চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অ্যাডমিন অ্যান্ড ফিন্যান্স) মো. নাজিমুল হক বলেছেন, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে সাজ্জাদ, ইমন ও রায়হান বাহিনীর নেটওয়ার্ক ধ্বংসে ধারাবাহিক অভিযান চালানো হচ্ছে। দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা নজরদারি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন প্রকাশ ডেভিড ইমনকে যশোর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গতকাল বুধবার বিকেলে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
অতিরিক্ত ডিআইজি জানান, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা দীর্ঘদিন ধরে ডেভিড ইমনের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে প্রথমে তার ঢাকায় অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেলে সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে অবস্থান পরিবর্তন করে তিনি যশোরের দিকে চলে যান। পরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের গোয়েন্দা দল তাকে অনুসরণ করে যশোর পুলিশের সহযোগিতায় মঙ্গলবার রাতে ঝিকরগাছা উপজেলার ধুমধুমপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
তিনি বলেন, পুলিশের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী ডেভিড ইমন সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে।
ডেভিড ইমনের গ্রেফতার প্রসঙ্গে নাজিমুল হক বলেন, এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে। অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নির্দেশনায় চট্টগ্রাম বিভাগে সক্রিয় সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে সাজ্জাদ বাহিনী, ইমন বাহিনী ও রায়হান বাহিনীসহ বিভিন্ন সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গ্রুপের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর একটি জঙ্গল সলিমপুর এলাকা এবং অন্যটি রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চল। এসব এলাকায় সন্ত্রাসীরা আশ্রয় গ্রহণ, অস্ত্র মজুত এবং পালিয়ে যাওয়ার নিরাপদ পথ হিসেবে ব্যবহার করত।
অতিরিক্ত ডিআইজি আরও বলেন, এই নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়িকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির ফলে একের পর এক সন্ত্রাসী গ্রেফতার হচ্ছে। গত দুই মাসে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ অস্ত্রসহ একাধিক সন্ত্রাসীকে আটক করেছে। একই সময়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশও অস্ত্রসহ দুই সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেছে। এর আগে আলোচিত ধামাই ইলিয়াস এবং সর্বশেষ ডেভিড ইমনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সন্ত্রাস দমনে শুধু ঘটনার পর অভিযান পরিচালনা নয়, আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি এলাকায় ফেস ডিটেকশন প্রযুক্তিসমৃদ্ধ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এপিবিএনের চারটি ক্যাম্প স্থাপন, স্থায়ী চেকপোস্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কে রোড ব্লক স্থাপনের উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) মোহাম্মদ রাসেল জানিয়েছেন, জেলা পুলিশের অভিযানে মোবারক হোসেন প্রকাশ ডেভিড ইমনকে যশোরের ঝিকরগাছা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
যশোরে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন গ্রেফতার
চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে যশোর থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে যশোরের ঝিকরগাছার ধুমধুমপুর এলাকায় যৌথ অভিযানে তাকে আটক করা হয়।
গ্রেফতার হওয়া ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা এবং মো. মুসার ছেলে। তার গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যশোরের ধুমধুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট স্থাপন করে অভিযান পরিচালনা করা হয়। যশোর ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সমন্বিত অভিযানে ডেভিড ইমনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় সাধারণ জীবনযাপন করলেও পরে তিনি চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ গ্রুপে যোগ দেন। এরপর নগরীর বিভিন্ন আলোচিত হত্যাকা-ে তার নাম উঠে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশি পিস্তল হাতে তার একাধিক ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি আলোচনায় আসেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, তিনি সাজ্জাদ গ্রুপের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
পুলিশের দাবি, দীর্ঘদিন দুবাইয়ে অবস্থান করে তিনি চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবি করতেন। চাঁদার টাকা না দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসভবনে গুলিবর্ষণ এবং হামলার ঘটনা ঘটানো হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ জানায়, মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার আলোচিত জোড়া হত্যা মামলাসহ গত ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলারও আসামি। তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকা-সহ মোট ১৫টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেফতারের পর তাকে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে আদালতে সোপর্দ করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।