সংগ্রাম ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) একটি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। সামা টিভি, রয়টার্স, আল-জাজিরা, ফার্স নিউজ এজেন্সি ।

আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, তাদের বাহিনী মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছে, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় হরমুজ প্রণালিতে চলাচলরত তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারও থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে। গতকাল বুধবার এসব ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয় বলে জানানো হলেও, সেগুলোর নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বা কোনো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এর আগে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ হামলার পরই এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওয়াশিংটন ও রিয়াদ জানিয়েছে, পূর্ব ইরাকে ইরান ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত কয়েকটি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, এসব স্থান থেকে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার সমন্বয় করা হচ্ছিল। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ছোড়া কয়েকটি ড্রোন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে। এসব হামলার জন্য ইরাকভিত্তিক ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের দায়ী করেছে রিয়াদ।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ও সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও হামলা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যেই এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এদিকে ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটি একে ইরাকের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং অঞ্চলে বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধির পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, হামলায় পিএমএফের কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইরান। তেহরান সতর্ক করে বলেছে, আঞ্চলিক যেকোনো হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হলে তা ‘বড় ধরনের ভুল হিসাব’-এর জন্ম দিতে পারে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

কাঁধে বহনযোগ্য চীনা ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে কয়েক মাসের যুদ্ধের পর আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করতে চীনের তৈরি কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র (ম্যানপ্যাডস) কিনছে ইরান। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসব ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম চালান দেশটিতে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছেন এ বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্র। সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ৭ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের এই চুক্তির আওতায় ৩০০ থেকে ৪০০টি ম্যানপ্যাডস কেনা হচ্ছে। এর মধ্যে চীনের তৈরি কিউডব্লিউ-১২ এবং এফএন-১৬ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। হংকংভিত্তিক ঝংশিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরান ও চীনা সরবরাহকারীর মধ্যে এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে সূত্রগুলোর দাবি। তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ খবরকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, চীন সবসময় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সংঘাতের অবসানে ভূমিকা রেখে আসছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

ইরানে ফের মার্কিন হামলা শুরু

ইরানের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলীয় পিরানশাহর সীমান্তের কাছে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। গত শুক্রবার থেকে দুই পক্ষের মধ্যে হামলা বন্ধের পর নতুন করে ইরানে হামলা চালালো যুক্তরাষ্ট্র। স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশের একটি জনবসতিহীন এলাকায় শত্রুপক্ষের একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে এই হামলার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্র।

হরমুজ নিয়ে বাড়ছে বৈশ্বিক উদ্বেগ

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রণালিটির যৌথ তদারকির বিষয়ে ওমানের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। একই সঙ্গে তেহরান নিজেদের একটি পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি জানিয়েছেন, ওমানের প্রস্তাবে তেহরানের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও নিয়ন্ত্রণের দাবি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। তাই ইরান এমন একটি কাঠামো চায়, যেখানে এই কৌশলগত জলপথে তাদের ভূমিকা হবে প্রধান।

যদিও ওমান ও ইরান—কোনো পক্ষই তাদের প্রস্তাবের বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতপার্থক্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথ নিয়ে যেকোনো বিরোধ বা উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, তেলের দাম এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ইরানের নতুন অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

ইরানি জাহাজে হামলার দায় ইউক্রেনকে স্বীকার করতেই হবে: আরাগচি

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইরানি একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাকে ‘অনিচ্ছাকৃত’ বলে ইউক্রেনের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনায় কিয়েভকে স্পষ্টভাবে দায় স্বীকার করতে হবে। গতকাল বুধবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কাল্লাসের সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে এ কথা বলেন আরাগচি। আলাপের সময় উভয় পক্ষ হরমুজ প্রণালীর সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। আরাগচি আঞ্চলিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনার বিষয়ে ইরানের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তেহরানে আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় ফরাসি কর্মকর্তাদের বিষয়ে ইইউর ‘হস্তক্ষেপমূলক’ বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, তেহরানে ফরাসি দূতাবাসে কর্মরত দেশটির কর্মকর্তাদের অসদাচরণে ইইউর সমর্থন ১৯৬১ সালের কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের বিধানের পরিপন্থী।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাম্প্রতিক টেলিফোন আলাপের প্রসঙ্গ তুলে আরাগচি বলেন, কিয়েভ ওই হামলাকে অনিচ্ছাকৃত বলে দাবি করেছিল। তবে ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার বিষয়টি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়েছে বলে এমন দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।

আরাগচি বলেন, ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় ইউক্রেন সরকারকে অবশ্যই স্পষ্টভাবে দায় স্বীকার করতে হবে। ওই হামলায় ইরানের নাগরিক নিহত ও আহত হয়েছেন এবং বাণিজ্যিক জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর আগে কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে সামরিক হামলার প্রতিবাদে তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করেছিল ইরান। ওই হামলায় একজন ইরানি নাবিক নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হন।

বৈঠকে ইরানি কর্মকর্তারা বলেন, হামলাটি জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন এবং আগ্রাসনের শামিল। একই সঙ্গে এটি কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলবর্তী সব দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলেও উল্লেখ করেন তারা। হামলার জন্য কিয়েভকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানায় তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এ হামলা জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারা লঙ্ঘন করেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনীয় নেতৃত্বের হামলা স্বীকারের বিষয়টি ইরানের প্রতি কিয়েভের বৈরী মনোভাবের ধারাবাহিকতার প্রমাণ বলেও মন্তব্য করেছে তেহরান।