উলামায়ে কেরামকে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান রূপকার হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি। তিনি বলেছেন, উলামায়ে কেরাম শুধু মসজিদে ইমামতি, ওয়াজ-নসিহত কিংবা খুতবার মধ্যে নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। জাতির ক্রান্তিলগ্নে তাদের সঠিক পথনির্দেশনা, নেতৃত্ব ও আদর্শিক ভূমিকা পালন করতে হবে।

গতকাল শনিবার সকাল ৯টায় রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটি আয়োজিত জাতীয় উলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

জামায়াত আমীর বলেন, উলামায়ে কেরামের ইলম চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে কুরআন ও সুন্নাহ। আল্লাহর বিধান মানার পূর্ণাঙ্গ মডেল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তার আনুগত্যের বাস্তব মডেল সাহাবায়ে কেরাম। মুসলিম উম্মাহ এই আদর্শ অনুসরণ করলে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

উলামায়ে কেরামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমীর বলেন, সত্য ও ন্যায়ের কথা বলতে হবে; তবে কাউকে অপমান, ছোট করা বা কটূক্তি করা যাবে না। দ্বীনের দাওয়াত এমনভাবে দিতে হবে, যাতে মানুষের হৃদয়ে তা পৌঁছে যায়। তিনি কুরআনের নির্দেশনার আলোকে প্রজ্ঞা, উত্তম উপদেশ ও সুন্দর ভাষায় মানুষকে আহ্বান জানানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উলামায়ে কেরামের চিন্তা ও মত সবসময় এক হবে না। অতীতেও মতপার্থক্য ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে মতের ভিন্নতার কারণে কাউকে অসম্মান করা যাবে না। কেউ সমালোচনা বা কটূক্তি করলেও পাল্টা কটূক্তি না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিপক্ষের জন্য দোয়া করতে হবে এবং তার বক্তব্যে কোনো কল্যাণকর বিষয় থাকলে তা গ্রহণ করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে উত্তেজনামূলক বক্তব্য বা ‘আক্রমণাত্মক’ মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের পাল্টাপাল্টি আক্রমণ বন্ধ করতে হবে। কেউ আমাদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লেও আমরা পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ব না অর্থাৎ উসকানির জবাব উসকানি দিয়ে না দিয়ে ধৈর্য ও সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

দেশের মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে জামায়াত আমীর বলেন, বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে আলিয়া ও কওমি দুই ধারার শিক্ষারই প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, আলিয়া শিক্ষায় শিক্ষিতরা সমাজের প্রচলিত ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন, আর কওমি শিক্ষায় শিক্ষিতরা দ্বীনের মৌলিকত্ব ধরে রেখে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাই কোনো একটি ধারাকে বাদ দিয়ে নয়, বরং উভয় ধারার আলেম ও শিক্ষিত মানুষকে সম্মান ও সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যে জাতি জ্ঞান ও গবেষণায় যত বেশি এগিয়ে যায়, সেই জাতি বিশ্বকে তত বেশি নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। তিনি উলামায়ে কেরামসহ সবাইকে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। ইসলামী জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণাকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও বিভিন্ন যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের আগে তথ্য সংগ্রহ, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান যুগেও যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্য, গবেষণা, দক্ষতা ও প্রস্তুতির বিকল্প নেই।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আমরা যুদ্ধ চাই না; শান্তি চাই। তবে কেউ আক্রমণ চাপিয়ে দিলে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। ইসলামের যুদ্ধনীতির বড় অংশই আত্মরক্ষামূলক ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর বিজয় নয়, আমরা মানবতার বিজয় চাই। মানুষের কল্যাণ ও সুরক্ষাই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

জামায়াত আমীর বলেন, আল্লাহর বিধান ও ন্যায়নীতির আলোকে মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। দেশের মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, সত্য, ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় আপনাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে। এই দায়িত্ব আরও নিবিড় ও সুন্দরভাবে পালন করতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সত্য ও ন্যায়ের কথা বলতে গেলে বাধা আসতে পারে। কিন্তু সেই কারণে হকের কথা বলা থেকে বিরত হওয়া যাবে না। একই সঙ্গে কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে না।

বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে দেশের সব ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার মানুষকে সম্মানের সঙ্গে ধারণ করার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, পারস্পরিক সম্মান, ঐক্য, নৈতিকতা, জ্ঞানচর্চা ও আত্মসংযমের মাধ্যমে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। মানুষ নিজের নফস বা প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত না হয়ে যদি আত্মসংযম ও ন্যায়ের পথে বিজয়ী হতে পারে, তাহলেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

