কুষ্টিয়ায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাঁশ চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। বাঁশের তৈরি তৈজষপত্র বিক্রি করে সংসার চালায় এখানকার ৫শত পরিবার। কিন্তু বাঁশের উৎপাদন কম হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী বাঁশ না পাওয়ায় কুটির শিল্পের কারিগরদের ব্যবসায় ভাটা পড়ছে। তাই অনেকেই পেশা ছাড়ছে।
জানা যায়, বাঁশ চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পনা ও পরিচর্যার অভাবে বাঁশ চাষের উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। এখানকার পতিত জমিতে অন্যান্য ফসল ও বাঁশ চাষের ভালো সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে আবাদের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।
গত ২ দশক আগে বন সম্পদের অফিসের অধীনে এক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির আওতায় পতিত জমির সুষ্ঠু ব্যবহারের লক্ষ্যে গাছ লাগানো হয়। ওই সময় বাঁশের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হলে বাঁশ ঝাড় বৃদ্ধি পায়। গ্রামাঞ্চলে প্রচুর বাঁশের আবাদ করা হয়।
মৃত্তিকা বাঁশ, বরাক, মুলি, তল্লা, মাকলা, বারিয়ানা, নল, ভুদুম, রেঙ্গুন ও কালি বাঁশ বাঁশ ঝাড়গুলোতে উৎপন্ন হয়। এসব বাঁশ ও বেতের উপর নির্ভর করেই পল্লীতে কুটির শিল্প গড়ে ওঠে।
কুষ্টিয়ার জগতিতে মীরপুর ও খোকসা এবং কুমারখালীতে আদিবাসী সম্প্রদায় বাঁশের তৈরি তৈজষপত্র তৈরি করা হয়।
কুষ্টিয়ার এসব এলাকার বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁশ ও বেত দিয়ে বিভিন্ন ধরনের গৃহস্থালি ও শৌখিন সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের তৈরি ঝুড়ী, চালুনি, ডালা, কুলা, ফুলের টব, শোপিস, আসবাবপত্রসহ নানা ধরনের হস্তশিল্প স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও বিক্রি হয়।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের অন্যতম খাত বাঁশ ও বেত শিল্প। পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং দেশীয় সংস্কৃতির ধারক এই শিল্প এখন নতুন করে সম্ভাবনার আলো দেখছে। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
এরই অংশ হিসেবে বিসিক জেলা কার্যালয়, কুষ্টিয়ার উদ্যোগে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ী দাসপাড়া, মিরপুর উপজেলার আবুরি দাসপাড়া, মালিহাদ দাসপাড়া এবং খন্দকবাড়িয়া এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। এ সময় ১০২ জন বাঁশ ও বেত পণ্য উৎপাদনকারী কুটির শিল্প উদ্যোক্তাকে চিহ্নিত করা হয়।
বাঁশ দিয়ে কুটির শিল্পে তৈরি করা হয়- কুলা, চালনা, ডোল, খালই, পলো, চাটাই, ডালি, দোলনা, চেয়ারসহ বিভিন্ন ধরনের খেলনা ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র। এছাড়াও বাঁশ দিয়ে কাঁচা ঘরবাড়ী তৈরিতে প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বলতে গেলে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাঁশের প্রয়োজনীয়তা অনেক। গ্রাম-গঞ্জ শহরে এর চাহিদা ব্যাপক। এ বাঁশ বেতের উপর নির্ভর করেই কুটির শিল্প গড়ে উঠেছে। বাঁশের তৈরি তৈজষপত্র বিক্রি করেই এরা সংসার চালায়। তারা বাঁশ-বেত শিল্পের সাথে জড়িত। মানুষ এ বাঁশ বেত শিল্পের উপর নির্ভরশীল। জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে দিনের পর দিন বাড়ছে বাঁশের চাহিদা। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী বাড়ছে না বাঁশের আবাদ। লাগানো হচ্ছে না বাঁশের ঝাড়। বাঁশ কেটে সাবাড় করে নষ্ট করা হচ্ছে পরিবেশ।
বাঁশের মুতাও কেটে ইট ভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে বাঁশ ঝাড়। চাহিদার তুলনায় বাঁশ না লাগানোর জন্য বাঁশের ঘাটতি পড়ছে প্রতি বছর। বাঁশ চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় এ জেলায় সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও জনসাধারণকে এ ব্যাপারে উৎসাহিত না করায় বাঁশ আবাদ বাড়ছে না। তাই ধ্বংস হতে চলেছে বাঁশ বেত শিল্প।
কুষ্টিয়ার বাঁশ ও বেত শিল্পীরা বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু আধুনিক ডিজাইন জানা না থাকায় বাজারে নতুন ধরনের পণ্য আনতে পারছি না। আমাদের যদি মাঠ পর্যায়ে বিনা ফি-তে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা আন্তর্জাতিক মানের শৌখিন ও ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরি করতে পারব।”
“শিল্প সম্প্রসারণের জন্য সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ঋণ বা অনুদান অত্যন্ত প্রয়োজন। পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় অনেক সময় বড় অর্ডার পেলেও কাজ করা সম্ভব হয় না। সরকারি সহায়তা পেলে উৎপাদন বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান হবে এবং তরুণ প্রজন্মও এই শিল্পে আগ্রহী হবে।”
এ ব্যাপারে বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক সোহেল রানা বলেন, “বাঁশ ও বেত শিল্প বাংলাদেশের ঐতিহ্যের অংশ। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক নকশা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই খাত শুধু স্থানীয় চাহিদাই পূরণ করবে না, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। বিসিকের লক্ষ্য কুটির শিল্পকে বাণিজ্যিকভাবে আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা।”
জেলা বন বিভাগের অধীনে বাঁশ লাগানো কর্মসূচী নিয়ে যদি গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে এবং জেলার পতিত জমির সুষ্ঠু ব্যবহার করাতে সক্ষম হয় তাহলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এ জেলায় বাঁশের আবাদ বাড়বে। উৎপাদিত বাঁশ জেলার চাহিদা পূরণ করে বাইরে পাঠাতে পারবে এবং বাঁশ ভিত্তিক প্রচুর শিল্পের বিকাশ ঘটবে।