দ্বিতীয় কিস্তি
উপমহাদেশের ইতিহাসে আগস্ট মাসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট বৃটিশদের কাছ থেকে পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। তাদের এ স্বাধীনতাপ্রাপ্তি উপলক্ষে পাকিস্তান এবং ভারত উভয় দেশের সরকার ও জনগণকে আমি অভিনন্দন জানাই।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট আরো দুটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান ১৫ আগস্ট মধ্য সোপানের একদল মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তার ক্যুতে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ ঢাকায় তার বাসভবনে নির্মমভাবে নিহত হন। আবার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র শ্রমিক কৃষক জনতার এক গণঅভ্যুত্থানে শেখ মুজিবের কন্যা ও প্রায় দু’দশকের স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে প্রাণভয়ে সেনাবাহিনীর সহায়তায় বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারযোগে এক বস্ত্রে; এমনকি ডাইনিং টেবিলে দুপুরের পরিবেশন করা খাবারও পরিত্যাগ করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা হয়ে দিল্লীতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। তার পিতার মৃত্যুতে বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তিকে যেমন ইন্না লিল্লাহ বলতে শোনা যায়নি, তেমনি শেখ হাসিনার পতনেও কাউকে আফসোস করতে দেখা যায়নি। বলাবাহুল্য, পাকিস্তান আন্দোলনের এক সময়ের অত্যন্ত সক্রিয় ছাত্রকর্মী এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দি ও মওলানা ভাসানীর সহচর শেখ মুজিব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই কিছু কিছু নাস্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ও কংগ্রেসপন্থী নেতাদের নিয়ে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ১৯৪৯ সালে প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পরে হিন্দুদের দলে ভেড়ানোর জন্য আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ গঠন করেন। মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ঘঅচ) গঠন করেন। ভাসানী চীন তথা পিকিং অনুসৃত কম্যুনিজমের দিকে কেবলা পরিবর্তন করায় ন্যাপের একটি গ্রুপ ওয়ালি খানের নেতৃত্বে (সীমান্ত গান্ধী খ্যাত আবদুল গাফফার খানের পুত্র) ন্যাপ (মস্কো) গ্রুপের নামে আত্মপ্রকাশ করে। মুসলিম লীগ দুর্বল হয়ে পড়ে। দলটি জেনারেল (পরে ফিল্ড মার্শাল) আইয়ুব খানের নেতৃত্বে কনভেনশান মুসলিম লীগ, খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে কাউন্সিল মুসলিম লীগ এবং খান আবদুল কাইয়ূম খানের নেতৃত্বে কাইয়ূম মুসলিম লীগ নামে তিন খণ্ডে বিভক্ত হয়। অন্যদিকে ভারতীয় অর্থ প্ররোচনা ও ইন্ধনে আওয়ামী লীগ ষড়যন্ত্রের আখড়ায় পরিণত হয়। পঞ্চাশের দশকে অজ্ঞাত স্থানে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্ববঙ্গের অস্থায়ী সরকার গঠন, ষাটের দশকে আগরতলা ষড়যন্ত্র প্রভৃতি বিচ্ছিন্নতাবাদেরই অংশ ছিল বলে ধারণা করা হয়।
পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অব্যাহত অপপ্রচার চালিয়ে বলা হয় যে, পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ, তার রফতানি আয়ের বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানীরা সেখানে সদ্দাদের বেহেশত তৈরি করছে। ষাটের দশকের শেষের দিকে UCB থেকে প্রকাশিত (United Commarcial Bank) অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের ব্রেনচাইল্ড প্যানেল রিপোর্টের বর্ণিত পূর্ব ও পাশ্চিমের বৈষম্য এবং ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ শিরোনামে প্রচারিত আওয়ামী লীগের বিদ্বেষপূর্ণ প্যাম্পলেট/লিফলেট হুজুগে বাঙালি মনকে আরো বিষিয়ে তোলে। এ সময় পূর্ব পাকিস্তানসহ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা মাথাচরা দিয়ে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তানে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা তথা দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর কুঠারাঘাত করে; নির্বাচনে রায় মেনে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক শাসকদের ওপর আক্রোশ বৃদ্ধির পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ এবং উর্দুভাষী বিহারী মুসলমানরাও তাদের শত্রুতে পরিণত হয়। এর সাথে যোগ হয় পাকিস্তান বিরোধী ভারতীয় ষড়যন্ত্র। পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন প্রথমে গেরিলা স্টাইলের মুক্তিযুদ্ধ, সন্ত্রাস ও সরকারি স্থাপনার ওপর হামলা ও ধ্বংসাত্মক তৎপরতায় রূপ নেয় এবং ১৯৭১ সালের তিন তারিখে এসে তা ভারত-পাকিস্তনÑ দুদেশের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধে পরিণত হয়।
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানের প্রস্তুতি ছিল না। এ সুযোগে ভারত-বাংলাদেশ যৌথবাহিনী গঠিত হয় এবং এ বাহিনীতে সশস্ত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য যেমন পুলিশ, রাজাকার, ইপিআর ও ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর কিছু সদস্যও যোগ দেন। ফলে পাকিস্তান বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ বিমানের কাভারেজও ছিল খুবই নগণ্য এবং অবস্থার এমন অবনতি ঘটে যে, ১৩ দিনের মাথায় অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে জনবল ও জড়সম্পদের অধিকতর ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর লক্ষ্যে জেনারেল এ এ কে নিয়াজীর নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারতীয় ও বাংলাদেশ যৌথ নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারতীয় ও বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করে। মুসলিম জাতির ১৪শ’ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম মুসলিম বাহিনী একটি অমুসলিম বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করলো। এই আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের পতন হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি শেখ মুজিবর রহমান পাকিস্তানের লায়ালপুর জেল থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন ও দিল্লী হয়ে ১০ জানুয়ারি ঢাকা পৌঁছেন এবং নবগঠিত বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। মার্চ মাসে তার সরকার পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত এমএনএ এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত এমপিত্রদের নিয়ে গণপরিষদ গঠন করেন এবং তার মন্ত্রিসভার বিদেশমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। ড. কামাল হোসেন মুজিববাদের (Mujibism) চারটি মৌলক বিশ্বাস তথা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র (Natinahsm, Secularism, Socialism and Democracy) নিয়ে ভারতীয় সংবিধানের আদলে সংবিধানের খসড়া তৈরি করে ১৯৭২ সালের নবেম্বর মাসের ৪ তারিখে গণপরিষদের অধিবেশনে পেশ করেন এবং তা গৃহীত হয় এবং প্রথম বিজয় দিবস অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর তা কার্যকর করা হয়। মুজিব প্রথমত প্রেসিডেন্ট হিসাবে ক্ষমতা নেন। পরে সংবিধান সংশোধন করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামিরক অভ্যুত্থানে নিহত হবার আগে জানুয়ারি মাসে চতুর্থ বারের ন্যায় সংবিধান সংশোধন করে তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পাশাপাশি দেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণার পাশাপাশি তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ Bangladesh Krishak Sramik Awami League) তথ্য বাকশাল (BAKSAL) নামে একটি মাত্র রাজনৈতিক দল কায়েম করেন। বিলুপ্ত ঘোষিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সামরিক বেসামরিক সকল কর্মকর্তা এবং কর্মচারীর জন্য ‘বাকশালে’ যোগদান বাধ্যতামূলক করা হয়। তদুপরি দু’টি নিজ দলীয় ও দু’টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পত্রিকা ছাড়া দেশের যাবতীয় পত্রপত্রিকা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সেনাবাহিনীতে তখনো প্রচুর সংখ্যক পাকিস্তানী রিক্রুট কমিশনড ও নন কমিশনড কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন। তাদের অপাংতেয় করে তোলার উদ্দেশ্যে রক্ষীবাহিনী নামক সেনাবাহিনীর একটি প্রতিপক্ষ বাহিনী গড়ে তোলা হয়। তাদের অত্যাচার ব্যাপকতা লাভ করে। ফলে সর্বত্র অসন্তোষ দেখা দেয়।
শেখ মুজিব ক্ষমতা গ্রহণের অল্প কিছু দিনের মধ্যেই মানুষের মোহমুক্তি ঘটতে থাকে। আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ আওয়ামী ঘরানার শীর্ষস্থানীয় প্রায় সকল নেতাকর্মী, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য সকলের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, চোরাচালানি মওজুদদারি, কালোবাজারি প্রভৃতি অপকর্মে এতই জড়িয়ে পড়ে যে, দুঃশাসন-জনদুর্ভোগ মুজিব প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। চীনপন্থী বয়োবৃদ্ধ রাজনীতিবিদ মওলানা ভাসানী প্রকাশ্যে শেখ মুজিবকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন যে, তুমি বাংলাদেশকে স্বাধীন করোনি, বরং বাংলাদেশের নামে একটি লুটপাট সমিতি কায়েম করেছ। খাদ্য পণ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রত্যেকটি দ্রব্য, সার, বীজ ওসুধ সব কিছুর দাম আকাশচুম্বি হয়ে পড়ে। পাকিস্তান আমলের (১৯৭১) চার আনা সের মূল্যের লবণ প্রতি সের আশি টাকায় পৌঁছে। দশ আনা (৬২ পয়সা) সেরের মরিচের দাম উঠে ২৫০ টাকা। ধনী নির্ধন নির্বিশেষে সকল শ্রেণী পেশার মানুষ তাদের ক্রয়ক্ষমতা হারায়। পাকিস্তানের ২৪ বছরে বাংলা ভূখণ্ড কখনো দুর্ভিক্ষ দেখেনি; কিন্তু সদ্যজাত বাংলায় মুজিব ক্ষমতা গ্রহণের দু’বছর পার না হতেই প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষে দেশী বিদেশী পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী দশ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়।
জনাব মাহবুবুল আলম চাষী চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘে ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে পক্ষ ত্যাগ করে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমানে মুজিবনগর) গঠিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পররষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন এবং ১৯৮৩ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর সড়ক পথে হজে¦ যাবার পথে সৌদী আরবের আল কাশিম প্রদেশের নির্জন মরুভূমিতে মৃত্যুবরণের আগ পর্যন্ত তিনি সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবাধর্মী কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। শেখ মুজিব দেশে প্রত্যাবর্তন করার পর জনাব চাষীকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ করেন। দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। এই হতাশা ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি তার “In Qust of Shawnirvar” গ্রন্থে লিখেছেন, “Many of the Freedom Fighters, who were once eager to sacrifice their lives for the Cause of thair motherland were now trying to devour the entire nation. Excesses comonitted by them made normal work impossible. Situation became so unmanageable that once a leader of foraign delegation asked me whether the country was really liberated, or it was conquered. I wanted to know why he was asking the question. He told in reply that in a liberated country everybody felt save and happy while in a conquered country people were afraid and conquerers losted and plundered and conquered land. In dhis opinion the general condition in Bangladesh was closer to the latter.
অর্থাৎ একদা যে মুক্তিযোদ্ধাদের মাতৃভূমির জন্য প্রাণ দিতে উদগ্রীব দেখা গেছে, এখন দেখা যাচ্ছে সমগ্র জাতিকে তারা গিলে খেতে চেষ্টা করছেন। তাদের বাড়াবাড়ি স্বাভাবিক কাজকর্মকে অসম্ভব করে তুলেছে। পরিস্থিতির এতই অবনতি ঘটেছে যে একবার বিদেশী প্রতিনিধি দলের একজন নেতা আমাকে জ্ঞিাসা করেই বললেন যে, তোমাদের দেশটা আসলেই কি স্বাধীন হয়েছে না তোমরা জয় করে নিয়েছ? আমি তার এই প্রশ্নের কারণ জিজ্ঞাসা করায় উত্তরে তিনি বললেন, “স্বাধীন দেশের প্রত্যেকটি মানুষ নিজেকে নিরাপদ ও সুখী বলে মনে করে। পক্ষান্তরে বিজিত দেশের লোকেরা সর্বদা ভীতসন্ত্রস্ত থাকে; কেননা বিজয়ীরা বিজিত দেশের সম্পদ লুটপাট করে এবং জনগণের ওপর অত্যাচার চালায়।
বাংলাদেশ বর্তমান অবস্থা শেষোক্ত ব্যক্তিদের কাছাকাছি বলে মনে হয় (In Qust of Shawnirvar page 85-86) আমার এত কথা বলার উদ্দেশ্য একটাই আগস্ট মাসে পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা উপলক্ষে উভয় দেশের আপামর জনতাকে অভিনন্দন জানানো। যতই মর্মান্তিক ঘটনাই হোক না কেন, আগস্টের ১৫ ও ৫ তারিখে শেখ মুজিব ও তার কন্যার যথাক্রমে হত্যা ও বিতাড়নের জন্য আক্ষেপ করার ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশের জন্য। এটা হচ্ছে দেশপপ্রমিক বাংলাদেশীদের আন্তরিক অপারগতা।
গত সপ্তাহে আমাদের তিন সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদের করাচী প্রেস ক্লাব এবং নিখিল পাকিস্তান সংবাদপত্র মালিক সমিতি কর্তৃক অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালবাসার অংশ হিসেবে করাচী প্রেস ক্লাব মিলনায়তন ও করাচী বোর্ট ক্লাবে সংবর্ধনা প্রদান এবং যথাক্রমে লাঞ্চ ও ডিনারের আয়োজন করার কথা বলেছিলাম। করাচী প্রেস ক্লাব পাকিস্তানের সর্ব প্রথম প্রেস ক্লাব। ১৯৫৮ সালে এর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ক্লাবটির প্রেসিডেন্ট জনাব ফাজিল জামিলী এবং সেক্রেটারি জনাব আসলাম খান। সংবর্ধনা সভায় প্রেস ক্লাবের নির্বাহী কমিটির সদস্যরা ছাড়াও সিন্দু প্রদেশের মহিলা উন্নয়নমন্ত্রী বেগম শাহিনা শের আলীও উপস্থিত ছিলেন। ষাটের দশকে তৎকালীন, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মিনহাজ বার্না এই ক্লাবের সভাপতিও ছিলেন। তিনি আমার ব্যক্তিগত বন্ধুও ছিলেন।
করাচী প্রেস ক্লাবটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী ক্লাব। সাংবাদিক, সমাজকর্মী, লেখক, গবেষক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইউটিউবার, ডিজিটাল জার্নালিস্ট, মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষক কন্টেন্ট রাইটার, অভিনেতা, শিল্পী, ফটোগ্রাফার প্রুপ রিডার, কবি সাহিত্যিক সকল পেশাজীবীর জন্য এই ক্লাবের সদস্য পদ উন্মুক্ত। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ২১০০-এর অধিক, তবে এদের মধ্যে সাংবাদিকদের সংখ্যা ৯০০।
সভায় বাংলাদেশ সম্পর্কে পাকিস্তানী সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসা ও আগ্রহের অন্ত ছিল না। প্রসঙ্গক্রমে পাকিস্তানে আটকেপড়া বাংলাদেশীদের প্রশ্নটি উঠে আসে। পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার পরও বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই তাদের কথা জানতে চেয়েছেন। আমার একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল করাচীর নাজিমাবাদ এলাকাতেই বাঙালিদের বসবাস। তা সঠিক নয়, বাংলাদেশীদের বর্তমান সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। করাচীর অন্যূন ১০০টি বস্তি বা গ্রামে (শহরতলী) তাদের বসবাস। এই জনপদগুলোর মধ্যে প্রধান প্রধান এলাকা গুলো হচ্ছে : ১। মাচ্ছার কলোনি, ২। মুসা কলোনি, ৩। ইব্রাহিম কলোনি, ৪। চট্টগ্রাম কলোনি, ৫। লিয়ারি কলোনি, কোরাঙ্গী ও রাঙ্গি টাউন, বেলাল কলোনি, জিয়াউল হক কলোনি প্রভৃতি। উল্লেখ্য, জেনারেল আইয়্যূবের আমলে শুক্কুর বাঁধ গোলাম মোম্মম বাঁধ, চাশম বাঁধসহ সিন্ধু অববাহিকা ও পাঞ্জাবের রাবি, সাতলেজ, ঝিলানী, চেনার অববাহিকায় চাষাবাদ উৎসাহিত করার জন্য তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে হাজার হাজার কৃষক পরিবারকে পশ্চিম পাকিস্তানে পুনর্বাসন করা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানীদের ধান চাষে অভিজ্ঞতা ছিল না। সেখানে কলা, আম, পেয়ারা, আনারস প্রভৃতির চাষও ছিল নগণ্য। বর্তমান পাকিস্তান কৃষিসমৃদ্ধ একটি দেশে, তাদের রফতানিকৃত চাল দুনিয়ার সর্বোৎকৃষ্ট চাল। আম চাষে পাকিস্তান মান ও পরিমাণ উভয় দিক থেকেই বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে। কৃষির নতুন প্রযুক্তি বিশেষ করে টিস্যু কালচার তাদের উন্নতির শিখরে নিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানে প্রচুর খেজুর উৎপন্ন হয়, আকারে বড় না হলেও মিষ্টি ও সুস্বাদু। তারা জয়তুন চাষও শুরু করেছে। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সফরের সময় পাঞ্জাব, রাওয়ালপিন্ডি ও করাচীর যে সমস্ত এলাকা ধু-ধু ভুরুভূমি ছিল সে সমস্ত এলাকা এখন সেচ সুবিধা পেয়ে সবুজ শস্যশ্যামল শস্য ক্ষেতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রবাসীরা এখন অনেকেই পাকিস্তানীদের সাথে মিশে গেছেন। বেশিরভাগ লোক ভোটধিকার পেয়েছেন। তবে এনআইডি না পাওয়া লোকের সংখ্যা প্রচুর আছে। এদের বেশির ভাগই ১৮ বছরের কম বয়েসি। তবে কৃষি, শিল্প, রাস্তা-ঘাট, পুল-কালভার্টসহ সামগ্রিক উন্নয়নে পাকিস্তানের অগ্রগতি লক্ষণীয়। যারা বলতেন অবিভক্ত পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তানের অর্থ-সম্পদ লুট করে পাকিস্তানীরা পশ্চিম পাকিস্তানকে সমৃদ্ধ করেছে, আমি বিষ্মিত হয়ে ভাবি, গত ৫৬ বছরে তারা এগিয়ে গেলো কি ভাবে? (চলবে)