বাংলাদেশে গুমের মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলার দাবি বহু বছরের। এ অপরাধ শুধু একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা হরণ করে না, বরং একটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নাগরিকের আস্থাকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দীর্ঘদিন ধরে গুমের অভিযোগ, ভুক্তভোগী পরিবারের অসহায় অপেক্ষা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক পরিসরেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সে বাস্তবতায় গুমকে একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান প্রণয়ন নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু একটি আইনের কার্যকারিতা কেবল তার শাস্তির কঠোরতায় নয়, বরং তার প্রয়োগের বিশ্বাসযোগ্যতা, তদন্তের স্বাধীনতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতার ওপর নির্ভর করে। আর ঠিক এই জায়গাতেই নতুন প্রস্তাবিত “গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন” নিয়ে নানা মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এতে গুম করার অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আর গুমের ফলে মৃত্যু ঘটলে, মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপের বিধান এতে যুক্ত করা হয়েছে। বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ এ গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ আইন গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তিদের বিচার, গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠা করবে।

খসড়া অনুযায়ী, গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভুক্তভোগীদের তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তাদের জন্য সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন এবং দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি, পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য গুম সনদ দেওয়া, কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ এবং গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

এতে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করা এবং সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন করার বিধান রাখা হয়েছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মন্ত্রিসভা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে এমন কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা আইনটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিবর্তে পুলিশের ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাব। সরকারের যুক্তি হলো, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্ত পুলিশের দায়িত্ব; তাই অন্য কোনো সংস্থার তদন্তের সুযোগ নেই। আইনি যুক্তি হিসেবে বিষয়টি গ্রহণযোগ্য মনে হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে গুমের অধিকাংশ অভিযোগই এসেছে রাষ্ট্রীয় বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে। সে বাস্তবতায় অভিযোগের তদন্ত যদি একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আরেকটি সংস্থার হাতে ন্যস্ত হয়, তাহলে তদন্তের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সংশয় তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, গুমের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তদন্তের স্বাধীনতা। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ ওঠে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে। তাই তদন্ত যদি একই কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়, তাহলে স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই অনেক দেশ গুম, নির্যাতন বা বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন কমিশন, বিশেষ প্রসিকিউটর বা বিচারিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত তদন্তব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়েছে। কেননা, বিচার শুধু হওয়াই যথেষ্ট নয়; বিচার হচ্ছে এবং তা নিরপেক্ষভাবে হচ্ছে, সমাজকে সেটিও বিশ্বাস করতে হবে।

এ সীমাবদ্ধতার প্রভাব শুধু তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আইনে প্রদত্ত অধিকাংশ অধিকারও কার্যকর হবে না। কারণ গুমের শিকার ব্যক্তি হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ, সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার এবং উত্তরাধিকারসংক্রান্ত সমাধানÑসবকিছুই কার্যকর তদন্তের ওপর নির্ভরশীল। তদন্ত ব্যর্থ হলে ভুক্তভোগী পরিবার এসব অধিকার থেকে কার্যত বঞ্চিত হবে। এছাড়া ২১ ধারায় মিথ্যা ও হয়রানিমূলক অভিযোগের জন্য অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা অভিযোগ থেকে কর্মকর্তাদের সুরক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে কোনো অভিযোগ সত্য না মিথ্যাÑসে সিদ্ধান্ত যদি স্বাধীন তদন্তের পরিবর্তে সম্ভাব্য অভিযুক্ত বাহিনীগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরের মধ্যেই পরিচালিত তদন্তের ওপর নির্ভর করে, তাহলে অনেক পরিবার অভিযোগ দাখিল করতেই ভয় পেতে পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, গুমের অভিযোগের তদন্ত পুলিশের ওপর ন্যস্ত করলে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক বার্তাও দুর্বল হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যে পর্যবেক্ষণ চলে, সেখানে এমন মন্তব্য দেশের ভাবমূর্তির জন্যও ইতিবাচক নয়।

এখানে একটি মৌলিক নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে। কোনো রাষ্ট্রে মানবাধিকার সুরক্ষা কোনো সরকারপ্রধানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না। একটি সরকার মানবাধিকার রক্ষায় আন্তরিক হতে পারে, আবার ভবিষ্যতের কোনো সরকার ভিন্ন পথও বেছে নিতে পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল দর্শনই হলো, ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে; সদিচ্ছা নয়, আইন ও জবাবদিহির কাঠামো নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করবে। তাই গুমের মতো গুরুতর অপরাধের তদন্ত এমন একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে হওয়া প্রয়োজন, যার নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো যৌক্তিক প্রশ্ন না ওঠে।