জামায়াত আমীর বলেন, ইসলামের কিছু বিষয় পালন করা সহজ এবং সেগুলো নিয়ে সমাজে আপত্তিও তুলনামূলক কম। কিন্তু বদর ও ওহুদের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে জুলুম ও বাতিলের বিরুদ্ধে সত্যের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো কঠিন। মক্কা জীবনে মহানবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তারা প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি, বরং ধৈর্য ও ত্যাগের মাধ্যমে নিজেদের ঈমান ও চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করেছেন।

মক্কা বিজয়ের ঘটনা উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বলেন, দীর্ঘদিনের নির্যাতন-নিপীড়নের পরও মহানবী (সা.) মক্কাবাসীর জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। তবে নিরীহ মানুষ হত্যাসহ গুরুতর অপরাধে জড়িত কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের মধ্য থেকেও কয়েকজনকে নিরাপত্তা দেয়া হয়।

তিনি বলেন, ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে ব্যাপকভাবে কঠোর শাস্তি কার্যকর হবে ইসলামের বিরুদ্ধে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে। অথচ ইসলামের ইতিহাসে প্রতিশোধের চেয়ে ক্ষমার দৃষ্টান্তই বেশি। মহানবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের শাসনামলে কতজনের ওপর হদ কার্যকর হয়েছিল, ইতিহাস থেকে তার তথ্য তুলে ধরতে হবে। মানুষ শুধু আইনের ভয়ে অপরাধ থেকে বিরত থাকত না; বরং আল্লাহর ভয় ও পরকালের জবাবদিহিতার বিশ্বাস তাদের নিয়ন্ত্রণ করত। মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি সৃষ্টি করা গেলে সমাজে অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব।

উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইমাম যেমন নামাযে নেতৃত্ব দেন এবং মুসল্লিরা তাকে অনুসরণ করেন, তেমনি সমাজের মানুষও উলামায়ে কেরামের জীবন ও আমল অনুসরণ করবে। এজন্য উলামায়ে কেরামের সতর্কতার মাত্রা সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি হওয়া প্রয়োজন।

বর্তমান সমাজে মানুষের সম্মান, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিশেষ করে নারীর নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে উলামায়ে কেরামকে সোচ্চার হতে হবে। সত্যকে সত্য এবং অন্যায়কে অন্যায় বলতে হবে।

‘মতবিরোধ নয়, ঐক্যেই গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’ স্লোগানে আয়োজিত এ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম। সম্মেলনে প্রস্তাবনা পেশ ও সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সেক্রেটারি ও তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ড. খলিলুর রহমান মাদানী।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি ও ড. এএইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে বিভিন্ন পেশা, শ্রেণি ও মর্যাদার মানুষ থাকলেও জনগণের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ধারাবাহিক ও সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে উলামায়ে কেরামের। কোনো বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, সমাজ পরিবর্তন কিংবা একটি সভ্যতা ও পরিবারের পরিবর্তনে সবচেয়ে নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারেন উলামায়ে কেরাম। সমাজে বিদ্যমান ইসলামের বিভিন্ন বিধান ও ফরজ দায়িত্ব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণার বেড়াজাল ছিন্ন করে ইসলামের সঠিক শিক্ষা মানুষের সামনে তুলে ধরতে উলামায়ে কেরামকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মাওলানা এটিএম মা’ছুম বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর উম্মতের জন্য রেখে যাওয়া আল্লাহর কিতাব ও তার সুন্নাহ মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধভাবে অনুসরণ করতে হবে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যে ইসলামী আদর্শ ও নেতৃত্বের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, বর্তমান মুসলিম সমাজে তার কতটা প্রতিফলন রয়েছে এবং উলামায়ে কেরাম সেই আমানত রক্ষায় কতটুকু ভূমিকা পালন করতে পেরেছেন। এ দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; প্রত্যেককে আল্লাহর কাছে এ বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে।

সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, বর্তমানে একটি শ্রেণি পরিকল্পিতভাবে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে নানা ধরনের বিতর্ক ও অপপ্রচার চালাচ্ছে। এ ধরনের কথাবার্তার জবাব দিতে গিয়ে আমাদের মূল কাজ থেকে বিচ্যুত হওয়া উচিত নয়। উলামায়ে কেরামের উচিত এসব বিষয় আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে নিজেদের দাওয়াত ও সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যাওয়া।

সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলমানরা যখন কোরআনকে ধারণ করেছে, তখন তারা পৃথিবীতে নেতৃত্ব দিয়েছে। আর যখন কোরআনের শিক্ষা থেকে দূরে সরে গেছে, তখন তারা দুর্বল ও পরাধীন হয়েছে। তাই মুসলমানদের উত্থান ও পতনের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, উলামায়ে কেরামের মর্যাদা অনেক উঁচু এবং সমাজে তাদের প্রভাব ও দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মানুষের কাছে ইসলামের সঠিক শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। মানুষের মধ্যে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, ন্যায়, ইনসাফ ও নৈতিকতার চেতনা জাগ্রত করতে হবে। দেশের মানুষ পরিবর্তন প্রত্যাশা করছে। জনগণের একটি বড় অংশ ন্যায়, ইনসাফ ও নৈতিকতার ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে চায়।

আবদুল হালিম আরও বলেন, মতপার্থক্যের কারণে পরস্পরকে অপমান, আক্রমণ বা বিভক্ত করা উচিত নয়। কোনো আলেমের বক্তব্য বা অবস্থানের সঙ্গে মতের অমিল থাকলেও তাকে সম্মান করতে হবে। ব্যক্তিগত আক্রমণ বা কটূক্তির মাধ্যমে দ্বীনের কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। কেউ কঠোর ভাষায় সমালোচনা করলেও তার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতে হবে। প্রতিপক্ষের কটূক্তির জবাব কটূক্তি দিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব হবে না। ধৈর্য, সৌজন্য ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করতে হবে।

জাতীয় উলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে সাতটি প্রস্তাব পেশ করা হয়। প্রস্তাবগুলো হলো ১. মাদরাসা ও কলেজে ইসলামী শিক্ষা সংকোচন বন্ধ করতে হবে। ২. মাদরাসার নারী শিক্ষার্থীদের ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের নির্দেশ প্রত্যাহার করতে হবে। ৩. উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে উলামা-মাশায়েখদের হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। ৪. প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। ৫. ইবতেদায়ী মাদরাসা জাতীয়করণ করতে হবে। ৬. ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সার্ভিস রুল ও পে-স্কেল দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ৭. ফিলিস্তিনসহ সকল দেশের মুসলিম হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।

এ ছাড়াও সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন, বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের সেক্রেটারি মাওলানা নুরুল আমিন এমপি, মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা তারিক মুনাওয়ার, কেন্দ্রীয় ওলামা বিভাগীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুস সামাদ, মুফতি ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার, মাওলানা ইসমাইল হোসেন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের ওলামা বিভাগের সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা মোশারফ হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ড. মীম আতিকুল্লাহ, মহানগর উত্তরের সাবেক সভাপতি ড. হাবিবুর রহমান ও তানজিমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাফেজ হাবীবুল্লাহ মোহাম্মদ ইকবাল।

আরও বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন, মাওলানা ফখরুদ্দিন আহমেদ, মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালী, মাওলানা বদরুল আলম, মাওলানা হাবিবুর রহমান, অধ্যক্ষ মাওলানা মহিউদ্দিন, মাওলানা আব্দুল মোমিন নাসেরী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আজহারী, মাওলানা সাদিকুর রহমান আজহারী ও মুফতি নূরুজ্জামান নুমানী।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন মো. কামাল হোসেন এমপি, ইসলামিক কানুন বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি মাওলানা আবু তাহের জিহাদী, মুফতি আলী হাসান উসামা, মাওলানা রুহুল আমিন, মাহবুব তাহের জাবেরি আল মাদানী, মোল্লা নাজিম উদ্দিনসহ সারাদেশ থেকে আগত সহস্রাধিক উলামা প্রতিনিধি।

বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আলোচনা সভায় ডা. শফিকুর রহমান

আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদরা জীবন দিয়ে দেশের মানুষকে মুক্ত করে দিয়েছেন। যে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ জীবন দিয়েছেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাওয়া যাবে না বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এখনো পর্যন্ত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করা শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানির শামিল। দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা না হলে সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

নেজামে ইসলাম পার্টির আমীর (ভারপ্রাপ্ত) মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সুবহানীর সভাপতিত্বে এবং মহাসচিব মুফতি মূসা বিন ইযহারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হক, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল হক চাঁন এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) ভাইস চেয়ারম্যান রাশেদ প্রধান, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইযহার প্রমুখ।

সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমীর বলেন, সরকার এখন একদলীয় শাসনের দিকে হাঁটছে। তারা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া অন্যের বিষয়ে সামান্য পরিমাণও ভ্রুক্ষেপ করছে না। তারা ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়। ফ্যাসিবাদীদের নিয়ে সরকার ফ্যাসিবাদমুক্ত রাষ্ট্র গঠন করতে চায়- এটি হাস্যকর। তিনি আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে।

