অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় রান্না বান্না করা যাচ্ছে না। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এ চিত্র দেখা যায়। গ্যাস সঞ্চালনে এমন সংকটকালে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে গ্যাসের দাম বাড়ানোর নতুন প্রস্তাব করা হয়েছে।
দৈনিক সংগ্রামসহ পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, দেশে চরম গ্যাস সংকট চলছে। এরই মধ্যে আরেকদফা গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে পেট্রোবাংলা। গ্যাস খাতের বিভিন্ন কোম্পানি থেকে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবনা আসার পর সেগুলো যাচাই-বাচাই করে পেট্রোবাংলা। পরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম ঘনমিটার প্রতি ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা এবং যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজি ৪৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫ টাকা করতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা দেয় পেট্রোবাংলা। ভর্তুকি থেকে বের হয়ে আসতে প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে সম্প্রতি দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে। পেট্টোবাংলার প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি অনুমোদন হলে পেট্রোবাংলায় ফেরত যাবে, এরপর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) প্রস্তাব প্রেরণ করা হবে। তারপর শুরু হবে আইনগত প্রক্রিয়া।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন শিল্পে ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা একই বছরে নভেম্বরে সার উৎপাদনে ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯.২৫ টাকা করা হয়। তবে এ দফায় অন্যান্য গ্রাহকের দাম বাড়ানোর কোন ইচ্ছে এখন পর্যন্ত নেই বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। সূত্র জানায়, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বিতরণ কোম্পানিগুলো চার্জ (বিতরণ চার্জ) বাড়ানোর আবেদন করেছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ঘনমিটার প্রতি বিতরণ চার্জ ৩৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১.২১ টাকা, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড ২৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪১ পয়সা, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ৩০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯০ পয়সা, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি দুই ধরনের ফর্মুলার প্রস্তাব করেছে। অনুমোদিত সিস্টেম লস ৫ শতাংশ ধরা হলে ২১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ পয়সা আর ২ শতাংশ হলে ১ টাকা ৪ পয়সা প্রস্তাব করেছে। অন্যান্য বিতরণ কোম্পানিও অনুরূপ প্রস্তাব দিয়েছে।
খবরে আরো বলা হয়েছে, জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে ৩০ শতাংশ আমদানি করা গ্যাসের কারণেই গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে আমদানি নির্ভরতা ৭০ শতাংশে পৌঁছালে এই চাপ আরও বাড়বে। সে কারণে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান কার্যক্রম না হওয়ায় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে প্রতিবছর অন্তত চারটি অনুসন্ধান কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও কোনো সরকারই তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি কমে গেছে।
গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির খবর সর্ব মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরাও সে কথাই বলেছেন। এ সিদ্ধান্ত কেবল গৃহস্থালি পর্যায়েই প্রভাব ফেলবে না; শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি, পরিবহন এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। গ্যাসের স্বল্পচাপ, অনিয়মিত সরবরাহ এবং বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে কৃষিখাতে।
আমরা মনে করি গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে তা বিভিন্ন খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প টিকে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়বে। সারের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, কৃষকের উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পাবে। ফলস্বরূপ খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। আমরা সরকারের কাছে বিশেষ করে পেট্রোবাংলার কাছে বিষয়টি নতুন করে ভেবে দেখার আহ্বান জানাই। গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ও ভাবতে হবে। দাম না বাড়িয়ে কিভাবে জনগণের ও বিভিন্ন খাতের স্বার্থ রক্ষা করা যায় সেটা ভেবে দেখতে হবে।