সোনালী আঁশ খ্যাত কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে এবার পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদন প্রায় শত কোটি টাকার। কিন্তু হঠাৎ দাম কমে যাওয়ায় লোকসানের শঙ্কা পাট চাষীদের।
উপজেলার যদুবয়রা, পান্টি, বাগুলাট ও নন্দলালপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে মাঠে পাট কাটা, ধোয়া ও শুকানোর ধুম লেগেছে। কৃষকরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন সোনালী আঁশ ঘরে তুলতে। এসব কাজে ফুরসৎ নেই চাষী পরিবোরে।
উপজেলা কৃষি অফিসেরর তথ্য মতে, এ বছর উপজেলার ৪ হাজার ৮৭৮ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৩ হাজার মেট্রিকটন পাট উৎপাদন হয়েছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকারও বেশি। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট চার হাজার টাকার উপরে বিক্রি হলেও বর্তমানে হঠাৎ দরপতন হয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ মিটিয়ে লাভ নিয়ে শঙ্কায় ভুগছেন চাষিরা।
কৃষকরা জানান, এ বছর প্রতিবিঘা পাট চাষে খরচ লেগেছে ২০ থেকে ২৭ হাজার টাকা। পাট উৎপাদন হয়েছে ৬ থেকে ৮ মণ। আর পাটকাঠি পাওয়া গেছে ৫০০-৬০০ আটি। দিন পনেরো আগে প্রতিমণ পাট চার হাজার টাকার বেশি বিক্রি হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাজারে গিয়েই তাদের মাথায় হাত পড়ছে।
উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, এ বছর বিঘা প্রতি ২০ থেকে ২৭ হাজার টাকা খরচ। সার, কীটনাশক, শ্রমিক সব কিছুর দাম বেশি। প্রতি বিঘায় ৬ থেকে ৮ মণ পাট আর ৫০০ আটির মতো পাটকাঠি হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে চার হাজার থেকে চার হাজার ৪০০ টাকা মণ পাট বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এখন দাম দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার ২০০ টাকা।
একই ইউনিয়নের চড়াইকোল এলাকার কৃষক আব্দুল আলিম তিন বিঘা জমিতে পাটের চাষ করেছেন। জমির ইজারা, চাষ, পরিচর্চা, সার, কীটনাশক, টানা, কাটা ও ধুয়া বাবদ তার প্রায় ২৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আর প্রতি বিঘায় গড়ে সাত মণ করে পাটের ফলন পেয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতি বিঘায় সাত মণ করে পাট আর গড়ে ৫০০ আটি করে পাটকাঠি হয়েছে। তাতে খরচ বাদে শুধু পাটকাঠিই লাভ। বরইচারা গ্রামের কৃষক চয়েন উদ্দিন বলেন, পাট চাষ করে শুধু পাটকাঠিই লাভ। পাট বেচে যা পাই তাতে খরচই ওঠে না। প্রতি মণ পাট অন্তত ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি হলে লাভবান হতাম।
কৃষক দুলাল মোল্লা বলেন, প্রথমে দাম ভালোই ছিল। বর্তমান দামে চাষ করে পোষায় না। সামনে পাট চাষ কমিয়ে দিতে হবে। শুধু পাটকাঠির লাভের আশায় কি এতো কষ্ট করা যায়। তার ভাষ্য, ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা মণ হলে কৃষকদের লাভ হতো।
ভালুকা গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, অন্তত চার হাজারের উপরে দাম হলে লাভ হতো। সরকার যদি দাম ঠিক করে দেয়, তাহলে সামনের বছর আবার পাট চাষ করতে উৎসাহ পাবো। জোতমোড়া গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নান মোল্লা বলেন, দুই সপ্তাহ আগে চার থেকে চার হাজার ৪০০ টাকা মণ পাট কেনাবেচা হয়েছে। তবে বর্তমানে তার চেয়ে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা কম। গত বছর এই সময়ে দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার টাকা দাম ছিল।
কুমারখালীর পাটের বাজারের এই অবস্থায় কৃষকদের একমাত্র ভরসা এখন পাটকাঠি। পাটকাঠি বিক্রি করে লোকসান পোষানোর চেষ্টা করছেন তারা।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মনির হোসেন বলেন, এ বছর কুমারখালীতে পাটের ফলন ভালো হয়েছে। প্রতি হেক্টরে দুই দশমিক সাত টন হিসেবে প্রায় ১৩ হাজার মেট্রিকটন পাট উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমান বাজার অনুযায়ী যার দাম প্রায় ১০০ কোটি টাকা। বিঘা প্রতি ২০-২৫ হাজার খরচ হয়েছে। তাতে কৃষকদের লোকসান না হলেও লাভ কম হচ্ছে। ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকরা পাট চাষে আরও আগ্রহী হবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।