নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম সফরে আসছেন তারেক রহমান। আজ রোববার একদিনের সফরে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী ঘুরে সন্ধ্যায় নগরীতে বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং দলের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়-চার ভিন্ন মাত্রার কর্মসূচি নিয়ে তাঁর এ সফর ঘিরে চট্টগ্রামজুড়ে এখন প্রস্তুতি তুঙ্গে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কোথাও তৈরি হচ্ছে মঞ্চ ও প্যান্ডেল, কোথাও চলছে হেলিপ্যাড প্রস্তুতি ও সড়ক সংস্কার। নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি দলীয়ভাবেও চলছে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি। সব মিলিয়ে সফরকে ঘিরে বৃহত্তর চট্টগ্রামে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।

মহেশখালী পরিদর্শন দিয়ে শুরু : সফরের শুরু হবে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে। সকাল ৯টার দিকে সেখানে পৌঁছে তারেক রহমান মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন।

এরপর দুপুর ১২টার দিকে হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন এলাকায় যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। অর্থাৎ সফরের শুরুতেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব চিত্র দেখার পাশাপাশি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন কর্মসূচিতে যুক্ত হবেন প্রধানমন্ত্রী।

বাঁশখালীতে ১০০ পরিবার পাচ্ছে নতুন ঘর : বাঁশখালীর কর্মসূচির মূল আকর্ষণ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন। সেখানে ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি ১০০ গৃহহারা পরিবারের হাতে নতুন বাড়ির চাবি তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বাঁশখালী পৌরসভা ও উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন থেকে ১০০টি পরিবারকে নতুন ঘর দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। বন্যায় যেসব পরিবারের ঘর সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে এবং নিজেদের উদ্যোগে নতুন ঘর নির্মাণের সামর্থ্য নেই, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রতীকীভাবে প্রথমে এক স্বামীহারা নারীর হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। সন্তানদের নিয়ে বসবাস করা ওই নারীর হাতে চাবি তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ১০০ পরিবারের পুনর্বাসন কার্যক্রমের প্রতীকী সূচনা হবে।

রাজনৈতিক প্রস্তুতিতেও সরগরম বাঁশখালী : প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে বাঁশখালী বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যেও ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।

ফটিকছড়িতে বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ : বাঁশখালী থেকে দুপুর ১টার দিকে ফটিকছড়িতে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে নাজিরহাট পৌরসভার বাবুনগর এলাকায় আল জামিয়াতুল ইসলামীয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি।

তবে এই সাক্ষাৎকে ঘিরে ফটিকছড়ির স্থানীয় উন্নয়ন ইস্যুও সামনে আসছে। হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফটিকছড়ির জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট-রামগড় রেললাইন সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার দাবি।

প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে ফটিকছড়ির পেলাগাজিতে অস্থায়ী হেলিপ্যাড নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। সেখান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কপথে বাবুনগর মাদরাসায় যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

হাটহাজারীতে শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত : ফটিকছড়ির কর্মসূচি শেষে সড়কপথে হাটহাজারীতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদরাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করবেন তিনি।

পরে হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ৩০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ঘর নির্মাণের সহায়তা হিসেবে পরিবারপ্রতি এক লাখ টাকা করে দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। একই অনুষ্ঠানে ১৫ জন প্রতিবন্ধীকে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।

উন্নয়ন দাবির তালিকাও প্রস্তুত : প্রধানমন্ত্রীর হাটহাজারী সফরকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়েও উন্নয়ন দাবির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, শিক্ষা ও বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয় তাঁর কাছে তুলে ধরার কথা রয়েছে।

ফটিকছড়ির মতো হাটহাজারীতেও উন্নত চিকিৎসাসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং নতুন বিদ্যুৎ গ্রিড স্থাপনের দাবিও রয়েছে।

সন্ধ্যায় তৃণমূলের মুখোমুখি তারেক : দিনের কর্মসূচির শেষ পর্বে সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর রেডিসন ব্লু হোটেলে চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তারেক রহমানের।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি এবং সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের এ সভায় যুক্ত করা হবে। নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে পদধারী নেতারা সভায় অংশ নেবেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন দলের দায়িত্ব পালন করেছেন এমন কিছু জ্যেষ্ঠ নেতাকেও আমন্ত্রণ জানানোর কথা রয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমান চট্টগ্রামের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভা করবেন। দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিনও জানিয়েছেন, বাঁশখালীর কর্মসূচিতে জনসভা না থাকলেও প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে।

নিরাপত্তার চাদরে চার এলাকা : প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন করতে চট্টগ্রামজুড়ে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সংশ্লিষ্ট এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসনের পুরো টিম কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

একদিনের সফরে একাধিক বার্তা : তারেক রহমানের এবারের চট্টগ্রাম সফরে একই সঙ্গে উন্নয়ন, পুনর্বাসন, ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দলীয় সংগঠন-চারটি ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। মহেশখালীতে কৌশলগত উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শনের পর বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর হস্তান্তর; ফটিকছড়িতে হেফাজতে ইসলামের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ; হাটহাজারীতে শাহ আহমদ শফীর কবর।