এ বিশ্বচরাচরে ‘মানবসৃষ্ট নয়’ এমন দৃশ্য-অদৃশ্য বিষয় এবং জীবন ও প্রাণ নিয়েই প্রকৃতি। মূলত, ‘প্রকৃতি’ (Nature) বলতে সমগ্র সৃষ্টিজগতকে নির্দেশ করে। সংবেদনশীল নয় বা সাধারণভাবে অনুভূতি প্রকাশ করে না বলেই প্রকৃতিকে প্রাণহীন মনে করা হয়। এ বিশাল প্রকৃতিরাজ্যে মানুষ শুধুই একটি উপাদান; গাছ-পালা, নদী-নালা, পশু-পাখি, পাহাড়-পর্বত সকল বস্তুর মতোই মানুষও প্রকৃতির অনুষঙ্গ মাত্র।

প্রাণহীন এ সৃষ্টিনিচয়কে সর্বংসহা মনে করা হয়। কারণ, প্রকৃতিকে সাধারণভাবে কোন বিষয়ে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেখা যায় না। সৃষ্টির সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী জীবই হচ্ছে মানুষ। প্রকৃতিরাজ্যে মানুষ যা-ই করুক না কেন এ বিষয়ে প্রকৃতির কোন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ নেই বলে ধরে নেয়া হয়। যদিও প্রকৃতি নিজ গতিতে খুবই সংবিধিবদ্ধ, ক্রিয়াশীল ও সুশৃঙ্খল। কারণ, এর চিরায়ত নিয়মে কখনো ব্যত্যয় ঘটে না। সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে, আবার পশ্চিম দিকে অস্ত যায়-এ নিয়মে কোন হেরফের নেই। অতিপ্রাকৃতি সকল বিষয়েই এ একই কথায় প্রযোজ্য। বিষয়টি সন্দেহ-সংশয়েরও ঊর্ধ্বে।

প্রকৃতির অধিকতর সুবিধাভোগী জীব মানুষ হলেও তা মানুষের জন্য শর্তহীন ও অবারিত নয় বরং প্রকৃতগতভাবেই তা সংবিধিবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। মানুষের পক্ষে কোনভাবেই স্বেচ্ছাচারী বা সীমালঙ্ঘনকারী হওয়ার সুযোগ নেই। মানুষ যখন সৃষ্টির প্রথাগত নিয়মে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে তখন এ বিশ্বচরাচর গতিশীল, শান্তিময় ও আনন্দঘন হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন এর ব্যত্যয় ঘটে তখনই তা ছন্দ হারিয়ে ফেলে, হারায় গতিশীলতা; ভারসাম্যও নষ্ট হয় সৃষ্টিনিচয়ের। এ নিয়মভঙ্গকে সভ্যতাত্তোর কালে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। আর আইনের ভাষায় অপরাধ সভ্যতার অবদান।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রকৃতি ও বিবেকবিরুদ্ধ কাজগুলোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যদিও প্রাক সভ্যতায় এমনটা ছিল না। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অপরাধের সংজ্ঞায়ন এবং তা প্রতিবিধানের জন্য আইন, সংবিধান, দণ্ডবিধি, আদালত, বিচারকসহ যাবতীয় অবকাঠামোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কিন্তু গঠনগত ত্রুটি, প্রায়োগিক জটিলতা ও নানাবিধ দুর্বলতার কারণে সভ্যতা এক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল হতে পারেনি। কারণ, মানুষের কোন কাজই নির্ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। মানুষের পক্ষে ষড়রিপুর প্রভাবমুক্ত হওয়াও সম্ভব নয়। বস্তুত যা অতিপ্রাকৃতিক তা-ই নির্ভুল। তাই মানবসৃষ্ট প্রক্রিয়ায় অপরাধের প্রতিবিধান করা অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয় না বা অপরাধের ধরন-মাত্রা অনুসারে ইহজাগতিক নিয়মে যথাযথ শাস্তিবিধানও সম্ভব নয়। এ থেকেই পারলৌকিকতার যুক্তি ও আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে।