বাস্তবতার আরেকটি দিকও বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি রাষ্ট্রে প্রতিটি ঘটনা সরকারপ্রধানের প্রত্যক্ষ নির্দেশে ঘটে না। প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের মধ্যে বিচ্যুতি ঘটতেই পারে। সে কারণেই স্বাধীন তদন্তব্যবস্থার প্রয়োজন। কোনো অভিযোগ যদি তদন্ত শেষে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়, তবে একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থার সিদ্ধান্ত জনসাধারণ এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্যতা পায়। অন্যদিকে তদন্ত যদি এমন একটি সংস্থা করে, যার নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে, তবে সরকার অভিযোগ থেকে মুক্ত হলেও সে মুক্তি বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। ফলে স্বাধীন তদন্তের অভাব শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্যও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

নতুন আইনে প্রমাণ নষ্ট, গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণ কিংবা আয়নাঘরের মতো স্থাপনা তৈরির শাস্তি কমানোর প্রস্তাবও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও এসব অপরাধ শাস্তিযোগ্য থাকছে, তবু শাস্তির মাত্রা হ্রাসের যৌক্তিকতা সরকারকে আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। মানবাধিকারবিষয়ক আইনে প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে সুস্পষ্ট নীতিগত ভিত্তি থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় সমাজে ভুল বার্তা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আরও একটি দিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। গুমবিরোধী শক্তিশালী আইনি কাঠামো শুধু মানবাধিকার রক্ষার জন্য নয়, রাষ্ট্রের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক আস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা একটি রাষ্ট্রের আইনের শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি বিবেচনা করেই দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেন। যে রাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে পারে, সে রাষ্ট্রের প্রতি আন্তর্জাতিক পরিসরে আস্থাও তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।

প্রস্তাবিত আইনটি নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হলো, এটি অনেকের দৃষ্টিতে পূর্ববর্তী অধ্যাদেশের তুলনায় দুর্বল একটি কাঠামো তৈরি করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত অধ্যাদেশে গুমের তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল, যা নতুন আইনে হয় বাদ দেওয়া হয়েছে, নয়তো উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রমাণ নষ্ট বা গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণের মতো অপরাধে শাস্তির মেয়াদও কমানোর প্রস্তাব এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্র কি গুমের বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থানে যাচ্ছে, নাকি অজান্তেই প্রতিরোধব্যবস্থাকে শিথিল করছে? আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো, স্বাধীন বা তৃতীয় পক্ষের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ কার্যত সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় অভিযোগ প্রথমে থানায় দিতে হবে; পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ না করলে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করা যাবে। কিন্তু আগের অধ্যাদেশে যে স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানের ধারণা ছিল, তা আর থাকছে না।

এ কারণেই মানবাধিকারকর্মী, আইনবিদ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে গুম প্রতিরোধ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল বা মৌলিকভাবে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, আইনের প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দুর্বল হলে গুমের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধমূলক বার্তা এতদিন তৈরি হয়েছিল, তা ক্ষীণ হয়ে পড়বে। অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে এবং দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে যে সংস্কৃতি থেকে দেশ বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, সেই গুমের সংস্কৃতি পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আর্জেন্টিনা তার “ডার্টি ওয়ার”-এর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ১৯৮৩ সালে ন্যাশনাল কমিশন অন দ্য ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স অব পারসন্স (CONADEP) গঠন করে। এ স্বাধীন কমিশন হাজার হাজার গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করে এবং তাদের তদন্ত প্রতিবেদন পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি করে। একইভাবে চিলি ও দক্ষিণ আফ্রিকাও অতীতের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের তদন্তে স্বাধীন কমিশনের পথ বেছে নিয়েছিল, যাতে ভুক্তভোগীদের বক্তব্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়ায় মূল্যায়িত হয়। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের দীর্ঘদিনের বিচারিক অবস্থানও একই বার্তা দেয়। আদালত ধারাবাহিকভাবে বলেছেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গুম বা বেআইনি হত্যার অভিযোগ উঠলে তদন্ত হতে হবে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, কার্যকর এবং জনআস্থাসম্পন্ন। তদন্তকারী সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ও বাস্তবিক স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে সে তদন্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড পূরণ করে না। বাংলাদেশের জন্যও এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা নিহিত।

একটি কঠোর শাস্তির বিধান অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা, যার ওপর ভুক্তভোগী পরিবার, সাধারণ নাগরিক এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সমানভাবে আস্থা রাখতে পারে। যদি তদন্তের স্বাধীনতা, ভুক্তভোগীদের অংশগ্রহণ এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়, তবে আইনটি কাগজে যতই কঠোর হোক, বাস্তবে তার প্রতিরোধক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। বাংলাদেশের উচিত হবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি আইন প্রণয়ন করা, যা শুধু অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করবে না, বরং ভবিষ্যতে গুমের পুনরাবৃত্তির বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধও গড়ে তুলবে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ অতীতের একটি অন্ধকার অধ্যায় থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যাশা নিয়ে এগোচ্ছে। গুমের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আইন প্রণয়ন সেই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমন কোনো আইন তাই এ নতুন বাংলাদেশে কাম্য নয়, যা কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিলেও তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই যেখানে প্রশ্ন তোলার অবকাশ থেকে যায়।