ড. কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভোটের আগে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এখন ক্ষমতায় এসে সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে গেলে চলবে না। ক্ষমতার স্বাদে যদি জনগণের সঙ্গে করা ওয়াদা ভুলে যাওয়া হয়, তাহলে জনগণও একদিন ভুলে যাবে যে তিনি প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে যারা অযোগ্য ও স্বার্থান্বেষী লোকজন রয়েছে, তাদের সরাতে হবে। আপনার চারপাশের স্ক্রাব লোকগুলোকে সরান, না হলে তারা আপনাকে ডুবাবে। তিনি আরও বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রতি অটল থাকতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো ব্যক্তি বা দলের স্বার্থের চেয়ে জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে আবারও নতুন করে বিপ্লবের ডাক দেওয়া হবে। শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। এক জুলাই রক্ষার প্রয়োজনে আরও হাজার জুলাই সংগঠিত হতে পারে। তাই কোনো ধরনের টালবাহানা না করে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের একটাই দাবি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঠিক বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার করতে হবে। সরকার যত দ্রুত সংবিধান সংস্কার করবে, ততই তাদের জন্য মঙ্গল।

মামুনুল হক বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না। শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্রের কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে। জনগণের আকাক্সক্ষাকে পাশ কাটিয়ে কোনো সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারবে না।

জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা

বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। জনগণের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। জনগণের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়েই জুলাইয়ের প্রকৃত সার্থকতা আসবে। জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রত্যাশা থেকেই মানুষ আন্দোলনে নেমেছিল।

গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উপর ভিত্তি করে নির্মিত ‘জুলাই এখনো শেষ হয় নাই’ শীর্ষক স্থিরচিত্র প্রদর্শনীতে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকগণের পরিদর্শন শেষে তিনি এসব কথা বলেন।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে নানা শ্রেণি-পেশা ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের কোনো মানুষই নিপীড়ন থেকে রেহাই পায়নি। ক্ষমতাসীনরা নিজেদের দেশের মালিক এবং জনগণকে প্রজা মনে করতেন। ক্ষমতায় আসার পর তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে, এর মধ্য দিয়েই তৎকালীন সরকার ‘খুনের রাজনীতির সূচনা’ করেছিল।

তিনি বলেন, পরবর্তীতে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের একে একে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তিনি এসব ঘটনাকে ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, বিরোধী মত দমনের অংশ হিসেবে বহু মানুষকে হত্যা ও গুম করা হয়েছে। বিভিন্ন বাহিনী ও এজেন্সিকে মানুষ দমন ও গুমের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০১৮ সালে ছাত্রদের আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত সরকার কোটা ব্যবস্থা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে আবার ছাত্রসমাজ রাস্তায় নামে।

সংস্কার ও গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কারের প্রস্তাব তৈরি করা হয়। বিচারপতি ও বিচারক নিয়োগ এবং নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও নির্দলীয় ব্যবস্থার পক্ষে তাদের অবস্থান ছিল।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পাশাপাশি গণভোটের প্রস্তাবও সামনে আসে। জনগণ কোনো প্রস্তাবের পক্ষে রায় দিলে সেই রায় বাস্তবায়ন করা সবার দায়িত্ব। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পরও আগের ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন করেনি। বরং, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও দলীয়করণ আগের চেয়ে বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, সংসদের ভেতরে সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানানো হলেও তাতে সাড়া পাওয়া যায়নি। সংসদে ন্যায়বিচার ও অধিকার না পাওয়ায় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেন আমীরে জামায়াত।

‘জুলাই এখনো শেষ হয় নাই’ অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এটি কোনো সরকারের সফলতা তুলে ধরার আয়োজন নয়; বরং ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শাসনের চিত্র এবং সেই সময়ে জনগণের ওপর নিপীড়নের ইতিহাস তুলে ধরাই এর উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, যাদের ওপর এখন দেশের দায়িত্ব রয়েছে, তাদের জনগণের প্রত্যাশা উপলব্ধি করে দেশ পরিচালনা করতে হবে। কেউ জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে চাইলে অধিকার আদায়ের জন্য জনগণকে আবারও প্রস্তুত থাকতে হবে।

এ সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ডেনমার্ক, কানাডা, ইরান, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি, ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেডক্রস ঢাকার হেড অব ডেলিগেশনসহ ঢাকাস্থ কূটনৈতিক মিশনের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকগণ এ স্থিরচিত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন।