বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যেগুলোর স্মৃতি আজও বিতর্ক, বেদনা এবং অনুত্তরিত প্রশ্নের ভার বহন করে। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত সহিংসতা সে ধরনেরই একটি ঘটনা। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এ ঘটনাকে ঘিরে নিহতের সংখ্যা, অভিযান পরিচালনার ধরন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা এবং ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিয়ে নানা দাবি, পাল্টা দাবি ও রাজনৈতিক বিতর্ক চলেছে। কিন্তু বিতর্ক কখনোই বিচার ও সত্য অনুসন্ধানের বিকল্প হতে পারে না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ ঘটনায় ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়া এবং পলাতক আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর এ ঘটনাকে ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং তদন্তে অন্তত ৫৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়ার দাবি করেছেন। শাপলা চত্বরের ঘটনাটি শুরু থেকেই ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। হতাহতের সংখ্যা, অভিযান পরিচালনার ধরন এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন দাবি তুলে ধরে। দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রশ্ন জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে। এমন বাস্তবতায় আলোচিত শাপলা চত্বরের ঘটনাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বহু বছর ধরে বিচারবহির্ভূত বিতর্কের বিষয় হয়ে থাকা এই গুরুতর অভিযোগটি এবার আদালতের আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার আওতায় এসেছে। আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন এবং বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা, দায়-দায়িত্ব এবং ঘটনার প্রকৃতি প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে বলে আশা করা যায়।

রাষ্ট্রের শক্তি তার বলপ্রয়োগে নয়, বরং আইনের শাসনের প্রতি তার আনুগত্যে। কোনো পরিস্থিতিতেই নাগরিকের জীবন সুরক্ষার দায় রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে না। আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। এ দুই দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। যদি সে ভারসাম্য ভেঙে যায়, তবে শুধু একটি ঘটনার বিচার নয়, রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক বিতর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার কিংবা দলীয় বক্তব্যের বাইরে এখন আদালতের সামনে প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং আইনি যুক্তির ভিত্তিতে পুরো ঘটনাটি পর্যালোচিত হবে। এটাই হওয়া উচিত একটি সভ্য রাষ্ট্রের পথ। কারণ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আদালত ও নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়ার ওপরই বর্তায়।

একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়াটি যেন কোনোভাবেই প্রতিহিংসার প্রতিচ্ছবি না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যত উচ্চপদস্থই হোন না কেন, তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। আবার যদি প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধ প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। বিচার শুধু হতে হবে না, বিচার যে হয়েছে তা জনগণের কাছেও দৃশ্যমান হতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেগুলোর প্রকৃত সত্য দীর্ঘদিন অন্ধকারে ছিল।

কখনো রাজনৈতিক পরিবর্তন, কখনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আবার কখনো রাষ্ট্রীয় অনীহার কারণে সেসব ঘটনার বিচার বিলম্বিত হয়েছে। বিলম্বিত বিচার আদর্শ পরিস্থিতি নয়, কিন্তু বিচারহীনতার চেয়ে বিলম্বিত বিচারও উত্তম, যদি তা নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।

শাপলা চত্বরের ঘটনাও সে পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এ মামলার মাধ্যমে শুধু কয়েকজন ব্যক্তির দায় নির্ধারণই হবে না, বরং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও মূল্যায়িত হবে। আদালতের সামনে এখন দায়িত্ব হলো আবেগ, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা জনমতের চাপ নয়, বরং নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনের আলোকে সত্য উদ্ঘাটন করা। জাতি আজ সে সত্যের অপেক্ষায়। কারণ ন্যায়বিচার কেবল অভিযুক্তের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য নয়, বরং নিহতদের প্রতি সম্মান, স্বজনহারাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের জন্যও অপরিহার্য। শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো এক যুগ ধরে বাংলাদেশের জনপরিসরে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেগুলোর গ্রহণযোগ্য ও আইনি উত্তর নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।