মুহাম্মদ নূরে আলম
উচ্চ প্রযুক্তির এই যুগে কোয়ার্টজ ও সিলিকা সমৃদ্ধ বিশ্বমানের বালুকে বলা হয় আধুনিক শিল্পের ‘সাদা সোনা’। বিশ্বজুড়ে বালুকে ‘সাদা সোনা’ বানানোর কৌশল ও প্রধান রফতানিকারক দেশ হওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। বিশ্বের বহু দেশ এই খনিজ সম্পদ আহরণ ও পরিশোধনের মাধ্যমে বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করছে। হিমালয় পর্বতমালা থেকে উৎপাদিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, পদ্মা ও তিস্তা নদীর মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টন নতুন পলি ও বালু বাংলাদেশে জমা হয় এবং বঙ্গোপসাগরের অভিমুখে পরিবাহিত হয়। চোখের সামনে সাদা সোনা নামক এই বালু বঙ্গোপসাগরের গিয়ে পড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট সঞ্চিত নদীর বালু সম্পদের পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) টনেরও বেশি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ফাইভজি/সিক্সজি যোগাযোগ প্রযুক্তি, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) ওপর ভর করে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। আর এই পুরো ডিজিটাল বিশ্বব্যবস্থার হৃদপি- ও মূল প্রাণশক্তি হলো অতি ক্ষুদ্র সেমিকন্ডাক্টর চিপ। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের ৯০ শতাংশেরও বেশি যন্ত্রাংশ সিলিকন-ভিত্তিক। আর উচ্চমানের সিলিকন তৈরির প্রাথমিক কাঁচামাল হলো উচ্চ বিশুদ্ধতার কোয়ার্টজ (এইচপিকিউ) ও প্রক্রিয়াজাত সিলিকা, যা আমাদের নদীর বালুতে বিপুল পরিমাণে বিদ্যমান। এই খাত থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক ১ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকা) এবং ২০৩১ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১,২০,০০০ কোটি টাকা) রফতানি আয় অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিআইডিএ) পর্যালোচনা এবং সম্প্রতি বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সোহেল রানা একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরেন।
জিওলোজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশের (জিএসবি) উপ-পরিচালক (ভূতত্ত্ব) ড. মো. সোহেল রানার গবেষণা নিবন্ধ ‘ÔSemiconductors and the Bangladesh Perspective: Prospects for High-Purity Quartz, Silica, and Silicon-Based Industrial Development ’-এ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বালু সম্পদ ব্যবহারের একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট জাতীয় রোডম্যাপ উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি তাঁর গবেষণাপত্রে দেখান ছয়টি ধাপ অতিক্রম করে কিভাবে সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরি করা সম্ভব। ১. উচ্চ বিশুদ্ধতা কোয়ার্টজ ২. উচ্চ বিশুদ্ধতা সিলিকা ৩. ধাতুবিদ্যাগত গ্রেড সিলিকন ৪. ইলেকট্রনিক গ্রেড পলিসিলিকন (পলিসিলিকন) ৫. সিলিকন ওয়েফার (ওয়েফার) ৬. সেমিকন্ডাক্টর চিপ (চিপ)।
ড. সোহেল রানা বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, কাঁচ শিল্পের সিলিকা আর সেমিকন্ডাক্টর গ্রেডের কোয়ার্টজের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। সরাসরি চিপ তৈরির কারখানা (ফ্যাব) স্থাপন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তাই আমার সুপারিশ হলো, বাংলাদেশকে একটি ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কৌশল নিতে হবে। প্রথমে হাই-পিউরিটি সিলিকা উৎপাদন এবং আইসি ডিজাইনে গুরুত্ব দিতে হবে।’ ড. রানার মতে, ‘সরকার যদি একটি বিশেষায়িত ‘স্যান্ড প্রসেসিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার স্থাপন করে এবং আমাদের মেধাবী প্রকৌশলীদের এ খাতে দক্ষ করে তোলে তবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর বাজারে উপকরণ সরবরাহকারী হিসেবে নেতৃত্ব দিতে পারবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ হুট করেই বিলিয়ন ডলারের চিপ তৈরির কারখানা স্থাপনে না গিয়ে ধাপে ধাপে এগোলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।
বিশে^র উচ্চ রপ্তানিকারক দেশগুলো: সূত্রে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে যে দেশগুলোতে সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স কারখানা রয়েছে, সেসব দেশেই পরিশোধিত সিলিকা ও সিলিকন উপাদানের বিপুল চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ প্রক্রিয়াজাত সিলিকা ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী উৎপাদন করতে পারলে চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রযুক্তি পরাশক্তি দেশগুলোতে রফতানির বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নর্থ ক্যারোলিনার স্প্রুস পাইন অঞ্চলের প্রাকৃতিক কোয়ার্টজ আমানত প্রক্রিয়াজাত করে প্রতি বছর ৮৮০ মিলিয়ন (৮৮ কোটি) ডলারের বেশি উচ্চমানের সিলিকা বিশ্ববাজারে রফতানি করে যুক্তরাষ্ট্র, যা বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশনের মূল কাঁচামাল। শিল্পমানের সিলিকন ও মেটালার্জিক্যাল-গ্রেড পলিসিলিকন পরিশোধনের বিশ্ব বাজারের প্রায় ৫৯ শতাংশ একা নিয়ন্ত্রণ করে চীন, যা তাদের ডিজিটাল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। নরওয়ে ও ব্রাজিল উচ্চমানের মেটালার্জিক্যাল কোয়ার্টজ আহরণ ও পরিশোধনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানি সোলার-গ্রেড ও ইলেকট্রনিক-গ্রেড সিলিকন তৈরি এবং রফতানি করে প্রতি বছর নিজস্ব বাজেটে বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা যুক্ত করছে।
বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিআইডিএ) পর্যালোচনা অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে এক নতুন ‘চিপ যুদ্ধ’, যেখানে চিপ তৈরির কাঁচামাল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন প্রতিটি দেশের জন্য কৌশলগত নিরাপত্তায় পরিণত হয়েছে। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে হিমালয় পর্বতমালা থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, পদ্মা এবং তিস্তা নদীর অববাহিকায় জমা হওয়া বিপুল পরিমাণ কোয়ার্টজ-সমৃদ্ধ বালুরাশি বাংলাদেশের জন্য এক অভাবনীয় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। সাধারণ এই নদীর বালু প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে মূল্যবান খনিজে পরিণত করে বাংলাদেশও যুক্ত হতে পারে বিশ্ব প্রযুক্তির সরবরাহ শৃঙ্খলে।
গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বালুর প্রবাহ ও উপাদানবাংলাদেশ হলো বিশ্বখ্যাত গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপের কেন্দ্রস্থল। ভূতাত্ত্বিক গবেষণা ও আন্তর্জাতিক নদীর প্রবাহ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি বছর নদী ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পলি ও বালুরাশি বেঙ্গল বেসিন ও বঙ্গোপসাগরের অভিমুখে প্রবাহিত হয়। নদীর এই বালু কেবল রাস্তা নির্মাণ বা গৃহনির্মাণের সাধারণ উপাদান নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর মোট হালকা খনিজের মধ্যে গড়ে ৮৮.৭ শতাংশই কোয়ার্টজ এবং ৬.৫ শতাংশ ফেল্ডস্পার। এতে গড়ে ৮ থেকে ১৫ শতাংশ অত্যন্ত মূল্যবান ভারী খনিজ পদার্থ রয়েছে, যার মধ্যে জিরকন, ইলমেনাইট, রুটাইল, গার্নেট, ম্যাগনেটাইট ও মোনাজাইট প্রধান।
সূত্রে জানায়, বার্ষিক অর্থনৈতিক বাজার মূল্য ও রফতানির সম্ভাবনাবাংলাদেশের নদীর বালুকে সরাসরি রপ্তানি না করে পরিশোধিত শিল্প কাঁচামাল ও ইলেকট্রনিক উপাদানে রূপান্তর করা গেলে এটি দেশের অর্থনীতিতে প্রধান রাজস্ব আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে মূলত সমন্বিত সার্কিট (আইসি) ডিজাইন সেবার মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর খাত থেকে বার্ষিক মাত্র ৫০ লাখ ডলার (প্রায় ৬০ কোটি টাকা) আয় করে থাকে।
বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিআইডিএ) পর্যালোচনা অনুযায়ী, নদীর বালু পরিশোধিত করে হাই-পিউরিটি সিলিকা, আইসি ডিজাইন এবং টেস্ট-প্যাকেজিং খাতের বিকাশ ঘটানো গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক ১ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকা) এবং ২০৩১ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১,২০,০০০ কোটি টাকা) রফতানি আয় অর্জন করা সম্ভব।
গ্লাস-গ্রেড বনাম সেমিকন্ডাক্টর-গ্রেড: বৈজ্ঞানিক বাস্তবতায় নদীর বালু নিয়ে গবেষণায় যেমন বিপুল সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, তেমনি বৈজ্ঞানিক সততা বজায় রেখে তথ্যের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণও প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশের নদীর বালুকে রিভার্স ফ্লোটেশনের মতো সহজ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিশোধিত করে ৯৯.৫% বিশুদ্ধ গ্লাস-গ্রেড সিলিকা তৈরি করা বেশ সহজ, যা দিয়ে দ্রুত দেশীয় কাচ শিল্প, ফ্লোট গ্লাস, সিরামিক এবং অপটিক্যাল ফাইবার শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। তবে কম্পিউটার চিপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পলিসিলিকনের জন্য দরকার অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার বিশুদ্ধতা, যা হতে হয় অন্তত ৯৯.৯৯৯৯৯৯৯% (৯টি নাইন বা ৯এন)। চিপ শিল্পে পিপিবি মাত্রার ভেজাল ধাতুও একটি পুরো চিপকে নষ্ট করে দিতে পারে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নদীর বালু সরাসরি সেমিকন্ডাক্টর-গ্রেড কোয়ার্টজের মানদ- পূরণ করে কি না, তা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত নয়। এর জন্য প্রয়োজন অতি-সূক্ষ্ম উপাদান পরীক্ষা ও রাসায়নিক পরিশোধন সম্পর্কিত অধিকতর গবেষণা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, হিমালয় থেকে ধেয়ে আসা নদীগুলোর পলি ও বালুরাশি বাংলাদেশের কেবল নদী নাব্যতা সংকটের কারণ নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত ও পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে এটি দেশের আগামী দিনের অর্থনীতির রক্ষাকবচ হয়ে উঠতে পারে। কোটি কোটি টন জমা হওয়া নদীর এই কোয়ার্টজ বালুকে রিফাইন বা শোধন করে ‘সাদা সোনায়’ পরিণত করতে সরকারি নীতিগত সমর্থন, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং দেশীয় ভূতাত্ত্বিক গবেষণার সমন্বয় ঘটানো এখন সময়ের দাবি। সঠিক রোডম্যাপ অনুসরণ করলে ২০৫০ সালের দিকে বাংলাদেশও বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ও হাই-টেক শিল্পের বাজারে নিজের সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।