শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ৪০০ একর জমিতে বিসিক শিল্পপার্ক নির্মাণ, বগুড়ায় বহুমাত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, বগুড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ, শহরের রেললাইনের ওপর ওভারপাস নির্মাণ, বগুড়া সড়ক জোন স্থাপন, আন্তর্জাতিক ফুটবল স্টেডিয়ামসহ ক্রীড়াগ্রাম এবং করতোয়া নদীর পুনর্জীবন—একের পর এক উন্নয়ন পরিকল্পনার ঘোষণা এসেছে বগুড়ায়। একই সঙ্গে বিগত দিনের বৈষম্য ও অবহেলা কাটিয়ে বগুড়াসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চলের ন্যায্য উন্নয়ন নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সরকারের তিন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী।
বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নবনির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের অভিষেক অনুষ্ঠানে সাতটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে এসব জনকল্যাণমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা উঠে আসে। তাঁদের এসব ঘোষণায় বগুড়ার ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন করে ব্যাপক আশার সঞ্চার হয়েছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) সকাল ১১টায় বগুড়ার মমইন কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত বর্ণাঢ্য এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আমাদের জরিপে বগুড়ার শিল্পের উন্নয়নে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সেই চাহিদা অনুযায়ী অতীতে বগুড়ার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে বগুড়ায় ৪০০ একর জমির ওপর একটি আধুনিক বিসিক শিল্পপার্ক তৈরি করা হবে।’ বগুড়াকে সবার আবেগের কেন্দ্র উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এ অঞ্চলের শিল্প ও ব্যবসার যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে সরকার সব ধরনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।’
অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেল এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলাম। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বগুড়া বাংলাদেশের রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। জাতীয়তাবাদের জনক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই মাটিরই সন্তান। দেশ গঠনে তাঁর অবদান কোনোদিনই ভোলার নয়। বগুড়ার কাছে এজন্য পুরো দেশ চিরকৃতজ্ঞ।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘গত ২০ বছর বগুড়া বঞ্চিত হয়েছে, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। অথচ এ অঞ্চলের মানুষ দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। এখানকার মানুষ পরিশ্রমী ও সৎ। মূলত জাতীয় অগ্রগতির স্বার্থেই বর্তমান সরকার বগুড়ার সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করছে।’
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি বগুড়ার উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বগুড়া একটি খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা। এখান থেকে উৎপাদিত পণ্য প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বাজার তৈরি করে দেশ-বিদেশে সরবরাহ করা হয়। অথচ এতদিন আমরা চরমভাবে অবহেলিত ছিলাম। বর্তমান বৈষম্যহীন বাংলাদেশে বগুড়ার অতীতের সব ঘাটতি পূরণ করে ন্যায্যতার ভিত্তিতে উন্নয়ন করা হচ্ছে।’
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথের বিষয়ে তিনি জানান, আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এছাড়া বগুড়া বিমানবন্দর নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে যেন অন্তত দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে বিমানবন্দরটি বাণিজ্যিকভাবে চালু করা যায়, সেই জোরালো চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি আগামী মাস থেকেই ড্রোন তৈরির কারখানার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
শহরের যানজট নিরসনের বিষয়ে তিনি বলেন, বগুড়া শহরের রেললাইনের ওপর দিয়ে একটি ওভারপাস নির্মাণ করা হবে, যা বাস্তবায়িত হলে শহরের দীর্ঘদিনের যানজট অনেকাংশে কমে আসবে। ঐতিহাসিক করতোয়া নদীর প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম জানান, বর্তমান সরকারের বিশেষ উদ্যোগে এককালের খরস্রোতা করতোয়া নদীতে আবারও প্রাণ ফিরে আসছে।
ক্রীড়া খাতের অবকাঠামো উন্নয়নের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বগুড়ার তিনমাথায় একটি আধুনিক ক্রীড়াগ্রাম নির্মাণ করা হবে। সেখানে আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল স্টেডিয়ামসহ খেলাধুলার সব প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। বগুড়ার ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বগুড়ার সঙ্গে অন্য কোনো অঞ্চলের তুলনা চলে না। এর ওপর দিয়েই ১৩টি জেলার মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করে। কৃষি ও শিল্পসহ সর্ব দিক থেকেই বগুড়া অত্যন্ত সমৃদ্ধ।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেন, বগুড়া-৭ আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টন, বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুহিত তালুকদার, বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এমআর ইসলাম স্বাধীন, বিসিক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ, বগুড়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান, টিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালক ড. হোসনে আরা বেগম এবং বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হামিদুল হক চৌধুরী হিরু।
বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নবনির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আতিকুর রহমান বাদলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অভিষেক অনুষ্ঠানে জেলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা, সরকারি কর্মকর্তা এবং নানা শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।