বস্তুত অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার একটা অনাকাক্সিক্ষত ও অশুভ প্রবণতা মানবসভ্যতায় দুষ্টক্ষত সৃষ্টি করেছে। অপরাধ দমন ও প্রতিবিধানের জন্য আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেসব অনুসঙ্গ রয়েছে, নানাবিধ কারণেই তা স্বাভাবিকভাবে কার্য সম্পাদক করতে পারে না। প্রাণহীন ও স্থবির প্রকৃতিও সর্বংসহা বৈশিষ্ট্যের বলে মনে করা হয়। ফলে এ বসুধাবক্ষ এখন অপরাধ ও অপরাধীদের অভয়ারণ্য হলেও প্রকৃতি কি নিরব দর্শক বা সর্বংসহা; না প্রতিশোধ গ্রহণকারী? এ প্রশ্নই এখন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। যদিও মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসগত পার্থক্যের কারণে বিষয়টি নিয়ে একক ও অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে অতিপ্রাণবন্ত আলোচনা করেছেন জয়পুরহাট জেলার এক সময়ের দায়রা জজ বাবু নরেন্দ্র কুমার দাস। এক ধর্ষণ মামলার শুনানীর সময় কথা প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছিলেন তা খুবই মর্মস্পর্শী, হৃদয়গ্রাহী ও অন্তরদৃষ্টিসম্পন্ন। তার বক্তব্যের সারমর্ম হচ্ছে, প্রকৃতি নির্জীব, চলৎশক্তিহীন ও সর্বংসহা মনে হলেও আসলে তা সঠিক নয় বরং প্রকৃতি নির্মম প্রতিশোধ গ্রহণকারী। প্রকৃতি কারো অণুপরিমাণ অপরাধও সহ্য করে না বরং সময়ের প্রয়োজনে ঠিকই বিক্ষুব্ধ ও সংক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। অপরাধ ও অপরাধীর প্রতিবিধান হয় প্রাকৃতির আদালতে। তবে অন্তরদৃষ্টিসম্পন্নরাই শুধু তা উপলব্ধি করতে পারেন। ‘আকলমান্দ কি লিয়ে ইশারা কাফি’।

তিনি মনে করেন, আমাদের সমাজ-রাষ্ট্র নানাবিধ প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার কারণেই অপরাধের প্রতিবিধান করতে পারে না। পরিবারগুলো এক্ষেত্রে খুবই অসহায়। অপরাধ দমন বা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাফল্যও আহামরি নয়। ক্ষেত্র বিশেষে মামলা হলেও প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষীর অভাবে আদালতও অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারে না। কারণ, কেউ অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে চায় না। অনেক ক্ষেত্রে সমাজের ক্ষমতাশালী, বিত্তশালী ও প্রভাবশালীদের কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। অপরাধীরা অপরাধ করে পার পেয়ে নতুন উদ্যোমে অপরাধ চালিয়ে যায়। ভাবে তাদেরকে ধরার মতো শক্তি আর কারো নেই। কিন্তু অপরাধী কখনো প্রকৃতির রূঢ়তা ও নির্মম প্রতিশোধ থেকে বাঁচতে পারে না। কোন না কোন ভাবে প্রকৃতিগতভাবেই অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয়। অপঘাত-অপমৃত্যু, যন্ত্রণাদায়ক ও দুরারোগ্য দীর্ঘ রোগভোগ, দুর্ঘটনা, পারিবারিক ও সামাজিক কলহবিবাদ, গণমানুষের রুদ্ররোষ, রাষ্ট্রাচারের বিচ্যুতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী এবং জীবন চলার পথে নানাবিধ প্রতিকূলতায় শাস্তি পায়। আর এ শাস্তি হয় মানুষের কল্পনারও অতীত।

তার ভাষায়, দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নৃপতি যারা নিজেদেরকে স্রষ্টাসমতূল্য মনে করতেন এবং সাধারণ মানুষসহ প্রতিপক্ষদের ওপর চালাতেন নির্মম ও নিষ্ঠুর নির্যাতন, তাদেরকেও প্রকৃতির অমোঘ বিধানে করুণ পরিণতিই বরণ করতে হয়েছে। এ দুনিয়াতে যারাই দম্ভভরে চলেছে, ক্ষমতার দম্ভে ধরাকে সরা জ্ঞান করে নানাবিধ অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে, সমাজে খুনখারাবি, মানুষের অধিকারহরণ, বিশ্বাসভঙ্গ, সীমালঙ্ঘন, নিপীড়ন, লাগামহীন অপরাধ করেছে এবং মানুষের জানমাল, ইজ্জত সম্ভ্রম নিয়ে ছিনিমিন খেলেছে তাদের পরিণতি মোটেই সুখকর হয়নি; প্রকৃতি তাদেরকে ছেড়ে দেয়নি।

নরেন্দ্র বাবু যত গভীরভাবে মানুষের জীবন, সমাজ, রাষ্ট্রাচার, অপরাধ ও অপরাধ প্রবণতা এবং প্রকৃতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে ভেবেছেন তা হয়তো কম লোকেই ভেবে থাকবেন। কিন্তু তার এ বক্তব্য চক্ষুষ্মান মানুষের অন্তরদৃষ্টি খুলে দিতে সহায়ক হয়েছে। আমাদের চারপাশে অনেক অপরাধীর সন্ধান পাওয়া যায়; যারা অপরাধ, বিশ্বাসঘাতকতা, সীমালঙ্ঘন ও মানুষের অধিকারহরণকেই জীবনের অনুষঙ্গ বানিয়েছে নিয়েছে। এরা কখনো জাগতিক বিচারের মুখোমুখি হয়নি বা হলেও প্রচলিত আইন ও বিচারব্যবস্থা তাদের কেশাগ্র পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারেনি। কিন্তু তারা কেউই প্রকৃতির নির্মম ও নিষ্ঠুর প্রতিশোধ থেকে পরিত্রাণ পায়নি।

