বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মানুষের অন্যতম বড় প্রত্যাশা ছিল, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি আর ফিরে আসবে না। মতপার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র পথ হবে আইন ও বিচারব্যবস্থা। সাম্প্রতিক সময়ে পাবনার সাঁথিয়া ও যশোরে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা সে প্রত্যাশাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সাঁথিয়ায় একটি মসজিদে জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষে পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন দাবি করেছেন, তাঁর ওপর এবং জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত হামলা হয়েছে। তিনি স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

অন্যদিকে যশোরে সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রসুলের বাসভবনে হামলা, ভাঙচুরের চেষ্টা এবং তাঁর পরিবারকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবরুদ্ধ রাখার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি তাঁর চিকিৎসাধীন মানসিক রোগে আক্রান্ত মেয়েকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত তা জনতার হামলায় রূপ নেয়। উভয় ঘটনার প্রকৃত দায় কার, তা তদন্তেই নির্ধারিত হবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, কোনো মতবিরোধ বা অভিযোগের নিষ্পত্তি কখনো হামলা, ভাঙচুর কিংবা জনতার বিচারের মাধ্যমে হতে পারে না।

দুটি ঘটনাই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের ডধৎৎবহঃ ড়ভ চৎবপবফবহপব অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রের সাংবিধানিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি। এ মর্যাদা কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা নয়; এটি জনগণের ভোট, জাতীয় সংসদ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সম্মানের প্রতিফলন। ফলে একজন সংসদ সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। যদি একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিই মসজিদে বা নিজের বাসভবনে নিরাপত্তাহীনতার শিকার হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়বে। এটি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতারও পরীক্ষা।

উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনতার চাপ, গুজব এবং দলীয় উত্তেজনা আইনি প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দেখা যাচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। কারণ মব কালচার কখনো একটি নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একবার এটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠলে শেষ পর্যন্ত এর শিকার হয় সবাই। অতীতের অভিজ্ঞতাও সে শিক্ষাই দেয়। এ কারণেই রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। দলীয় কর্মীদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। একই সঙ্গে প্রশাসনকেও প্রতিটি ঘটনায় নিরপেক্ষ ও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতাই রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

বাংলাদেশ এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এমন সময়ে মব কালচারের পুনরুত্থান শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, গণতন্ত্র, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির জন্যও হুমকি। তাই সাঁথিয়া ও যশোরের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো সতর্কবার্তা। সরকার, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে এখনই স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে, বাংলাদেশে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়, শেষ কথা বলবে আইন। কারণ আইনের শাসনই একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি।

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন এড়ানো যায় না। প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। যদি কোনো জনপ্রতিনিধির অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগ যদি ভিত্তিহীন হয়, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করতে হবে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতাই পারে রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত করতে। পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ কিংবা নিষ্ক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বাংলাদেশ এখন বিপ্লব পরবর্তী গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এরকম স্পর্শকাতর সময়ে মব কালচারের পুনরুত্থানের কোনো ইঙ্গিতও দেশের জন্য অশনিসংকেত। রাষ্ট্র যদি আইন প্রয়োগের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব হারাতে শুরু করে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি সরকার বা একটি রাজনৈতিক দল নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা।