বর্তমানে আমরা যে সভ্যতায় বসবাস করছি, তার একটি বিশ্বব্যবস্থাও আছে। আস্থাহীনতার এ বিশ্বব্যবস্থায় মানুষ সন্তুষ্ট নয়। বর্তমান বিশ^ব্যবস্থা শুধু বৈষম্যমূলক নয়, জবরদস্তিমূলকও বটে। সাথে রয়েছে নানা দূষণ। শুধু কি পরিবেশ দূষণ, নৈতিক দূষণ আরও ভয়ংকর। সব মিলেইতো সভ্যতা। বিশ্বব্যবস্থা যখন ভালো নয়, তখন সভ্যতাকে মন্দ বলেই অভিহিত করতে হয়। তৃতীয় বিশে^র ব্যাপক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা এরকমই। অবশ্য যারা দাম্ভিক, যারা মারণাস্ত্রে শক্তিশালী তাদের ব্যাখ্যা অন্যরকম। সেই ব্যাখ্যায় চাতুর্য আছে, কূটনীতি আছে; তবে সত্য কতটা অ ছে, সেই প্রশ্ন প্রকট। রকমফেরের এই সভ্যতার যে বিশ্বব্যবস্থা, তার প্রভাব পড়েছে ভূরাজনীতিতে, আঞ্চলিক রাজনীতিতে; এমন কি অলিগলিতেও। ফলে অমানবিক ও অনাকাংখিত এক বাতাবরণে এখন পৃথিবীর ব্যাপক জনগোষ্ঠীর বসবাস। মানুষ এখন খুশি নয়, সন্তুষ্ট নয়। কোথাও আশ্বাসের কথা শুনলে, ন্যায়ের বার্তা পেলে, মানুষ সেদিকে তাকায়, স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরতে চায়। গত ২ জুলাই কি তেমন এক ঘটনা ঘটলো ঢাকায়?
২ জুলাই বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিল ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্যসমাপ্ত চীন সফর উপলক্ষে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বিভিন্ন বিষয়ে বেশ স্পষ্ট বক্তব্য রেখেছেন। কূটনীতিকরা সাধারণত এত খোলামেলা কথা বলেন না। এখানে কূটনীতির মুখোশটা কম ছিল। তবে কি চীনা রাষ্ট্রদূত কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলেন? সেটা আবার কি করে হয়, একেতো পেশাদার ঝানু কূটনীতিক- তাও আবার চীনের মত রাষ্ট্রের। আমরা জানি, একজন কূটনীতিক স্বদেশের স্বার্থেই কথা বলেন, কাজ করেন- সেভাবেই তারা প্রশিক্ষিত। তবে কূটনীতিকরা কাজ করেন নানা কৌশলে। এর একটা হলো, উইন-উইন কৌশল। যেখানে একপক্ষের নয়, বরং উভয়পক্ষের বিজয়ের একটা আবহ থাকে। ২ জুলাইয়ের সংবাদ সম্মেলনে কি তেমন একটা আবহ ছিল? ওই সংবাদ সম্মেলনে চীনা রাষ্ট্রদূত বিদেশি হস্তক্ষেপ, তিস্তা প্রকল্প, সামরিক সহযোগিতা, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ পরবর্তী যুগ, ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডোর, চাইনিজ ইকোনমিক জোন বিষয়ে কথা বলেছেন। আসলেই অবাক হওয়ার মত ব্যাপার। একটি সংবাদ সম্মেলনে এত বিষয়ে কথা- যা স্পর্শ করেছে ভূরাজনীতি, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনকে ভারতের বিষয়ও এখানে বেশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্নের ধরন এবং জবাবের মুন্সিয়ানা সব সময়ই একটি আকর্ষণীয় বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। ২ জুলাইয়ের সাংবাদিক সম্মেলনের বিষয়-আশয় ও পরিবেশে একটু প্রবেশ করা যাক। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন- আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর স্পষ্টভাবে বল হয়েছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যে কোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ চীন প্রত্যাখ্যান করবে। আপনি বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন? সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, চীন যে কোনো দেশে যে কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। যে কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে বাংলাদেশের পাশে আছে চীন। বাংলাদেশ বর্তমানে যে ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে সে ব্যাপারে আমরা পুরোপুরি অবগত আছি। চীনও একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। অনেক বিদেশি অপশক্তি চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায়। কাজেই বাংলাদেশের কাছে এই বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া হয়েছে, যে কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে চীন বাংলাদেশের পাশে আছে। তিস্তা প্রকল্পের ব্যাপারে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশের আগ্রহেই আমরা এই প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছি। তিস্তা বাংলাদেশের নিজস্ব প্রকল্প। রাষ্ট্রদূত বলেন, আমাদের একটি নিখুঁত ও কার্যকর সম্ভাব্যতা যাচাই প্রয়োজন। আপনারা জানেন, নদীর অববাহিকায় বেশ কিছু জটিল পরিস্থিতি রয়েছে। তাই এই প্রকল্প শুরু করার আগে আমাদের এই সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। আমাদের দিক থেকে এটাই হলো মূল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ যত দ্রুত চাইবে, চীন তত দ্রুতই এগোবে। এটাই আমাদের অবস্থান। তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের উদ্বেগের বিষয়ে জানতে চাইলে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, তিস্তা নদী প্রকল্পটি বাংলাদেশের নিজস্ব প্রকল্প। এটি আপনাদেরই প্রকল্প। এখানে চীনের সহযোগিতার বিষয়টি বাংলাদেশ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বা লাভজনক হিসেবেই বিবেচনা করবে। এটি মূলত মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি সহযোগিতা, যার সঙ্গে এই নদীর অববাহিকায় বসবাসকারী ১০ লাখেরও বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে আছে। মূলত এই উদ্দেশ্যেই চীন সহায়তা দিতে আগ্রহী। কারণ এটি বাংলাদেশের মানুষের, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের মানুষের একটি বড় প্রয়োজন। এখানে তৃতীয় কোনো পক্ষের উদ্বেগ নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তিস্তা প্রকল্পে চীনের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। এমন বক্তব্যে বাংলাদেশের মানুষ খুশি। কারণ এখানে প্রয়োজনের পাশাপাশি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিষয়টিও সমুন্নত হয়েছে।
সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি বিশেষ করে চীন থেকে জে-১০সি মাল্টিরোল ফাইটার জেট কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করতে সম্মত হয়েছে চীন। তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে আপনারা হয়তো লক্ষ্য করেছেন যে, যৌথ ইশতেহারে উভয়পক্ষই মতবিনিময়, সফর, প্রশিক্ষণসহ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি উভয়পক্ষই জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বিষয়ক কার্যক্রমে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্পৃক্ততা বজায় রাখতে একমত হয়েছে। তাই আমি যা বলতে পারি তা হলো, আমাদের সহযোগিতা অত্যন্ত ব্যাপক। প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও এর একটি অংশ। তবে আমি নির্দিষ্ট কোনো ক্রয় প্রকল্পের কথা উল্লেখ করার মতো অবস্থানে নেই। আমি এই বিষয়ে মন্তব্য করতে পারছি না। তবে আমার বলা উচিত যে, ‘শেয়ার্ড ফিউচার’ বা অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়ের স্তরে আমাদের সম্পর্ক উন্নীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ সব ক্ষেত্রেই আরো বেশি সহযোগিতা দেখতে পাবো। এখানে একজন পেশাদার কূটনীতিকের পারঙ্গমতা আমরা লক্ষ্য করলাম। যে মাত্রায় যে পরিমিতিবোধের সাথে কথা বলা প্রয়োজন তেমনিটিই করলেন রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডোরের বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত বলেন, এটি কোনো নতুন উদ্যোগ নয়। আমরা ১৫ বছর আগে বিসিআইএমের প্রস্তাব করেছিলাম। কিছু অগ্রগতি হলেও চীন যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবে তা এগোয়নি। যেহেতু বাংলাদেশ আঞ্চলিক সংযুক্তি চাইছে, চীনও আরো বেশি আঞ্চলিক সংযুক্তি চাইছে। আমি বিশ^াস করি, মিয়ানমারও এধরনের সহযোগিতা চায়। চীনা রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, অন্য দেশের ব্যাপারে আমরা খোলা মন নিয়ে আছি। তারা যদি তৈরি থাকে, তবে আমরা তাদের যুক্ত করতে তৈরি আছি। এটা তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। চীন এখন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে অর্থনৈতিক করিডোর বিষয়ে এগিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতার কারণে স্থলপথে করিডোর প্রতিষ্ঠার সমস্যা নিয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রাথমিকভাবে বন্দর ও সমুদ্রপথে যুক্ততার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে পারি।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গড়ে ওঠা চাইনিজ ইকোনমিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে ৩০টিরও বেশি চীনা কোম্পানি প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত। বিনিয়োগ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আনোয়ারার চাইনিজ ইকোনমিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন প্রকল্পে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। প্রায় ১০ বছর যাবত প্রকল্পটি আটকে ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর মাত্র চার মাসের মধ্যেই এ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। রাষ্ট্রদূত বলেন, চীনা বিনিয়োগের জন্য একটি কার্যকর প্লাটফর্ম তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন-এর সংবাদ সম্মেলনটি নানা কারণেই আমাদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তো তার এবং চীন সরকারের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করার জন্যই আয়োজনটি করেছিলেন। তিনি বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন, সামরিক সহযোগিতা প্রসঙ্গেও। ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডোর ও চাইনিজ ইকোনমিক জোনও তার বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এসবের মধ্যে ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতির বিষয়-আশয় ও প্রাসঙ্গিক হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে ভারত ও ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ভূমিকা যে বাংলাদেশ ও এর জনগণের উন্নয়ন ও মুক্তির পক্ষে ছিল না, তাও উপলব্ধি করা গেছে। বিশ^রাজনীতি ও কূটনীতি আসলে এক জটিল বিষয়। চাতুর্য ও নীতিভ্রষ্ট আচরণের কারণে এখন পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়েছে আস্থার সংকট। কেউ কাউকে বিশ^াস করে না। কে কার ওপর টক্কর দেবে, কে কাকে ভয় দেখাবে- এগুলো হয়ে উঠেছে কৌশলের বিষয়। এসব করতে গিয়ে অনেকেই জড়িয়ে পড়েছে মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতায়। এর মধ্যে আবার তৈরি হয়েছে এক ধরনের ভারসাম্য- যার নাম ‘ভীতির ভারসাম্য’। ট্রাম্প ও পুতিন পরস্পরকে আক্রমণ করবে না, কারণ ওদের কাছে আছে ভয়াবহ মারণাস্ত্র। তবে ভারত বাংলাদেশে বা অন্য দুর্বল দেশে আক্রমণ চালাতে পারে। উগ্রতা, সংকীর্ণতা ও আগ্রাসী নীতি এক্ষেত্রে কাজ করতে পারে। ভারতের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘুদের ওপর ওই সবের কিছু আলামত লক্ষ্য করা যায়। এখন চীন বা অন্য কোনো দেশ কি বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবে? নাকি নিজের বাঁচার পথ নিজেকেই তৈরি করতে হবে বাংলাদেশকে।