আমাদের এলাকায় ‘কোব্বাদ মুন্সী’ নামে এক কুখ্যাত খুনিকে আমরা দেখেছি। মানুষ খুনই তার পেশা ও নেশা ছিল। সে কত মানুষ যে খুন করেছে তার হিসেব সে নিজেই দিতে পারতো না। কেউ কোন দিন ভাবতেই পারতো না যে এ খুনির কখনো পতন হবে। কিন্তু তার শেষ পরিণাম হয়েছিল খুবই ভয়াবহ। বিক্ষুদ্ধ জনতার রুদ্ররোষ ও গণপিটুনীতে মৃত্যুর পর তার লাশেরই কোন অস্তিত্ব ছিল না। শুধু কোব্বাদ মুন্সী নয় বরং কুখ্যাত ডাকাত রুস্তম ও ইসাসহ তাদের অপর সহযোগিদের অবস্থা হয়েছিল আরও ভয়াবহ।

নবাব সিরাজের সাথে যারা বিশ্বাস ঘাতকতা করেছিল তাদের প্রত্যেককেই নির্মম পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে বলে জানা যায়। মীর জাফর নবাব হওয়ার উচ্চাভিলাষে সিরাজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলেও তাকে ক্লাইভের গর্দভ হিসেবে অসম্মানজনকভাবে জীবন যাপন করতে হয়েছে। মৃত্যুর আগে কুন্ঠুরোগে আক্রান্ত হয় মীর জাফর। তার শরীরে অসংখ্য ঘা ও ফোঁড়া হয়ে দূষিত রক্ত ও পুঁজ পড়ে দুর্গন্ধ হতো বলে জানা যায়। আর এভাবেই যন্ত্রণাদায়ক রোগভোগের মাধ্যমে করুণ মৃত্যু হয়েছিল বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের।

মীর জাফর পুত্র মীরনের বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয়েছে জানা গেলেও জনৈক ইংরেজ সেনাপতি তাকে গুলি করে হত্যা করে করেছেন বলে জনশ্রুতি বেশ জোরালো। এ দাবির ঐতিহাসিক ভিত্তিও খুব দুর্বল নয়। ঘসেটি বেগমকে মীরন বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা ডুবিয়ে হত্যা করে বলে জানা যায়। নবাব সিরাজের হত্যাকারী মোহাম্মদী বেগ পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে পানিতে ডুবে মারা যায়। পলাশীর অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী মীর কাশিমকে ইংরেজরা ক্ষমতাচ্যুত করার পর তাকে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। একদিন মুঙ্গের দূর্গের সামনে তার লাশের সন্ধান পাওয়া যায়।

রায়দুর্লভ ও জগৎ শেঠকে গঙ্গায় নিক্ষেপ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। রাজা রাজবল্লভকে গলায় বালুর বস্তা বেঁধে গঙ্গা নদীতে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়। ইয়ার লতিফ নিরুদ্দেশ হয়। উমিচাঁদ প্রতিশ্রুত ২০ লাখ টাকা না পেয়ে শোকে পাগল হয়ে যায়। পরে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ক্লাইভ বাংলা লুণ্ঠনের দায়ে বিলেতে দুর্নীতি মামলায় সাত বছর জেল খেটে কপর্দকহীন হয়ে পড়েন। পরে এ অবস্থায় টেমস নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। হলওয়েলের স্ত্রী তাকে রেখে অন্য যুবকের সাথে চলে গেলে তিনি আত্মহত্যা করেন। এ ছিল পলাশীর ষড়যন্ত্রকারীদের নির্মম পরিণতি। এসবই ছিলো প্রকৃতির প্রতিশোধ। আর আধ্যাত্মবাদীগণ এটিকে স্রষ্টার বিচার বলেই মনে করেন।

একথা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ এমন নয় বরং কোন জাতিরাষ্ট্রে যখন অবক্ষয়, মূল্যবোধের বিচ্যুতি ও অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে তখন স্বাভাবিক নিয়মেই সে জাতির পতনও অনিবার্য হয়ে ওঠে। আর এসব ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠী দায়ি হলেও শাসিতরা এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে না। কারণ, কথায় আছে ‘রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট প্রজা কষ্ট পায়’। একথা অস্বীকার্য যে, রোম সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর এক মহাবিস্ময় ! ইউরোপ, আফ্রিকা ছাপিয়ে এর বিস্তৃতি ছিল এশিয়া পর্যন্ত। বিশাল এ সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল ৪৭৬ সালে। দুর্নীতিবাজ, অপরাধপ্রবণ, মূল্যবোধহীন ও অদক্ষ শাসকরাই রোমের পতন ডেকে এনেছিল।

যাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও অনাচার সাধারণ মানুষকে বেশ ভুগিয়েছে। ফলে গণঅসন্তুষ্টি থেকে সৃষ্ট গৃহযুদ্ধের কারণেই রোম সম্রাজ্যের পতন হয়। যুদ্ধের ২০ বছরে ৭৫ জন সম্রাটের ক্ষমতার দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন। এ থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় রোম সাম্রাজ্যে শেষ সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা কত চরমে গিয়ে ঠেকেছিল। অন্যদিকে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘প্যারাটোরিয়ান গার্ড’ নামে সম্রাটের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা। তারা ইচ্ছামত সম্রাটকে খুন করতো এবং যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমতায় বসাতো। অথচ এদের দায়িত্ব ছিল সম্রাটদের নিরাপত্তা বিধান করা।

১৭৮৯ সালে ফরাসি স্বৈরশাসক রাজা ষোড়শ লুই-এর নির্যাতন কেন্দ্র বাস্তিল দূর্গের পতন হয়েছিল। এর মধ্য দিয়েই ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। এ বিপ্লবের আগে রাজত্বের ৯৫ শতাংশ সম্পত্তির মালিক ছিল মাত্র ৫ ভাগ মানুষ। অথচ এরা কখনো আয়কর দিতো না। যারা আয়কর দিতো তাদের কোনো সুযোগ-সুবিধাও দেওয়া হতো না। এ অসম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে বাস্তিল দুর্গে বন্দি করে নির্যাতন করা হতো। এখানে কেউ একবার বন্দি হলে তার জীবন নিয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকতো না। নিপীড়নের বিরুদ্ধে একসময় মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সংক্ষুব্ধ জনতা রাজবন্দিদের মুক্তি দেওয়ার দাবি করলেও স্বৈরশাসকরা তা মানেনি। তখনই জনতার উত্তাল তরঙ্গ বাস্তিল দুর্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এসময় শাসকগোষ্ঠী সামরিক শক্তি কামানসহ অস্ত্র-গোলাবারুদ ব্যবহার করে জনতার বিরুদ্ধে। কিন্তু এতে কোন লাভ হয়নি। প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধের অংশ হিসেবেই বাস্তিল দুর্গের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। কথায় আছে, ‘লেখার কিল ভূতেই কিলায়’।

ক্ষমতার দম্ভে যেসব নৃপতির সাধারণ মানুষের উপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হয়েছে তাদেরকে অনেক ক্ষেত্রেই বিচারের আওতায় আনা না গেলেও প্রকৃতির বিচার থেকে তারা কেউই রক্ষা পায়নি। পৃথিবীর তাবৎ স্বৈরশাসকদের দিকে তাকালে আমাদের সামনে সে চিত্রই ভেসে ওঠে। নমরুদ, ফেরাউন, সাদ্দাদ, আবু জাহেল, হিটলার, নিকোলাই চসেস্কু, বেনিতো মুসোলিনি, নেপোলিয়ন, হোসনী মোবারক, সাদ্দাস হোসেন, ইদি আমিন, মুয়াম্মার গাদ্দাফী ও রবার্ট মুগাবে সহ ইতিহাসের স্বৈরাচাররা এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। ব্যতিক্রম হননি ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনাও। স্বৈরতান্ত্রিক এ নেত্রী নিজেই দাবি করেছিলেন যে, তার সরকারের পতন ঘটায় দুনিয়াতে এমন সাধ্য কারো নেই। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম প্রতিশোধের হাত থেকে তিনি রেহাই পান নি বরং লজ্জাজনকভাবে তাকে দলবল নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে।

আমাদের দেশে মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন, অপরাধ ও অপরাধপ্রবণতা এখন প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। এ অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা যাদের দায়িত্ব তাদের বিরুদ্ধে মানুষের অধিকার হরণের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এক রূঢ়বাস্তবতায় রক্ষক আর অপরাধী এখন একাকার বলেই সাধারণ মানুষের ধারণা। তাই এ বিষয়ে জাগতিক সমাধানের আশাও অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন। কারণ, সদ্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত ক্ষমতাসীনরা নিকট অতীত থেকে শিক্ষা না দিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছেন। এমনকি বিপ্লবীদের রক্তের সাথেও বিশ্বাস ভঙ্গ করার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। তাই প্রকৃতির প্রতিশোধটা এখন অনিবার্য হয়ে উঠেছে কি না সে প্রশ্নই এখন মানুষের মুখে মুখে। কারণ, প্রকৃতি কিন্তু সর্বংসহা নয়; বরং প্রতিশোধপ্রবণ।

www.syedmasud.com